চট্টগ্রামে বাজার মনিটরিং
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৪ পিএম
বন্দরনগরীতে বাজার মনিটরিং অভিযান কোনো ফল বয়ে আনছে না। এমনকি আর্থিক জরিমানা করেও থামানো যাচ্ছে না বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। পবিত্র রমজান মাসে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করা থেকে নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না মুনাফাখোরদের।
অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছেÑ এমন অভিযোগে ১৮ ফেব্রুয়ারি
নগরীর ফলমন্ডি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অভিযানে
ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণ না করে বেশি দামে খেজুর বিক্রির দায়ে তুহিন এন্টারপ্রাইজ
নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে সংস্থাটির আভিযানিক দল। মূল্য তালিকার
প্রদর্শন না করায় একই অভিযানে মায়াবী ফ্রুটস নামে ওই এলাকার আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে ২০
হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী অভিযানের পর ফলমন্ডির সকল ব্যবসায়ী শুধরে যাওয়ার কথা
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের
পরও তারা অতিরিক্ত দামেই পণ্য বিক্রি করছে। জরিমানার পরও তারা আগের নিয়মে মূল্য তালিকা
প্রদর্শন না করেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। যেটি উঠে এসেছে একই এলাকায় জেলা প্রশাসনের
অভিযানে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের দুই দিন পর ২১ ফেব্রুয়ারি
ফলমন্ডিতে অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। ওই দিন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
তামজীদুর রহমান ফলমন্ডিতে অভিযানে গিয়ে দেখেন ব্যবসায়ীরা হালনাগাদ মূল্য তালিকা প্রদর্শন
না করেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদও সংরক্ষণ করছেন না। পরে এসব অপরাধে
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দুটি প্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার করে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
অভিযান পরিচালনার পরও ব্যবসায়ীরা না শোধরানোর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে
বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, মূলত তিনটি
কারণে অভিযানের পরও ব্যবসায়ীরা শুধরাচ্ছে না। অন্যতম কারণ হচ্ছে অনিয়মের অভিযোগে ব্যবসায়ীদের
যে জরিমানা করা হয়, সেটি খুব কম থাকে। তাই এটি ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি
করছে না। অন্যদিকে একবার অভিযান পরিচালনা করেই দায়িত্ব শেষ মনে করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এরপর তারা আর কোনো ফলোআপ করে না। ফলোআপ না করার কারণে একই ব্যবসায়ী বার বার একই অপরাধ
করে যাচ্ছে। এ ছাড়া অতি মুনাফা করা যে একটা অপরাধ, ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই বোধ নেই। যে
কারণে ব্যবসায়ীরা অভিযানের পরও শুধরাচ্ছে না।
শুধু ফলমন্ডি নয়, একই চিত্র দেখা গেছে ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি
বাজার খাতুনগঞ্জেও। ওই বাজারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনার পরও
ব্যবসায়ীরা শোধরায়নি। ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানের পর ওই বাজারে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী
ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযানে গেলে দেখা যায় তারা একই অপরাধ পুনরায় করছেন।
রমজানের আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি খাতুনগঞ্জে অভিযান পরিচালনা করে ভোক্তা
অধিকার। অভিযানে মসলার দোকানে নিষিদ্ধ কেমিক্যাল বিক্রি, ডালের সঙ্গে রঙ মেশানো এবং
অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য বিক্রির দায়ে ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এ সময় ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড না ঘটায় সেজন্য সতর্ক করা হয় আড়তদারদের। এর
তিন দিন পর খাতুনগঞ্জে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। অভিযানে
খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আড়তে মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করাসহ অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য বিক্রির
বিষয়টি নজরে আসে। পরে এ ঘটনায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করার পাশাপাশি জেলা
প্রশাসক বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে
যথাযথ রসিদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য বিক্রির
সময় রসিদে বিক্রেতার যোগাযোগ নম্বর সংযুক্ত রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে প্রয়োজনে
তা যাচাই করা যায়। জেলা প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনার পরও বিষয়টি থামেনি। মূল্য তালিকা
প্রদর্শন ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় রসিদ সংক্ষণ না করে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মর্জিমাফিক ব্যবসা
পরিচালনা করছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি
এস এম নাজের হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ভোক্তা অধিকার অভিযান পরিচালনা
করে ঠিকই। কিন্তু বাস্তবে অভিযানের কারণে কখনও দাম কমতে আমরা দেখি না। অনেক ক্ষেত্রে
উল্টোও ঘটে। অভিযানে জরিমানা করে আসার পর দোকানদার পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেন।
অভিযান পরিচালনার পরও ব্যবসায়ীরা কেন শোধরাচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি
বলেন, তিনটি কারণে অভিযানের পরও ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার দৌরাত্ম্যটা থামছে না। প্রথম
কারণ হচ্ছে, অতি মুনাফা করা যে একটা অপরাধÑ ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই বোধ নেই। তাদের মাঝে
এই বোধ তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিযানে অনিয়ম ধরা পড়লে জরিমানা করা হয় কম। যে কারণে
ব্যবসায়ীরা এটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখে না। অভিযান পরিচালনা করে যাওয়ার পরপরই আবার আগের
দামেই বিক্রি করেন। তৃতীয়ত, অভিযান করার পর আর ফলোআপ করা হয় না। ফলোআপ না থাকার কারণে
ব্যবসায়ীরা সেটিকে আমলে নিচ্ছেন না। অভিযান শেষ করে কর্মকর্তারা আসার পরপরই আবার আগের
দামে বিক্রি করছেন।’
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক
ফয়েজ উল্যাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের চেষ্টার কোনো
কমতি নেই। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছি। অভিযানে গিয়ে আমরা জরিমানাও করছি।
আমাদের সাইড থেকে যা করণীয় আমরা করছি, বাকিটা হলো ব্যবসায়ীদের ওপর। তারা যদি ঠিক না
হয়, আমরা শত অভিযান পরিচালনা করেও বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব না। অতি মুনাফা করা
যে একটা অপরাধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই বোধ না আসা পর্যন্ত এটির সমাধান হবে না।’