হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১৩ এএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধনের পর ওসমার স্মৃতি মিলনায়তনে ফটোসেশনে অংশ নেন । ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রকৃতিতে বসন্তের দুপুর। বেড়েছে সূর্যের রোদের তাপ। গাছে গাছে ঝরছে পাতা। প্রাণচঞ্চল বাতাসে বসন্তের গান। সেই গানের সুরে মিশে আছে মাতৃভাষা রক্ষায় আত্মদানকারী ভাই হারানো শোক আর শোককে শক্তিতে পরিণত করার প্রেরণা।
এমন প্রাণদায়ী পরিবেশে প্রতিবছরের মতো এবারও শুরু হলো বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা’। ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যের এই মেলা উদ্বোধন করতে গিয়ে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বললেন, ‘সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়।’
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি
ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের
প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। অমর একুশে
বইমেলা কেবল বই বেচাকেনার মেলা নয়, বরং মেলা হয়ে উঠুক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের
সূতিকাগার।’
নানা নাটকীয়তা আর চার দফা তারিখ পরিবর্তনের পর গতকাল
বৃহস্পতিবার উদ্বোধন ঘটে অমর একুশে বইমেলার। বেলা ৩টা ১৬ মিনিটে এ মেলা উদ্বোধনের
সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও
কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা। একই সঙ্গে তিনি অমর একুশে
শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠিত বইমেলার একুশে অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন এবং ‘বাংলা
একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’ প্রাপ্তদের হাতে পদক তুলে দেন। উদ্বোধনের পর তিনি
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।
এর আগে দুপুর ২টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অবস্থিত
বইমেলার মূল মঞ্চে শুরু হয় এই উদ্বোধনী আয়োজন। এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি
ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায়
চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা
একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের
সচিব মো. মফিদুর রহমান এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো.
রেজাউল করিম বাদশা। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম
ফজলুল হক।
উদ্বোধনী আয়োজনের পরে প্রধানমন্ত্রীর মেলা পরিদর্শন
শেষ হওয়ার পর তার গাড়িবহর বাংলা একাডেমি চত্বর ত্যাগ করতেই সর্বসাধারণের জন্য
উন্মুক্ত হয় বইমেলার দুই প্রাঙ্গণ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান
প্রাঙ্গণ। মুহূর্তেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেলায় প্রবেশ করে শত-সহস্র বইপ্রেমী মানুষ।
এরই মধ্য দিয়েই এবারের এ আঠারো দিনব্যাপী বইমেলার জন্য দেশের লেখক-প্রকাশক আর
বইপ্রেমী মানুষের অপেক্ষার অবসান ঘটে।
রমজানের কারণে মেলা জমবে নাÑ প্রকাশক ও লেখক-পাঠকদের
এমন ধারণা খানিকটা হলেও ভুল প্রমাণিত করেছে মেলার শুরুর দিনেই আসা দর্শনার্থীরা,
তবে প্রথম দিনই মেলা প্রাঙ্গণ ছিল ভয়ানক অগোছাল। এখনও চালু হয়নি বেশিরভাগ স্টল।
অনেক স্টলের নির্মাণকাজ এখনও চলছে। ফলে মেলা প্রাঙ্গণের প্রায় সবখানেই
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে স্টল নির্মাণসামগ্রী।
এ প্রসঙ্গে অবসর প্রকাশনা সংস্থার ম্যানেজার মাসুদ
রানা বললেন, ‘বরাবরই মেলার প্রথম কয়েক দিন মেলার পরিবেশ অগোছাল থাকে। কিন্তু এবার
আরও একটু বেশি। কারণ প্রকাশনা সংস্থাগুলো এবার স্টল নির্মাণের জন্য সময় খুব কম
পেয়েছে। অনেকে আবার প্যাভিলিয়ন ভেঙে স্টল নির্মাণ করেছেন। যে কারণে এবার মেলার
