সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০১ এএম
কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার । ছবি: সংগৃহীত
আমরা বলে থাকি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই পূর্ববঙ্গ এগিয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। বাড়িয়ে বলি না। সংগ্রামমুখর এই যাত্রাপথে অর্জন ও বর্জন দুটোই ঘটেছে। প্রভাতফেরিতেও দেখা যাচ্ছে বর্জনের ঘটনা। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় প্রভাতফেরি বলতে গেলে এখন বর্জিতই।
একুশে ফেব্রুয়ারির উদযাপন এখনও হয়, আগের সময়ের চাইতে অধিক আনুষ্ঠানিক আড়ম্বরের সঙ্গেই হয়, কিন্তু আগের সেই প্রভাতফেরি আর নেই। উদযাপন এখন প্রভাতে শুরু হয় না। শুরু হয় মধ্যরাতে, রাত ১২টা ১ মিনিটে। প্রভাতফেরি তো মধ্যরাতের ব্যাপার হতে পারে না, ব্যাপার সেই প্রভাতেই এবং আমাদের প্রভাত রাত ১২টা বেজে ১ মিনিটের মাহেন্দ্রক্ষণে আরম্ভ হয় না, শুরু হয় সূর্য ওঠার সময়ে, সকালবেলা যখন পাখি জেগে ওঠে, প্রকৃতির ঘুম ভাঙে, মানুষ দিনের কাজ শুরু করে। বাংলা ভাষায় ‘বারটা বাজা’ কথাটা সুখের খবর দেয় না, বিপদের ঘণ্টা বাজায়।
শহীদ দিবসের আয়োজনকে রাত ১২টায়
নিয়ে যাওয়াতে বেশ একটা নাটক ঘটার সুযোগ থাকে। তাকে অতিনাটকও বলা চলে। কর্তাদের সুবিধা
হয়, তাদের কর্তৃত্ব প্রকাশের আরও একটি সুযোগ তাদের হাতে এসে যায়। ক্ষতি হয় এই দিবসটির
অন্তর্গত প্রাণের। সংকুচিত হয়ে যায় তার স্বতঃস্ফূর্ততা ও স্বাভাবিকতা। বিঘ্ন ঘটে সাধারণ
নাগরিকদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে। একেবারে শুরু থেকেই প্রভাতফেরিতে মেয়েদের অংশগ্রহণটা
ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রত্যাশিত ছিল বছরে বছরে সেটি বৃদ্ধি পাবে। মধ্যরাতে চলে যাওয়াতে
মেয়েরা আর আগের মতো আসে না, এলেও স্বচ্ছন্দবোধ করে না। বোরখা ও হিজাবের সংখ্যাবৃদ্ধি
প্রত্যুষের সহযাত্রী নয়, সহযাত্রী সে রাত্রির।
তা একুশে ফেব্রুয়ারিকে হঠাৎ
করে মধ্যরাতে নিয়ে যাওয়া হলো কেন? কার প্ররোচনায়? কোন কারণে? ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কেউ
ভেবেছেন। তারা আপত্তিও করেছেন। বলেছেন এটা হচ্ছে বিজাতীয় সংস্কৃতির আক্রমণ। কথাটা তো
ঠিক। মধ্যরাতে উদযাপন শুরু করাটা বিজাতীয় বৈকি। ওটি ইউরোপীয় প্রথা। ইউরোপীয়দের নববর্ষ
মধ্যরাতেই শুরু হয়, আমাদের পহেলা বৈশাখ অতিপ্রত্যুষের ঘটনা। মাঝরাতের অন্ধকার বা কৃত্রিম
আলো কোনোটাতেই, কখনোই আমাদের আগ্রহ ছিল না। থাকার কথা নয়। অন্ধকারকে চিরকালই আমরা ভয়ংকর
বলে মনে করি। ভয় এখনও করি। তাহলে কী করে ঘটল এই ভীতিকর ও ভৌতিক ঘটনা?
