× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আর্থিক দৈন্যদশায় ভাষাশহিদ জব্বারের পরিবার

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০১ এএম

নাতি-নাতনির সঙ্গে ভাষাশহিদ আব্দুল জব্বারের পূত্রবধূ ফিরোজা খাতুন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

নাতি-নাতনির সঙ্গে ভাষাশহিদ আব্দুল জব্বারের পূত্রবধূ ফিরোজা খাতুন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ভাষাশহিদদের কথা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা হয়। অমর একুশে বইমেলায় বাংলা একাডেমিতে তৈরি তোরণে থাকে ভাষা শহিদদের প্রতিকৃতি। এইটুকুতেই শহিদদের নিয়ে কাজ শেষ। তাদের পরিবার-পরিজনদের কোনো সন্ধান ও রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পায় না শহিদ পরিবার। এমনকি তাদের আর্থিক অবস্থা কেমন, পরিবারগুলো কীভাবে চলছে সেই খবরও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাখা হয় না।

তেমনি একটি পরিবার হচ্ছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহিদের অন্যতম আবদুল জব্বারের। পরিবারটি প্রবল আর্থিক অনটনের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। শহিদ পরিবার হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে যে অনুদান পেত সেটিও ২০২২ সাল থেকে বাতিল করা হয়েছে।

শনিবার যখন সবাই কেন্দ্রীয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শহিদ মিনারগুলোতে ফুল দিয়ে ভাষাশহিদদের স্মরণ করছিলেন ঠিক সেই সময় আবদুল জব্বারের উত্তরসূরিরা রাজধানীর তেজগাঁওস্থ ১৬৫/এ/১ নাম্বার তেজকুড়িপাড়ায় বাসায় বসে বসে তাকে স্মরণ করছিলেন।

উল্লেখ্য, আবদুল জব্বার ১৯১৯ সালের ১১ অক্টোবর ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হাসান আলী এবং মাতা সাফাতুন নেছা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সংগ্রামী জনতার বিশাল সমাবেশে অংশ নেন। এ সময় পুলিশ সমাবেশে গুলি চালালে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ঐদিন রাতে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আবদুল জব্বারের মৃত্যু হয়। তাকে আজিমপুর গোরস্তানে সমাহিত করা হয়।

শনিবার বেলা ১১টায় তেজগাঁওস্থ আবদুল জব্বারের ছেলের বাসায় গিয়ে কথা হয় তার পুত্রবধূ ফিরোজা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার শ্বশুর আব্দুল জব্বার ছিলেন কৃষকের ছেলে। তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। আবদুল জব্বারের একমাত্র ছেলে তার স্বামী মো. নুরুল ইসলাম বাদলকে কয়েক মাসের শিশু অবস্থায় রেখে শহিদ হন আবদুল জব্বার। পরবর্তীতে তার শাশুড়ির অন্যত্র বিয়ে হয়। আর আবদুল জব্বারের ছেলের সংসারে তিন ছেলে-মেয়ের জন্ম হয়। তাদের মধ্যে লুৎফুন্নাহার শোভা, আফরোজা খানম রোভা, ছেলে ফারজুল ইসলাম বিজয়। বড় মেয়ে হেলথে চাকরি করে। মেয়েগুলোকে তেমন কোনো সচ্ছল পরিবারে বিয়ে দেওয়াও সম্ভব হয়নি। ফিরোজা খাতুন বলেন, আমার স্বামী সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। তিনি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে সংসারে আর্থিক টানাপড়েন চলছে। ছেলে বিজয় প্রতিবন্ধী, কোনো কাজ করতে পারে না। ছোট একটি স্টেশনারি দোকান থাকলেও বেচাকেনা তেমন নেই। 

সরকারি অনুদান সম্পর্কে ফিরোজা খাতুন বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমার স্বামীকে তেজগাঁও পোস্ট অফিসের কাছে রেলওয়ে থেকে সাড়ে তিন কাঠা জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন। পাশাপাশি মাসিক ১০ হাজার টাকা করে অনুদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। বাড়ি করার জন্য আলাদা কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। আমার স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তা বাতিল করে দিয়েছে সরকার। তিনি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন। সাধারণত ২১ সালের টাকা ২২ সালের জানুয়ারিতে দেওয়া হতো। কিন্তু ২১ সালের পর যে ৮ মাস বেঁচেছিলেন সেই টাকাও দেওয়া হয়নি। 

