ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৪ এএম
এআই প্রতীকী ছবি
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ‘ভয়াবহ আকার’ ধারণ করেছে। বেপরোয়া গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ চালক ও ট্রাফিক আইন অমান্য করায় প্রতিদিনই দেশের নানা প্রান্তে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। পরিসংখ্যান বলছে, দিনে গড়ে ৭ থেকে ১০ জনের জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে সড়কে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার মোটরসাইকেল চালক তরুণরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। তারা এজন্য নাজুক ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক ব্যবস্থার পাশাপাশি দিকনির্দেশনা ছাড়াই তরুণদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়াকেও দায়ী করছেন।
এদিকে
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে সড়ক, রেল ও নৌ-পথে
৫৯৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৮৬ জন। এ ছাড়া এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন এক হাজার
২৩৮ জন। সংস্থাটি বলছে, একই সময়ে ২০৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার
৩৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
দুর্ঘটনার
পরিসংখ্যান : দেশে
প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির বিষয়ে পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার
অন্যতম বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের
ওপর ভিত্তি করে সংস্থা দুটি প্রতিবেদন তৈরি করে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যে জানা
যায়Ñ২০২৫ সালে সড়ক, নৌ ও রেলপথে ৮ হাজার ২৩৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ হাজার ৯৮৪
জন। আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৭৫১ জন।
রোড সেফটি
ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে। ৩ হাজার
২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৬৭২ জন। এই সংখ্যা মোট দুর্ঘটনার
৩৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ ছাড়া গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায়
১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৭২৩ জন, যা মোট নিহতের প্রায়
৭৮ শতাংশ।
রোড সেফটি
ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালে ৬ হাজার ৯২৭টি দুর্ঘটনায়
নিহত হন ৭ হাজার ২৯৪ জন এবং আহত হন ১২ হাজার ১৯ জন। ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার
৯১১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৬ হাজার ৫২৪ জন নিহত ও আহত হন ১১ হাজার ৪০৭ জন।
নিহতদের মধ্যে ১১২৮জন শিশু, যা মোট নিহতের ১৭ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ৯৭৪ জন নারী, যা মোট
নিহতের ১৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। এছাড়া ২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২
হাজার ৪৮৭ জন নিহত হন, যা মোট নিহতের ৩৮ দশমিক ১২ শতাংশ।
অপরদিকে
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে সড়ক ও রেলপথে ৭ হাজার
২৪২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ৭৫৪ জন। সংস্থাটি জানায়,
এ সময়ে শুধু সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬ হাজার ৭২৯টি। যাতে নিহতের সংখ্যা ৯ হাজার ১১১ জন
ও আহত ১৪ হাজার ৮১২ জন। এ ছাড়া রেলপথে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮৫ জন নিহত ও ১৪৫ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৮ জন।
বাংলাদেশ
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘২০২৩ সালে ৬ হাজার ২৬১টি
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৯০২ জন ও আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৩৭২ জন। ২০২৪ সালে
৬ হাজার ২৫৯ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৫৮৩ জন ও আহত হন ১২ হাজার ৬০৮ জন।
কী
বলছেন চালকরা : রাজধানীতে গত ১০ বছর ধরে মোটরসাইকেল চালান আরমান ভূঁইয়া সজীব। সব
মিলিয়ে তিনবার দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন তিনি। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার
মূল কারণ দ্রুত গতি। এ ছাড়া ভাঙা সড়ক, ট্রাফিক আইন মেনে না চলা অন্যতম।’ কোনো যানবাহন
চালকই নিয়ম মেনে চালায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নিজে সতর্ক থাকলেও অন্যের অসতর্কতার
কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে।’
মোটরসাইকেল
দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে আরমান ভূঁইয়া বলেন, ‘বেশিরভাগ চালক মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করে
না। ভালো মানের হেলমেটের দাম যেখানে ৫ হাজার টাকার ওপরে সেখানে সাধারণত হেলমেট ২৫০
থেকে পনেরশত টাকায় পাওয়া যায়। এই সাধারণ হেলমেট ব্যবহারের জন্য অনেকের প্রাণও চলে যায়।’
ঢাকা-ময়মনসিংহ
মহাসড়কে বিরিশিরি এক্সপ্রেসের চালাক মো. আব্দুস সালাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন,
‘টার্মিনালগুলোতে ড্রাইভার-হেলপারদের বিশ্রামের ব্যবস্থা নেই। যাত্রীদের বসার স্থান
থাকলেও আমাদের নেই।’ অতিরিক্ত গাড়ির কারণে টার্মিনালে গাড়ি রাখার জায়গায় না পাওয়ায়
জরিমানা এড়াতে গাড়ি রানিংয়েই রাখতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্রামের অভাব আর ভাঙাচোরা
সড়কের জন্যই দুর্ঘটনা বেশি হয়।’
ট্রাফিক
আইন, পুলিশিং সিস্টেম যথাযথভাবে তদারকি করা হয় না : রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের
চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এআই মাহবুব উদ্দিন
আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের ট্রাফিক এক্সিডেন্টগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়
বরং এগুলো মার্ডার। আমাদের সিস্টেমের কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে।’
মোটরসাইকেল
দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, যে কোয়ালিটির হেলমেট
ব্যবহার করার কথা সে মানের হেলমেট ব্যবহার করা হয় না। দ্বিতীয়ত মোটরসাইকেল চালকদের
বড় অংশই তরুণ, তাদের গায়ে ও মনে অন্য রকম জোর থাকে। তারা কোনো কিছু তোয়াক্কা করে না।
আর তৃতীয়ত, রাস্তা-ঘাট ও ট্রাফিক সিস্টেমের নাজেহাল অবস্থা। ট্রাফিক আইন, পুলিশিং সিস্টেম
ও যথাযথভাবে তদারকি করা হয় না।’
অধ্যাপক
এআই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে বিবাহিতদের জন্য গাড়ির ইনস্যুরেন্স ফি
অর্ধেক, আর অবিবাহিতদের জন্য দ্বিগুণ। এর কারণ বিবাহিতরা নিজের পরিবারের কথা ভেবে রিস্ক
কম নেয়। অন্যদিকে অবিবাহিতরা অপ্রতিরোধ্য গতিতে গাড়ি চালায়। অর্থাৎ বয়সের সঙ্গে মনস্তত্ত্ব
জড়িত। মাঝ বয়সীরা ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেল বা গাড়ি চালান না। তাদের মধ্যে দুর্ঘটনার হার
কম।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি, কারণ, আমরা ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে
মানি না।’
বাংলাদেশ
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে
বলেন, ‘নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা উন্নত বিশ্ব যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের
দেশেও তা প্রয়োগ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও কি অটোরিকশানির্ভর নগর ব্যবস্থা
আছে? কোথাও মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং নির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা আছে? নেই। আমাদেরও ট্রাম্প,
মেট্রো, বাস র্যাপিড ট্রানজিটে যেতে হবে। ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
স্বয়ংক্রিয়
যন্ত্র বসানো শেষ হলেই বেপরোয়া গতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব : সড়ক দুর্ঘটনা রোধের
প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (মিডিয়া) শামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে
বলেন, ‘মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে পুলিশ সদস্যদের স্পিডগান নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে দেখলেই
গতি কমিয়ে দেন চালকরা। কিন্তু চেকপোস্ট পার হয়েই তারা গতি বাড়িয়ে দেন। এ অবস্থা থেকে
মুক্তি মিলবে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বসানোর কাজ শেষ হলে। তখন বেপরোয়া গতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণ
সম্ভব হবে।’
তিনি
বলেন, ‘মামলা-যানবাহন জব্দ, গ্রেপ্তার করেও কমানো যাচ্ছে না দুর্ঘটনা। এজন্য মূলত,
ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যত্রতত্র বাজার, ফুডপার্ক গড়ে ওঠা, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার যানবাহনের
আধিপত্য, অতিরিক্ত গতি, সড়কের বেহাল দশা ও আলোকবাতির স্বল্পতা দায়ী। এসব সমস্যা রোধ
করা সম্ভব হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে।’