শহীদ দিবস এখন ইউরোপ আমেরিকাতেও
উদযাপিত হচ্ছে। বাঙালিরা করছেন এবং ইউরোপীয় প্রথার অনুরোধে তাদের প্রভাতফেরির অনুষ্ঠান
মধ্যরাতেই ঘটছে। প্রভাতফেরিকে মধ্যরাতে পাঠিয়ে দেওয়াটা কি এর প্রভাবেই ঘটল? বোধ হয়
না, কতিপয় প্রবাসী বাঙালি অতটা প্রভাবশালী নন যে, প্রভাতকে ঠেলে দেবেন রাত দুপুরের
দোরগোড়ায়। ঘটেছে আসলে পুঁজিবাদের প্রভাবে। পুঁজিবাদী বিশ্ব ধনী ও প্রভাবশালী। দরিদ্র
বিশ্বকে সে শোষণ করে, তাকে গরিব করে রাখে এবং নিজের সাংস্কৃতিক বলয়ের ভেতর টেনে আনে
ও ধরে রাখে। যাকে বিজাতীয় সংস্কৃতি বলছি তার জোরটা বিজাতীয়তার ভেতর নেই, রয়েছে অন্তর্গত
পুঁজিবাদের ক্ষমতার ভেতর। তা ছাড়া
বিজাতীয় সংস্কৃতি জিনিসটা অভিন্ন কোনো বস্তু নয়, তার জাতিভেদ আছে;
আমাদের শহীদ দিবসের ওপর নির্দিষ্ট কোনো জাতি প্রভাব ফেলতে পারেনি, প্রভাব ফেলেছে অভিন্ন
পুঁজিবাদী সংস্কৃতি। ফেলতে পেরেছে কারণ সে পুঁজিবাদী।
পুঁজিবাদ যে আমাদের জাতীয়
আদর্শ হয়ে দাঁড়াবে তার কিছু কিছু আলামত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন
দুর্বার হয়ে উঠছিল সেই শুভক্ষণেই পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে প্রভাতফেরির ওই মধ্যরাত্রি
গমনের ঘটনাতেও। ঘটনাটি ঘটল ১৯৭০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতেই। যুদ্ধের পরে জনগণের মুক্তি
আসুক না আসুক, পুঁজিবাদের মুক্তি যে এসেছিল তাতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। ধারাবাহিকভাবে
এগিয়ে এখন তো আমরা পুরোপুরিই পুঁজিবাদীই হয়ে গেছি। মধ্যরাত গ্রাস করে ফেলেছে প্রভাতফেরিকে।
জাতীয়তাবাদীদের অধিকাংশই,
বলতে গেলে প্রায় সবাই, ছিলেন পুঁজিবাদে বিশ্বাসীÑ ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলে
সেটা সত্য ছিল, মিথ্যা হয়ে যায়নি বাংলাদেশ আমলেও। মুক্তির সংগ্রামে জাতীয়তাবাদীরা ছিলেন,
সমাজতন্ত্রীরাও ছিলেন। বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে উভয় ধারার মানুষ সংগ্রাম করেছেন। সমাজতন্ত্রীদের
সংগ্রামে আপসের কোনো জায়গা ছিল না। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদীরা ছিলেন আপসপন্থী।
জাতীয়তাবাদী ইংরেজের বিরুদ্ধে
তারা লড়ছিলেন। বৈরিতার অন্তরালে ওই জাতীয়তাবাদীদের এক জায়গাতে চমৎকার মিল ছিল। সেটা
হলো পুঁজিবাদে বিশ্বাস। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের মতোই স্থানীয় জাতীয়তাবাদীরাও ছিলেন
পুঁজিবাদে বিশ্বাসী। দুই পক্ষের ভেতর সমাজতন্ত্রবিরোধিতার ব্যাপারে একটি অলিখিত সমঝোতা
ছিল। কারণ দুপক্ষই জানত যে জাতীয়তাবাদীরা জয়ী হলে কেবল ক্ষমতার হস্তান্তরই ঘটবে, কোনো
বিপ্লব ঘটবে না, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো রূপান্তরিত হয়ে যাবে না, কাঠামো আগের মতোই
থাকবে। ক্ষমতাধর বিদেশি শাসকদের এটা জানা ছিল যে কাঠামোটা ভেঙে পড়লে তাদের পাততাড়ি
খাটানোটা একেবারে আগাপাছতলার ব্যাপার হবে। দেশীয় হবু শাসকদেরও এটা না জানার কারণ ছিল
না যে বিপ্লব ঘটে গেলে ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে না, আম তো যাবেই, ছালাও যাবে। তারা
যে আত্মত্যাগ করেছেন সেটা তো ক্ষমতা হারাবার জন্য নয়, স্থায়ীভাবে ক্ষমতালাভের জন্য
বটে। বিদেশিদের ভাগিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতাপ্রাপ্ত নতুন শাসকরা তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে
আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন।
পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের পিতা
বলে গণ্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অসন্দিগ্ধরূপে পুঁজিবাদী ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার
ঠিক পূর্বমুহূর্তে একবার তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ হবে ধর্মনিরপেক্ষ।
ধর্মনিরপেক্ষতা পুঁজিবাদের জন্য প্রয়োজন, প্রয়োজন সমাজতন্ত্রের জন্যও। জিন্নাহ তার
রাষ্ট্রকে পুঁজিবাদী গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার কথা ওই একবার হলেও
বলেছিলেন; এরপরই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে উর্দু ব্যবহারকারী পুঁজিবাদী অবাঙালিরা একটি অতিরিক্ত অস্ত্র