পরিবেশ বেশ অগোছাল। এটা কয়েক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে মেলা নিয়ে আমরা যতটা
হতাশ ছিলাম এখন মনে হচ্ছে ততটা হতাশ হতে হবে না। আজকের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে মেলা
জমবে। কয়েক হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়েছে আমাদের।
যে প্রকাশনা সংস্থার হাত ধরে এই বইমেলার সূত্রপাত
সেই ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনীর স্টলে সামনে কথা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের
(বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী মেসবাহুল ইসলাম অন্তরের সঙ্গে।
তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তিনি মুক্তধারা থেকে ‘লালন’ সাঁইজিকে নিয়ে লেখা
প্রখ্যাত লালন ও রবীন্দ্রগবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর ‘লালন’ এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের উপন্যাস ‘চোখের বালি’ শীর্ষক দুটি বই কিনেছেন। তিনি জীবনে প্রথমবারের মতো
বইমেলায় এসেছেন।
‘লালন’ বইটি কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে মেসবাহুল বলেন, ‘অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘সব
লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ গানটি পড়ি। সেময় এটাকে কবিতা ভেবেছিলাম। কিন্তু খুব
ভালো লেগেছিল। জাত-পাতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানবতার কথার এমন উচ্চারণ আমাকে আজও
আপ্লুত করে রেখেছে। তারপরে এই প্রথমবার বইমেলায় এসেই এখানে ‘লালন’ বইটি দেখেই কিনে
নিই। কিন্তু লালন সমন্ধে আমি কিছুই জানি না; তাকে জানতে বই কিনলাম, আরও কিনব।’
মেলার প্রথম দিনে বই বিক্রির ব্যাপারে জানতে চাইলে
মুক্তধারা প্রকাশনী ম্যানেজার কামরুজ্জামান বলেন, ‘মেলার প্রথম দিনে তেমন বিক্রি
হয় না। তবে এবার বেশকিছু বই বিক্রি হলো।’ তিনি জানান, ‘এবার আমরা আমাদের প্রকাশনার
বেশকিছু বই রিপ্রিন্ট করেছিÑ যেগুলোর গত বেশ কয়েক বছর ধরে কোনো প্রিন্ট ছিল না। এগুলোর
মধ্যে রয়েছেÑ সত্যেন সেনের বিখ্যাত বই ‘সেয়ানা’ ও ‘পাতাবাহার’, উপন্দ্রেকিশোর
রায়চৌধুরীর ‘টুনটুনির বই’, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিজ্ঞান কি ও কেন’ এবং
গজেন্দ্রকুমার মিত্রের ‘পৌষ ফাগুনের পালা’, ‘কলকাতার কাছেই’ এবং ‘উপকণ্ঠে’।
মেলায় কথা হয় আরও বেশকিছু প্রকাশনা সংস্থার
প্রতিনিধি ও বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে। সকলেই জানালেন, মেলা কেবল শুরু হলো। পুরোপুরি
গুছিয়ে উঠতে সময় লাগবে।
প্রতিদিন বইমেলা খোলা থাকবে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা
পর্যন্ত। তবে ছুটির দিন বইমেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে যথারীতি রাত ৯টা
পর্যন্ত। রাত সাড়ে ৮ টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। এ
ছাড়া প্রতিবছরের মতো এবারের বইমেলায়ও শিশু-কিশোরদের অবাধে চলাচল এবং বই কেনার জন্য
প্রতি শুক্র ও শনিবার মেলায় বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে।
আজকের কর্মসূচি : আজ শুক্রবার এবারের বইমেলার দ্বিতীয় দিন। আজ থাকছে এ মেলার প্রথম শিশুপ্রহর। এ ছাড়াও সকাল সাড়ে ৯টায় বইমেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং সকাল সাড়ে ১০টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব। আর বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ : ফরিদা পারভীন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোহাম্মদ রোমেল। আলোচনায় অংশ নেবেন ড. আবু ইসহাক হোসেন। সভাপতিত্ব করবেন কবি ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার। একই মঞ্চে বিকাল ৪টায় হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।