নূর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০২ এএম
সরকার পরিবর্তনের এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই পুলিশের নতুন উর্দি (ইউনিফর্ম) নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। ‘আয়রন গ্রে’ রঙের নতুন এই উর্দি নিয়ে খোদ পুলিশ বাহিনীতেই রয়েছে বিতর্ক, আপত্তি ও ক্ষোভ। গত সোমবার রাতে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। মাঠের কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই বলছেন, পুলিশের নতুন ইউনিফর্ম সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তটি ছিল তড়িঘড়ি, মতামতবিহীন ও বাস্তবতাবিবর্জিত। শুধু তাই নয়, নতুন ইউনিফর্ম পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় শতকোটি টাকার কেনাকাটায় অস্বচ্ছতার বিষয়টি নিয়েও এখন ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।
২০২৫
সালের ১৫ নভেম্বর থেকে পুলিশে ‘আয়রন গ্রে’ পোশাক চালু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনে
প্রথমে সীমিত পরিসরে বিতরণ, পরে রেঞ্জ ও মহানগর পুলিশেও ধাপে ধাপে চালু হয় নতুন ইউনিফর্ম।
তবে বাইরে সব স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে ভেতরে জম ছিল অস্বস্তি। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব
নেওয়ার পর অনুকূল গণতান্ত্রিক আবহে তা আর চাপা দিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
পুলিশ
সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যই এই পরিবর্তনের পক্ষে নন। তাদের
দাবি, ২০০৩-০৪ সালে খাকি থেকে যে পরিবর্তন এসেছিল, তা হয়েছিল মাঠপর্যায়ের মতামতের ভিত্তিতে।
আবহাওয়া, রঙ, দিন-রাত মিলিয়ে ডিউটি করার দীর্ঘ সময়কাল ইত্যাদি বিবেচনা করে দীর্ঘ গবেষণার
ভিত্তিতে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এবার কোনো পর্যালোচনাই হয়নি। সদস্যদের মতামতও
নেওয়া হয়নি। জনমত যাচাই হয়নি। তাই প্রশ্ন উঠেছে, কার বা কাদের পরামর্শে এই তড়িঘড়ি বদল?
পুলিশ
সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন থেকে পোশাক পরিবর্তনের যে দাবি তোলা হয়েছে, তা নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার
সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যান।
রাতে
ইউনিফর্মের দৃশ্যমানতা কমে যায় : মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ইউনিফর্মের
রঙ ও নকশা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ একাধিক সংস্থার পোশাকের সঙ্গে মিলে যায়।
এমনকি কিছু বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের গার্ডদের পোশাকের সঙ্গেও এর সাদৃশ্য রয়েছে।
তাই দূর থেকে পুলিশকে পুলিশ হিসেবে চিনতে মুশকিল হয়।
ঢাকার
বিভিন্ন সড়কে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক সার্জেন্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন,
‘রাতে এই ইউনিফর্মে দৃশ্যমানতা কমে যায়। আলো পড়লে রঙের টোন বদলে যায়। দূর থেকে স্পষ্ট
বোঝা যায় না এটি পুলিশের পোশাক। অথচ আগের পোশাক ছিল দৃশ্যমান এবং কর্তৃত্বের প্রতীক।
নতুনটি যেন পুলিশের পরিচয়কেই ঝাপসা করে দিচ্ছে।’
পুলিশের
অতিরিক্ত আইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেন, ‘ইউনিফর্ম
শুধু কাপড় নয়। এটি বাহিনীর পরিচয়, ঐতিহ্য ও মানসিকতার প্রতিফলন। যদি সেই পরিচয়ই দুর্বল
হয়, তাহলে পরিবর্তনের যৌক্তিকতা কোথায়?’
উর্দি
সরবরাহের কাজ ও অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম : এদিকে অভিযোগ উঠেছে, এই উর্দি সরবরাহ সংক্রান্ত
কাজে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে অস্বচ্ছতা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রেও
ঘটেছে অনিয়ম। নতুন ইউনিফর্মের কাপড় সরবরাহে ১৪১ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয় নোমান গ্রুপকে।
অথচ দুর্নীতি দমন কমিশনে এই গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধেই রয়েছে মামলা
এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ। দুদক তা নিয়ে তদন্তও করছে। তবু সরকারি ক্রয় নীতিমালা
উপেক্ষা করে তাকেই দেওয়া হয়েছে কার্যাদেশ। যেখানে সরকারি ক্রয় নীতিমালায় বলা আছে, দুর্নীতির
সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তদন্তাধীন বিষয় থাকলে দরদাতাকে অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে;
সেখানে তদন্ত চলাকালে নোমান গ্রুপকে কোটি কোটি টাকার কাজ কীভাবে অনুমোদন দেওয়া হলোÑ
এ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনের ফাঁক গলে নোমান গ্রুপকে এই কাজ পাওয়ার
সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে
বুট, ট্রেনিং ও প্যারেড বুট, ক্যানভাস সু, পাম্প সু ও তোয়ালে সরবরাহে ১০৫ কোটির বেশি
টাকার কাজ পেয়েছে ফ্রেন্ডস ট্রেডিং করপোরেশন। অভিযোগ উঠেছে, এ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব
ট্যানারি নেই, জুতা তৈরির কারখানা নেই, পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতাও নেই। মালিকের বিরুদ্ধেও
রয়েছে চেক ডিজঅনার মামলা। নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও
রয়েছে। সব মিলিয়ে কেনাকাটার প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা
বলছেন, আর্থিক খাতের মামলা সাধারণ ফৌজদারি মামলার মতো নয়। প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ ছাড়া
এ ধরনের মামলা হয় না। ফলে এমন অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি কেনাকাটা
নৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ধরনের টিসি প্লেন ও টুইল ফ্যাব্রিক, জেলা পুলিশের কাপড়, প্রশিক্ষণার্থীদের শার্টের কাপড় সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে বিপুল অঙ্ক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাখ লাখ বেডশিট, পিলো কভার, দুই লাখ জোড়া বুট, ১ লাখ ৮০ হাজার ক্যানভাস সু, নারী সদস্যদের পাম্প সু, তোয়ালে। তালিকা যত বড়, টাকার অঙ্কও তত ভারী।
‘পেশাদারত্বের
প্রমাণ ইউনিফর্মে নয়, বরং কাজে’: পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো.
আনিসুজ্জামান বলেন, এই পরিবর্তন একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায়
এটি অপ্রয়োজনীয় চাপও। বরং এই অর্থ বাহিনীর প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, কল্যাণ
তহবিল বা সদস্যদের মনোবল উন্নয়নেও ব্যয় করা যেত।
তিনি
বলেন, পোশাক পাল্টালে মনোভাব পাল্টায় না। পেশাদারত্ব আসে প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব ও জবাবদিহি
থেকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ পুরনো পোশাকেই দায়িত্ব পালন করেছে উল্লেখ
করে তিনি বলেন, পেশাদারত্বের প্রমাণ ইউনিফর্মে নয়, বরং কাজে।