× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি ও প্লট

বিএনপির নতুন অবস্থান নাকি কৌশলগত চাপ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১২ এএম

বিএনপির লোগো। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপির লোগো। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে ‘সুবিধা’ বনাম ‘সংযম’Ñ এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। তবে এবার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। দলটির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথগ্রহণের পর ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করার কথা জানিয়েছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই সিদ্ধান্তকে কেউ দেখছেন নৈতিক বার্তা হিসেবে, কেউ বলছেনÑ এটি প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর কৌশলগত চাপ তৈরির উদ্যোগ। শুধু তাই নয়, বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিতও হতে পারে। যা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাজনৈতিক নৈতিকতা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং জনপ্রতিনিধিত্বের দর্শনÑ এই তিনটির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে নেওয়া একটি অবস্থান।

দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একান্ত অভিপ্রায়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তারপরও প্রশ্ন হচ্ছে, আইনি কাঠামোয় এই সুবিধার ভিত্তি কোথায়, বাস্তবে এর আর্থিক তাৎপর্য কতটা, আর রাজনৈতিকভাবে এর প্রভাব কত দূর যেতে পারে? 

বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও সুবিধা নির্ধারণের ক্ষমতা আইন দ্বারা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। সেই ভিত্তিতে প্রণীত হয় দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩। পরবর্তী সময়ে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে বেতন, ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধার পরিধি বাড়ানো বা সমন্বয় করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা পান; পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকায় অফিস পরিচালনা, ঢাকায় আবাসন সুবিধা বা ভাতা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও ভ্রমণ ব্যয়Ñ এসব সুবিধা নির্ধারিত আছে। এর বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ বা বিশেষ শুল্কছাড়। একইভাবে, সরকারি নীতিমালার ভিত্তিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে প্লট বরাদ্দের সুযোগও রয়েছে।

আইন এমপিদের এই সুবিধা নেওয়ার অধিকার দেয় কিন্তু তা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়। কোনো এমপি চাইলে লিখিতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। বিএনপির ঘোষণার আইনি ভিত্তি এখানেইÑ অধিকার থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত।

ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু : বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গাড়ি আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি গাড়ির ওপর মোট কর ও শুল্কের হার গাড়ির মূল্যের সমান বা তারও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতায় একজন এমপির শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনার বিষয়। সমালোচকদের যুক্তিÑ জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালনে গাড়ির প্রয়োজন থাকতে পারে কিন্তু শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির সুযোগ সামাজিক বৈষম্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। যেখানে সাধারণ নাগরিককে বিপুল কর পরিশোধ করতে হয়, সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য ব্যতিক্রম হলে তা নৈতিকতার প্রশ্ন।

অন্যদিকে এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধার পক্ষের সমর্থকদের বক্তব্যÑ নির্বাচনী এলাকা বিস্তৃত; নিরাপত্তা ও সময় ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ভরযোগ্য যানবাহন প্রয়োজন। অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই আইনপ্রণেতাদের নির্দিষ্ট ভ্রমণ সুবিধা দেওয়া হয়। তবে পার্থক্য হলো, উন্নত গণতন্ত্রে ব্যয়ের ক্ষেত্রে কঠোর অডিট ও স্বচ্ছতা বজায় থাকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সব এমপি যদি শুল্কমুক্ত গাড়ি নেন, তাহলে রাজস্ব ক্ষতির যে হিসাব দাঁড়াবে তা কিন্তু জাতীয় বাজেটের তুলনায় খুব বড় অঙ্কের নয়। তবে প্রতীকী দিক থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রাজনীতিতে নৈতিকতার প্রশ্ন প্রায়ই অর্থের চেয়ে বড়।

প্লট বরাদ্দ অধিকার না অতিরিক্ত সুবিধা : সংসদ সদস্যদের জন্য সরকারি প্লট বরাদ্দের বিষয়টি অতীতেও বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একাধিক প্লট পেয়েছেন বা বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে বরাদ্দ নিয়েছেন। যদিও নীতিমালার আওতায় এসব বরাদ্দ দেওয়া হয়। তারপরও জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে, জনপ্রতিনিধিরা কি সম্পদ বৃদ্ধির অতিরিক্ত সুযোগ গ্রহণ করবেন? বিএনপির ঘোষণা এই বিতর্কিত ক্ষেত্রেই সরাসরি অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটির নেতারাও বলছেন, জনগণের করের টাকায় বিলাস বা সম্পদ সঞ্চয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাই তাদের লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একদিকে নৈতিক বার্তা, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর ওপরও নৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল।

সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর মনে করেন, ‘রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি প্রশাসনিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন তদারকিতে ভূমিকা রাখেন। তাদের চলাচল ও কাজের জন্য কিছু কাঠামোগত সুবিধা প্রয়োজন। তবে বিলাসবহুল সুবিধা নয়Ñ কাজের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত নীতির ভিত্তি।’

তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে আরও বলেন, ‘যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য স্বেচ্ছায় কিছু সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটি অবশ্যই নৈতিক উচ্চভূমি তৈরি করে। কিন্তু এর পাশাপাশি সরকারেরও উচিত হবে একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা, যাতে ভবিষ্যতে সুবিধা দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টি দলভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে, বরং রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির এই ঘোষণা তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ নিতে হলে প্রয়োজন আইনগত স্বচ্ছতা, বাধ্যতামূলক তথ্যপ্রকাশ এবং দলীয় অবস্থানের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সংস্কারের জন্য আইন সংশোধন ও জবাবদিহিতার কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি।’

আন্তর্জাতিক তুলনা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন : যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে সংসদ সদস্যরা নির্দিষ্ট ব্যয় দাবি করতে পারেনÑ যেমন বাড়িভাড়া, অফিস পরিচালনা বা ভ্রমণ খরচ। কিন্তু সেসব ব্যয় কঠোর অডিটের আওতায় থাকে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। সরাসরি শুল্কমুক্ত বিলাসপণ্য আমদানির সুযোগ সচরাচর নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশে এমপিদের দেওয়া সুবিধা আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকলেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে। কতজন এমপি শুল্কমুক্ত গাড়ি নিয়েছেন, কতজন প্লট পেয়েছেনÑ এই তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না। ফলে বিতর্কের জায়গা তৈরি হয়।

সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা নয়Ñ এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ ও নজরদারির ব্যবস্থা শক্তিশালী করাও জরুরি। তবেই আস্থার সংকট কাটবে। রাজনৈতিক ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে প্রয়োগের ওপর। দলীয়ভাবে ঘোষণা দিলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে ভিন্নতা দেখা দিলে প্রশ্ন উঠবে। আবার, অন্যান্য রাজনৈতিক দল একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের মতে, এতে করে হয়তো রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল সাশ্রয় হবে না। কিন্তু রাজনীতিতে প্রতীক অনেক সময় বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী। দীর্ঘদিন ধরে ‘সুবিধাভোগী রাজনীতি’ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে যদি বড় কোনো দল স্বেচ্ছায় কিছু সুবিধা ত্যাগ করে, তবে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। তবে জনগণের অভিজ্ঞতা বলছেÑ ঘোষণা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান নতুন কিছু নয়। অতীতেও নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এখন নজর থাকবে কার্যকর বাস্তবায়নে। লিখিত প্রত্যাখ্যানপত্র, তথ্য প্রকাশ ও দলীয় শৃঙ্খলা- এসবই হবে পরীক্ষার মানদণ্ড।

এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা নিঃসন্দেহে আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়; বরং রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রকাশ। প্রশ্ন হলোÑ এটি কি এককালীন বার্তা, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সূচনা?’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন শুধু আইনি কাঠামো নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নও। জনপ্রতিনিধিরা যদি সত্যিই সংযম, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পথে হাঁটেন, তবে সেটিই হবে গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি। এখন সময়ই বলবেÑ এই ঘোষণা ইতিহাসে একটি প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে থাকবে, নাকি বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা করবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা