ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও তানভীর হাসান
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৫ এএম
আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৭ এএম
বাংলাদেশ পুলিশ। ছবি: বাসস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পদে বড় ধরনের রদবদলের জোরালো গুঞ্জন উঠেছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) মহাপরিচালকÑ এই তিনটি কৌশলগত শীর্ষ পদকে ঘিরে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ ছাড়াও পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগেও (সিআইডি) নতুন মুখ দেখা যেতে পারে।
সম্ভাব্য এই ৫ পদের বিপরীতে অন্তত ৭ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই প্রস্তাবিত ফাইল এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টেবিলে রয়েছে। যেকোনো সময় তা অনুমোদন করা হতে পারে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশের উচ্চপর্যায়ে কিছু পরিবর্তন আসবেই। তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে কিছুটা সময় লাগতে পারে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, নতুন সরকারের অগ্রাধিকারÑ দ্রুত আস্থা ফিরিয়ে আনা, বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। তার মেয়াদের এখনও প্রায় নয় মাস বাকি। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে নতুন সরকার পুলিশ প্রশাসন পুর্নবিন্যাস করছে। ইতোমধ্যে আইজিপি বাহারুল আলম পদত্যাগের কথা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছেন।
এদিকে নতুন আইজিপি হিসেবে আলোচনায় আছেন তিন অতিরিক্ত আইজিপি। এদের মধ্যে রয়েছেনÑ হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি দেলোয়ার হোসেন মিঞা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত আইজিপি আলী হোসেন ফকির ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ। তারা সবাই ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা। এক্ষেত্রে ছিবগাত উল্লাহ গত ১৮ মাসের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে পিছিয়ে পড়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তালিকায় থাকা প্রথম তিনজনই পেশাগত দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় এগিয়ে। সরকার চাইলে এদের যেকোনো একজনকে আইজিপি করতে পারে। আবার একজনকে আইজিপি করে অন্যদের মধ্যে কাউকে র্যাবের মহাপরিচালক বা গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো পদে বসানো হতে পারে। এ ছাড়াও ‘ভূতাপেক্ষ’ (অবসরে যাওয়া) আইজিপি হিসেবে দুই অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান শেখ ও আনসার উদ্দিন খান পাঠানের নামও আলোচনায় রয়েছে। যদিও অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিবেচনা জটিল হয়ে ওঠে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর র্যাবের কার্যক্রম ও ভাবমূর্তি নিয়ে সমালোচনা বাড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার চৌকস কর্মকর্তা শহিদুর রহমানকে র্যাবের মহাপরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। আগামী ১৫ মার্চ তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সূত্র বলছে, নতুন সরকার র্যাবের কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করছে। ফলে র্যাবের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘র্যাবকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে চাপ রয়েছে, তা মোকাবিলায় কূটনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং প্রশাসনিকভাবে দক্ষ একজন কর্মকর্তাকে সামনে আনতে চাইছে সরকার।’ সেক্ষেত্রে ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমানের নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। তিনি এখন রেল পুলিশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের এই কর্মকর্তাও ১৫ ব্যাচের।
ঢাকা মহানগর পুলিশ দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা সামলায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম কয়েক মাসেই রাজধানীতে রাজনৈতিক কর্মসূচি, সম্ভাব্য প্রতিবাদ বা পাল্টা কর্মসূচি বাড়তে পারে। ফলে ডিএমপি কমিশনার পদটিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ১৫ ব্যাচের কোনো এক কর্মকর্তাকে দেখা যেতে পারে। তবে ১৭ ব্যাচের ফারুক আহম্মেদও দৌড়ে আছেন। তিনি বর্তমান র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর তিনি ডিএমপিতে অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কিন্তু একটি দলের চাপে তাকে ডিএমপি থেকে সরিয়ে র্যাবে পোস্টিং দেওয়া হয়। পুলিশের একটি বড় অংশ তাকে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দেখতে চাচ্ছে।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নতুন সরকারের ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মধ্যে প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে পুলিশ ও র্যাবের নেতৃত্বে যে সিদ্ধান্তই আসুক, তা হবে রাজনৈতিক বার্তা ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সমন্বয়ে নেওয়া কৌশলগত পদক্ষেপ। রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়ে এখন সবার নজরÑ কে হচ্ছেন নতুন আইজিপি, কে পাচ্ছেন র্যাবের নেতৃত্ব, আর রাজধানীর নিরাপত্তা কার হাতে যাচ্ছে।
এদিকে সরকারের আইজিপি পদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ডিএমপি কমিশনার পদেও রদবদল হতে পারে। রাজধানীতে সরকারের ভাবমূর্তি অনেকাংশে নির্ভর করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। তাই এখানে বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব চাইবে সরকার,Ñ বলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব।
অতীতে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হয়েছেÑ এমন নজির রয়েছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা হলেও ভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার যদি অতিরিক্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন করে, তাহলে বাহিনীর পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার সম্পূর্ণ স্থিতাবস্থা বজায় রাখলেও রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। ফলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার বানানো হলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিশ্বস্ততা ও পেশাদারত্বের সমন্বয় ঘটানো।
এদিকে বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ইতোমধ্যে পুলিশ বিভাগে শীর্ষ পদে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে শিগগির এসব পদে রদবদল দৃশ্যমান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। সরকার নতুনভাবে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে চাইছে না বলে সূত্রে জানা গেছে।