ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৮ এএম
অনুসন্ধানে এমন অভিযোগ মিলেছেÑ এদেশে অবস্থানকারী কোনো কোনো বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণÑ এমন কার্যক্রমে জড়িত রয়েছেন। বিগত সরকারের আমলেই রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত এই বিদেশিদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে; তারপরও তারা এদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন।
এমন গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি দুই চীনা নাগরিককে কালো তালিকাভুক্ত ও বহিষ্কার করেছে সরকার। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তারা হলেনÑ ইয়ংজুন সং (পাসপোর্ট নম্বর : ইজে ৬৫৫৯৭২৫) ও হুয়ানমিং হুয়াং (পাসপোর্ট নম্বর : ইকে ১৪৮০৭৭৮)। একই সঙ্গে ১৯৪৬ সালের দ্য ফরেন অ্যাক্ট-এর ৩(১) ধারার আওতায় তাদের বাংলাদেশ থেকে অবিলম্বে বহিষ্কার এবং ভবিষ্যতে দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা ব্যবসার নামে বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রমাণ পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান জেএইচপি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করেছে। এদের দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন মো. কাওসার। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সাবেক রাজনৈতিক সরকারের আমলে এমন ঘটনা ঘটলেও উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকারের নীরবতার সুযোগে তারা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের শুরু থেকেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে শূন্য সহনশীলতার নীতিগত অবস্থান নেওয়া হয়। কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সরকারের দুটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ওই তদন্তে দুই চীনা নাগরিকের কর্মকাণ্ডকে ‘ভিসাবিধি লঙ্ঘন’ এবং ‘অননুমোদিত যোগাযোগ ও লেনদেন’-এর আওতায় চিহ্নিত করে সংস্থা দুটি। অনুসন্ধানে উঠে আসে, তারা অফিসিয়াল ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন এবং তাদের কার্যক্রমের ধরনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট তথ্য আদান-প্রদানের ইঙ্গিত রয়েছে। শুধু অভিবাসন আইন লঙ্ঘন নয়, বরং গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করার পর সরকার এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান জেএইচপি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এই দুই চীনা নাগরিককে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করেছে। এ অবস্থায় স্থানীয় সহযোগী ও মধ্যস্থতাকারী দোভাষীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও দোভাষীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে এদের মাধ্যমেই আইন লঙ্ঘন, তথ্য সংগ্রহ কিংবা অবৈধ আর্থিক লেনদেন সহজ হয়। এ ঘটনায়ও এমন ঘটেছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিডা) এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি দেওয়ার বিষয়টি থেকে অনেক পর্যবেক্ষকই ধারণা করছেন যে, ঘটনাটি কেবল অভিবাসন বা আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত নয়; এটি বিদেশি বিনিয়োগ যাচাই ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন; কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যায় না। বিনিয়োগের আড়ালে যদি কেউ অপ্রকাশিত বা গোয়েন্দা তৎপরতায় যুক্ত হয়, তাহলে সেটি রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।’ তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিক উপস্থিতির আড়ালে তথ্য সংগ্রহ ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা বাড়ছে, যা সরকারগুলোকে আরও সতর্ক হতে বাধ্য করছে।’
বিদেশি নাগরিকদের ভিসা নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত দুই বছরে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ও অবস্থানকালীন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার বিদেশি অবৈধ অবস্থানের কারণে দেশ ত্যাগ করেছেন। তবে এখনও প্রায় ৩৩ হাজার বিদেশি বৈধ অনুমতি ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ফরেন অ্যাক্ট, ১৯৪৬ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত অননুমোদিত অবস্থানকারীদের বৈধ করার জন্য একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপরও আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এতে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, পুলিশের বিশেষ শাখা, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এবং বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুমোদন ছাড়া চীনা নাগরিকদের উপস্থিতি নতুন নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে খাগড়াছড়িতে অনুমতি ছাড়া প্রবেশের দায়ে দুই চীনা নাগরিককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করা হয়। স্থানীয়ভাবে ঘটনাটিকে ‘বিধি অমান্য’ হিসেবে দেখলেও, এসব ঘটনা মিলিয়ে কোনো কোনো বিদেশি নাগরিকের কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ-সংশয় ঘনীভূত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দ্য ফরেন অ্যাক্ট, ১৯৪৬-এর ৩ (১) ধারা সরকারকে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ, অবস্থান ও বহিষ্কারের ব্যাপারে পূর্ণ ক্ষমতা দেয়। এই আইনের প্রয়োগ মানে রাষ্ট্র মনে করছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী। কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে তাদের ভিসা আবেদন কিংবা তৃতীয় দেশের মাধ্যমে প্রবেশের চেষ্টাও কঠোর নজরদারির মুখে পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা কেবল দুজন বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ যাচাই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার একটি স্পষ্ট বার্তা।’