স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
নূর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২২ এএম
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৩ এএম
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ঘিরে ভুক্তভোগী ও বঞ্চিত পুলিশদের প্রত্যাশা এখন তুঙ্গে। ওএসডি, অকারণ বদলি, পদোন্নতি বঞ্চনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগে ভারাক্রান্ত প্রশাসনের একাংশ এখন স্পষ্ট করেই বলছে, বদলের সময় এখনই। আর সেই বদলের প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। কারণ জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকসহ নানা কর্মকাণ্ডে বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়ায় প্রশংসায় ভাসছেন বিএনপির প্রভাবশালী এই নেতা। এ কারণে আশায় বুক বাঁধছেন পুলিশের বঞ্চিতরা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানায়,
বিগত সরকারের আমলে কনস্টেবল থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত অনেকে অকারণ
বদলি, ওএসডি ও পদোন্নতি বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। দলীয় বিবেচনায় পদায়ন ও পদোন্নতির সংস্কৃতি
প্রশাসনের পেশাদারত্বকেও করে রেখেছিল প্রশ্নবিদ্ধ। আবার জুলাই-পরবর্তী সময়েও নানা ধরনের
অবিচার করা হয়েছে পুলিশের একটি অংশকে। এর মধ্যে ফ্যাসিস্ট ট্যাগ দিয়েও অনেক মেধাবী
পুলিশ কর্মকর্তাকে এখনও সংযুক্ত ও সাসপেন্ড করে রাখা হরেছে। বিশেষ একটি দলের সুপারিশপ্রাপ্তরাই
গত ১৮ মাস নানা ধরনের সুযোগ-সুাবধা ভোগ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন মন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই বঞ্চিত অংশই
এখন সরাসরি সংস্কারের প্রত্যাশায় আছেন। তাদের ভাষ্য, যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে
মূল্যায়ন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই এবার বদলাবে প্রশাসন।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর অভ্যন্তরীণ
গ্রুপিং ভেঙে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও পেশাদার আইনশৃঙ্খলা কাঠামো গড়ে তোলাই হবে নতুন মন্ত্রীর
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার
সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম এমন নেতৃত্বই এখন প্রয়োজন। আর সেই জায়গায় সালাহউদ্দিন আহমদই হতে
পারেন কার্যকর সিদ্ধান্তদাতা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ, র্যাব, কারা অধিদপ্তরসহ
গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রক। সূত্র বলছে, দায়িত্ব নিয়েই তাকে যে তিনটি বড় পরীক্ষায়
নামতে হচ্ছেÑ সেগুলো হলো, পুলিশ প্রশাসনে আস্থা ফিরিয়ে আনা, রাজনৈতিক মামলার পুনর্মূল্যায়ন
ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
জুলাই-আগস্টের হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর
নিরপেক্ষ তদন্ত এবং মিথ্যা মামলার অভিযোগ যাচাইয়ের প্রশ্নেও এখন সবার নজর নতুন মন্ত্রীর
দিকে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক।
দলীয় সূত্র বলছে, ২০১৫ সালের উত্তাল সময়ে, যখন খালেদা জিয়া গৃহবন্দি
এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারাবন্দি, তখন আত্মগোপনে থেকেও দলের হয়ে সরব ছিলেন
সালাহউদ্দিন আহমদ। তার বিবৃতিগুলো সে সময়কার সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কঠোর
অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলে। ওই বছরেরই ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা থেকে
নিখোঁজও হন তিনি। ৬২ দিন পর ভারতের শিলং শহরে স্থানীয় পুলিশের হেফাজতে তাকে পাওয়া যায়।
অভিযোগ ওঠে, তাকে গুম করে সীমান্ত পার করা হয়েছিল।
নিজের বর্ণনায়, চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নেওয়া, সীমান্ত অতিক্রমের
অজানা যাত্রা এবং মুক্তির পর পথচারীদের সহায়তায় পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া, সব মিলিয়ে ছিল
এক নাটকীয় অধ্যায়।
ভারতের ফরেনার্স অ্যাক্টে দায়ের মামলায় ২০১৮ সালে নিম্ন আদালতে খালাস
পেলেও আপিলের কারণে সেখানে অবস্থান করতে হয়। অবশেষে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিলে
খালাস পান। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ১১ আগস্ট ঢাকায় ফেরেন তিনি, যা সমর্থকদের কাছে
ছিল প্রতীকী প্রত্যাবর্তন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা
বদলে যায়। নতুন সমীকরণে বিএনপির মনোনয়নে কক্সবাজার-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত
হন তিনি। এরপরই পান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব। দলীয় নেতাকর্মী ও চকরিয়ার বাসিন্দাদের
মতে, এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের স্বীকৃতি।
১৯৬২ সালে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের সিকদার
পাড়া গ্রামে জন্ম। শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক, এরপর চট্টগ্রাম
কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ
বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
১৯৮৫ সালের ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ
দেন। বগুড়ার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী
খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী
হিসেবেও দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযোগ ওঠেনি।
প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ব্যক্তিগত ত্যাগ, সব মিলিয়েই
আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। যে কারণে বঞ্চিতরা বিশ্বাস করছেন, দেড়
যুগের অচলাবস্থা ভেঙে পেশাদার, জবাবদিহিতামূলক ও ন্যায়ভিত্তিক আইনশৃঙ্খলা কাঠামো গড়ে
তুলবেন নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ।