ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩২ এএম
চাল। ছবি: সংগৃহীত
চাল নিয়ে দেশে চালবাজি থামছেই না। কৃষকরা বলছেন, ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। অপরদিকে সরকার বেসরকারি পর্যায়ে ২ লাখ টন সিদ্ধ চাল আমদানির অনুমতি দিয়ে বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার হাত থেকে রক্ষার চিন্তা করেছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। আবার ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতীয় নাজিরশাইল চাল আমদানি না হওয়ায় চালের দামও কিছুটা বেড়েছে।
কেন চাল আমদানি : আমদানির কারণ হিসেবে বিগত সরকার জানিয়েছিল, সম্প্রতি সরু চালের বাজারদর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাঝারি ও মোটা চালের দর আপাতত স্থিতিশীল। তবে সরু চালের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতার ন্যায় মাঝারি ও মোটা চালের বাজারও বৃদ্ধি পেতে পারে। এক্ষেত্রে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই আশঙ্কা সামনে এনে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ভাঙাদানাবিশিষ্ট ২ লাখ টন সিদ্ধ চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। ২৩২টি প্রতিষ্ঠানকে ৫টি শর্তে এসব চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সংগ্রহ শাখা। শর্তের মধ্যে রয়েছেÑ বরাদ্দপ্রাপ্ত আমদানিকারকদেরকে আগামী ১০ মার্চের মধ্যে সমূদয় চাল বাংলাদেশে বাজারজাত করতে হবে; আমদানিকৃত চালের পরিমাণ, গুদামজাত ও বাজারজাতকরণের তথ্য সংশ্লিষ্ট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে অবহিত করতে হবে; বরাদ্দের অতিরিক্ত আইপি (ইমপোর্ট পারমিট) ইস্যু/জারি করা যাবে না; আমদানিকৃত চাল অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে পুনঃপ্যাকেটজাত করা যাবে না এবং আমদানিকৃত বস্তায় চাল বিক্রয় করতে হবে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি : রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় কথা হয় সুমি ভ্যারাইটি স্টোরের মাসুদ ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, বর্তমানে মোটা চাল ৬৫ টাকা কেজি, মিনিকেট ৮৫-৯০ টাকা ও নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮৫ টাকা কেজিতে। গত ১৫-২০ দিন ধরে চালের দাম বাড়তির দিকে। অপর বিক্রেতা ভাই ভাই স্টোরের মাহবুবুল আলম বলেন, দেশে ভারতীয় নাজিরশাইল চাল বেশি চলে। এসব চাল আমদানি না হওয়ায় কেজি প্রতি চালের দাম বেড়েছে ২-৩ টাকা।
সরকারি গুদামে সর্বোচ্চ পরিমাণের মজুদ : গুদামে কী পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য মজুদ আছে তার হিসাব কয়েকদিন পরপর দিয়ে থাকে মন্ত্রণালয়। গতকাল ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাল মজুদ রয়েছে ২২ লাখ ১৪ হাজার ১৬১ টন, গমের মজুদ ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৪০ টন, ধানের মজুদ ১০ হাজার ৩৫৪ টন।
চালের উৎপাদন কত : দেশে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আউশ, আমন ও বোরোসহ তিন মৌসুমেই বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ১৯ লাখ টন, যা গত অর্থবছরের চেয়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। বোরো মৌসুমে হয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখ টন, আমনে ১ কোটি ৬৫ লাখ টন এবং আউশে ২৮ লাখ টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমন মৌসুমেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আভাস রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কাটা শেষ হয়েছে ৫৩ লাখ ৭১ হাজার হেক্টর জমির ধান। গড়ে প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ১১ টন হিসাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। বাকি জমির ধান সংগ্রহ হলে আমনের মোট উৎপাদন দুই কোটি টনের মতো দাঁড়াতে পারে।
আমন সংগ্রহের অবস্থা : এদিকে সরকার আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ৬ লাখ টন সিদ্ধ চাল, ৫০ হাজার টন আতপ এবং ৫০ হাজার টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়। সেখানে প্রতি কেজি সিদ্ধ চালের সংগ্রহ মূল্য ৫০ টাকা, আতপ ৪৯ টাকা এবং ধান ৩৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে সারা দেশে আমন মৌসুমের ধান-চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে, চলবে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
এদিকে গত ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আমন ধান সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৮১ টন, সিদ্ধ চাল ৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫২০ টন, আতপ চাল সংগ্রহ হয়েছে ৭০ হাজার ৫৬৭ টনসহ মোট ১০ লাখ ২৯ হাজার ৬২৪ টন।
খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বেশকিছু দিন ধরে চিকন চালের দাম বাড়ছে। এটি মূলত উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। এখন কৃষকদের কাছে চিকন চাল নেই। সেজন্য বাজার স্থিতিশীল রাখতেই কিছু চাল আমদানি করা হচ্ছে।
এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোটা ও মাঝারি মানের চালের বাজার ঠিকই আছে। সরকারের পলিসি হচ্ছে চিকন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। কেননা তাদের কাছে এখন ধান নেই। আগামী মে-জুন মাসে তারা ধান পাবেন। তখন তারা ভালো ধান পাবেন।
চলতি আমন ধান ও চাল সংগ্রহ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বছর স্থানীয় বাজারে আমাদের দামটা ভালো ছিল। কৃষক ও মিলমালিকরা ধান ও চাল দিয়েছে। ধান, সিদ্ধ ও আতপ চাল মিলে ৭ লাখ টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আমরা ১০ লাখ টন সংগ্রহ করেছি। শুধু ধানই সংগ্রহ করেছি দেড় লাখ টন। যা আগে এত পরিমাণ ধান সংগ্রহ হতো না। মো. মনিরুজ্জামান বলেন, স্থানীয় বাজার থেকে চাল কিনতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা বেচে যায়। এ বছর দাম ভালো দেওয়ায় কৃষকরা বেশি এসেছেন।
ধান-চালের বাজারে ধস : বগুড়ার কৃষক ইমরান হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমানে বগুড়ায় মোটা ধান ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। বাজারে ধানের চাহিদা তেমন নেই। এক বিঘায় ধান পাওয়া যায় ১৪-১৫ মণ। বিঘাপ্রতি ব্যয় হয় ১২-১৩ হাজার টাকা। ১৩০০ টাকা মণে বিক্রি হলে আমরা ২০ হাজার টাকার মতো দাম পাই। কিন্তু এখন বাজারে ধানের চাহিদা তলানিতে। এ অবস্থায় চাল আমদানি আমাদের কৃষকদের জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের চালের অভাব নেই। তবু সরকার কেন আমদানি করছে, তা জানি না। ধান-চালের বাজারে ধস নেমেছে। স্বর্ণাজাতীয় ধানের বাজার ছিল ১১৫০ থেকে ১২০০ টাকা; সেটি বুধবারে এসে নেমেছে ১০৫০ থেকে ১১০০ টাকায়। স্বর্ণা চাল ছিল ৪৬-৪৭ টাকা, সেটি কমে ৪৪-৪৫ টাকায় নেমেছে। জিরাশাইল বা মিনিকেট ৭০-৭২ টাকা ছিল; এখন ৬৫-৬৬ টাকা। কাটারিও একই ধরনের। আমদানির সিদ্ধান্তের কারণে চালের দাম কমে গেছে। ফরহাদ হোসেন বলেন, আমাদের দেশীয় চাল যেমন বিক্রি নেই, তেমনি ভারতীয় চালও বিক্রি হচ্ছে না। আমদানিকারকরা বিক্রি করতে পারছেন না।
তিনি বলেন, বাজারে চালের অভাব নেই। ধানের দাম কমানোর জন্য প্রশাসন ভুল তথ্য দিচ্ছে। আমি ডিজি অফিসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেছি। তারা জানিয়েছেন, চাল আমদানির ব্যাপারে সরকারকে তারা প্রস্তাব দেননি। ফরহান হোসেন বলেন, কৃষকরা ধানের দাম পাচ্ছেন না। এ অবস্থা হলে আগামীতে ধান চাষে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে হবে : সরকার তাড়াহুড়া করে চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এটির প্রয়োজন ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, প্রথমত. বর্তমানে সরকারি গুদামে ১৯ লাখ টনের বেশি খাদ্যদ্রব্য মজুদ আছে। এ বছর আমনের ফলনও ভালো। বাজারে সরবরাহ সংকট নেই। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো বাজারে চালের দাম এক-দুই টাকা বাড়ে-কমে। এ ভরা মৌসুমে আমদানির কোনো দরকার নেই। ইতোমধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে সরকার ৬ লাখ টন চাল আমদানি করেছে। আবার সরকারিভাবে ৯ লাখ টন আমদানির বাজেট ধরা হয়েছে, সেখানে ৬ লাখ টন আমদানি করে ফেলেছে। এই অবস্থায় তাড়াহুড়া করে ২ লাখ টন চাল আমদানির কোনো দরকার ছিল না। দ্বিতীয়ত. আগামীতে রাজনৈতিক সরকার আসছে। তারা পরিস্থিতি রিভিউ করবে, স্টক রিভিউ করবে, উৎপাদন পরিস্থিতি দেখবে। তাদের পুনর্বিবেচনা করার সময় দেওয়া দরকার। বাজারে চালের অভাব নেই, সাংঘাতিকভাবে দামও বেড়ে যায়নি। তাই উৎপাদন মৌসুমে চাল আমদানি করা দেশের কৃষকদের জন্য ক্ষতিকর।
তৃতীয়ত. চাল আমদানি করলে কিন্তু ভোক্তাপর্যায়ে দাম কমবে না। কেননা আমদানিকারকরা তো বাজারদরে বিক্রি করবে। আমদানি দামে বিক্রি করবে না। সেক্ষেত্রে বাজারের অবস্থা যা আছে তা-ই থাকবে। মাঝখানে আমদানিকারকরা মুনাফা করে নেবে। এখন চাল আমদানির দরকার ছিল না। এ বছর হয়তো চালের আমদানি করারই দরকার হবে না। চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে হবে।