নাগালের মধ্যে পেয়ে যেত, যেটিকে তারা বাঙালিদের ওপর আধিপত্য স্থাপনের কাজে ব্যবহার
করত। আধিপত্যের ওপরের আবরণটা সামন্তবাদী হলেও, ভেতরের ধ্যান ও ধরনটা ছিল পুরোপুরি পুঁজিবাদী।
উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পরিকল্পনার কথা তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে
উপস্থিত হয়ে ঘোষণা করেন, তখন ছাত্রদের ভেতর মৃদু হলেও প্রতিবাদের একটা আওয়াজ উঠেছিল।
প্রতিবাদকারী ছাত্রদের তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রভাষা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে নিজের
চরকায় তেল দিতে। বলেছিলেন, পাকিস্তান হওয়াতে তোমাদের সামনে উন্নতির সব দুয়ার খুলে গেছে;
যাও, সুযোগ নাও, উন্নতি করো। নতুন রাষ্ট্রের কাছ থেকে খাঁটি পুঁজিবাদী পথনির্দেশ বৈকি।
একজন পুঁজিবাদীর পক্ষে এর চেয়ে ভালো পরামর্শ আর কী-ই বা হতে পারত।
ছাত্ররা অবশ্য তার পরামর্শ
শোনেনি। তারা রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে আওয়াজ দিয়েছে। আওয়াজ দিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে
দাঁড়িয়ে গেছে। নির্যাতন ভোগ করেছে। এই ছাত্ররা পুঁজিবাদী ছিল না। ১৯৫২-তে মুসলিম লীগবিরোধী
বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ছিলেন না। কারণ তাদের অধিকাংশই ছিলেন
পুঁজিবাদী, তাদের চোখ ছিল সম্ভাব্য নির্বাচনের দিকে, তারা চাইছিলেন মুসলিম লীগকে হটিয়ে
দিয়ে ক্ষমতার গদিগুলোতে নিজেরা বসে পড়বেন।
বায়ান্নর পরে ঊনসত্তর এসেছে।
ঊনসত্তরের জনঅভ্যুত্থানটা ছিল পুরোপুরি পুঁজিবাদবিরোধী। আওয়াজ বের হয়ে এসেছিল, ‘কেউ
খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না।’ হরতাল তখন কেবল শহরে নয় গ্রামের হাট-বাজারেও
হয়েছে। শ্রমিকরা কারখানার মালিককে ঘেরাও করেছে। গ্রামের মানুষ গণআদালত বসিয়ে শাস্তি
দিয়েছে চোরাচালানকারী ও গরু চোরদের, তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে তহসিল অফিস, যে অফিসের কাছে
ছিল রাষ্ট্রীয় জমিদারতন্ত্রের প্রতিভূ। জনঅভ্যুত্থানের চালিকাশক্তি ছিলেন বামপন্থীরা।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ঊনসত্তরের
ওই অভ্যুত্থানেরই পরবর্তী পদক্ষেপ। সেই যুদ্ধেও সমাজতন্ত্রীরা ছিলেন, কিন্তু নেতৃত্ব
দিতে পারেননি। যদি পারতেন তাহলে যুদ্ধের পদ্ধতি এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্র ও সমাজের স্বভাব-চরিত্র
সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। আমাদের মস্ত বড় দুঃখ যে সেটা ঘটেনি। প্রভাতফেরির হারিয়ে যাওয়াটা
সেই দুঃখেরই অংশ। পুঁজিবাদ সবকিছুকেই গ্রাস করে ফেলতে চায়, সমাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলন
ও অর্জনকে চায় নিশ্চিহ্ন করে দিতে।
কেউ কেউ বলছেন, প্রভাতফেরিকে
ফেরত আনা চাই। এই কাজটা কিন্তু সহজ হবে না। ফেরত আনা গেলেও সেটা হবে নিতান্ত দায়সারা
গোছের, কারণ ইতোমধ্যে পরিবেশ ও পরিস্থিতি বদলে গেছে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে সমাজতান্ত্রিক
স্বপ্ন ছিল সেটা এখন আর অটুট নেই; উল্টো পুঁজিবাদী বিকাশই এখন প্রধান সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্ন পর্যুদস্ত হয়েছে ব্যক্তিগত উন্নতির স্বপ্নের পদতলে। তিন ধারার
শিক্ষার ভেতর যে শ্রেণিবৈষম্য কার্যকর সেটির বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চিকিৎসা ও শিক্ষা
পণ্যে পরিণত হয়ে গেছে। ব্যক্তি মালিকানা সামাজিক মালিকানাকে পদে পদে দলিত, মথিত করছে।
গণধর্ষণ ছিল অকল্পনীয়, সেটা ঘটছে। শিশু ধর্ষণের খবর পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে।
না, প্রভাতফেরিকে ফেরত আনা সম্ভব নয়। মধ্যরাত তাকে দখলে নিয়ে নিয়েছে। এখন দরকার নতুন গান, নতুন সুর এবং নতুন পথে অগ্রযাত্রা। সে অগ্রযাত্রায় নতুন সুরে নতুন গান আমরা আমাদের জাতীয় সংগীতের সঙ্গে মিলিয়ে গাইব; সে গান পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রামে আমাদের উদ্দীপ্ত করবে। মিছিল চলবে; সামনের দিকেই।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়