তিনি বলেন, আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১০ আগস্টে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহকারী সিনিয়র সচিব মো. সগীর হোসেন স্বাক্ষরিত এক স্মারকে জানানো হয়, ‘ভাষাশহিদ পরিবারকে প্রদত্ত কল্যাণ ভাতা শুধু তার স্ত্রী (আবদুল জব্বারের), পিতা/মাতা বা তাদের অবর্তমানে পুত্র পাবেন। তাই পুত্রবধূ ফিরোজা খাতুনকে অনুদানের অর্থ দেওয়ার সুযোগ নেই।’

বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের সেমিপাকা বিল্ডিং। পুরনো জরাজীর্ণ ও আস্তরণহীন দেয়াল। বাড়িতে দুটি ইউনিটে রান্নাঘরসহ ৫টি করে রুম রয়েছে। এক ইউনিটে ফিরোজা খাতুন, তার নাতি-নাতনিদের নিয়ে থাকেন। অপরটি মাসিক ২৫ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়েছে। স্বামীর পেনশনের অল্প কিছু টাকা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। এই সামান্য টাকা দিয়ে প্রতিবন্ধী ছেলের ওষুধপত্র, নিজেদের সংসারের ভরণপোষণ চালানো হয় বলে জানান ফিরোজা খাতুন। 

ফিরোজা খাতুন বলেন, সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় না। কোনো ধরনের সহযোগিতাও পাই না। তাই আমাদের দাবি সরকারের পক্ষ থেকে বাড়িটি করে দিলে ভাড়া দিয়ে সংসারের খরচ বহন করা যেত। 

বাসায় কথা হয় আবদুল জব্বারের প্রপৌত্র আহনা সাকিফ ও প্রপৌত্রী কামরুন্নাহার শিলার সঙ্গে। মিরপুর সরকারি কলেজে এইচএসসিতে অধ্যায়নরত শিলা বলেন, ভাষাশহীদ পরিবার হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয় না। দেশে ভাষাশহীদদের মাত্র ৫টি পরিবার। তা ছাড়া আমার নানা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা সহযোগিতা ও কোনো অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পাই না। আর আমরা বস্তি এলাকায় থাকি, যা খুবই নাজুক অবস্থা। 

এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়নরত আহনাফ সাকিফ বলেন, আমরা ভালো পরিবেশে আছি বিষয়টি এমন না। আমার বড় আব্বা আবদুল জব্বার ভাষাশহীদ ও নানা মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও সরকারের কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। নানা বেঁচে থাকাবস্থায় রাষ্ট্রীয় কিছু অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেতেন। তিনি জানান, আবদুল জব্বারের জন্মস্থান ময়মনসিংহের গফরগাঁও থানায় সরকারিভাবে কোনো স্থাপনা করেনি। সাকিফ আরও বলেন, আমরা নিজেদের জন্য কিছু প্রত্যাশা করছি না। তবে ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারের স্মৃতি রক্ষার্থে যেন কিছু করা হয়। তা ছাড়া তার পুত্রবধূর জন্য আর্থিক সহযোগিতা ও বাড়িটি নির্মাণে সহায়তা করা হোক। 

ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারের পরিবারকে আর্থিক অনুদান অব্যাহত রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার নির্বাহী অফিসার এন. এম. আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, আমি জানতে পেরেছি জব্বার সাহেবের ছেলে ২০২১ সালে মৃত্যুর পর সরকারি অনুদান বাতিল করা হয়েছে। আসলে অনুদানের ব্যাপারটি সরকারি একটি নীতিমালার মাধ্যমে চলে। তবে আমরা তাদের পরিবারকে জানিয়েছি তারা যেন সরকারের কাছে আবেদন করে। তাদের আবেদনে সরকার যাতে সাড়া দেয় আমরা সে ধরনের ব্যবস্থা নিতে নোট দেব। 

গফরগাঁওয়ে অবস্থিত ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার লাইব্রেরি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার ভেতরে। লাইব্রেরিতে ৪ হাজারের মতো বই আছে। 

জব্বারের পরিবারের উত্তরসূরিদের আর্থিক টানাপড়েন সমাধানে সরকারি সহযোগিতার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সহযোগিতা করছি। আর তাদের আর্থিক সমস্যা সমাধানে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আমরা সরকারের উপরমহলে তা পাঠাব সমাধানের জন্য। পরিবারটি যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাহলে আমরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করব।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা