× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভুল পরিকল্পনায় সড়কে গচ্চা বিপুল অর্থ

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:০৬ পিএম

ছবি: ফাইল ফটো

ছবি: ফাইল ফটো

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনকালে বাংলাদেশে সড়ক, সেতু ও এ খাতের অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। তবে অভিযোগে আছে, এ খাতের প্রকল্পগুলোর অত্যধিক ব্যয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লেগেছে। কোনো ধরনের সমীক্ষা ও সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই বিপুল অর্থ ব্যয় করার কারণে অনেক প্রকল্প থেমে যাচ্ছে। এসব কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের হওয়ার পরও সড়ক অবকাঠামোর পূর্ণ সুফল পাচ্ছে না দেশবাসী।

গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বিআরটি প্রকল্পটি হাতে নেয়। চার বছর মেয়াদের প্রায় ২০ কিলোমিটার এই প্রকল্পের সময়সীমা পাঁচ দফা বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জটিলতাসহ নানা দিক চিন্তা করে প্রকল্প থেকে সরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অতিরিক্ত আরও তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর ও মেয়াদ আরও চার বছর বাড়ানোর প্রস্তাব ফেরত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। বর্তমান সরকার বিআরটি করিডোরে বিশেষ ইলেকট্রিক (বিদ্যুত্চালিত) বাস চলাচলের ধারণা বাতিল করে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত চার লেনের সড়কটি সাধারণ যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।

শুধু রাজধানী শহর নয়, বিভাগীয় শহর জেলা উপজেলাসহ সারা দেশে এমন ছোটবড় সড়কের ব্যয় হচ্ছে নিয়মিত। 

এলেঙ্গা-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ১০০ কোটি টাকা। ঢাকা-সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে প্রতি কিলোমিটারে খরচ ১১৫ কোটি টাকা। পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেন করতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তো বটেই, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও বাংলাদেশে মহাসড়ক নির্মাণের ব্যয় অনেক বেশি। গত দুই দশকে বাস্তবায়নযোগ্য এই পরিকল্পনার অধীনে ঢাকা শহরে একটি বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় তা অনুমোদন না পেয়ে প্রায় ৯৭৪ কোটি টাকা গচ্চা যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

২০১০ সালে অনুমোদিত চট্টগ্রামের ‘বহদ্দারহাট মোড় থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত মেরিনার্স বাইপাস সড়ক উন্নয়নসহ ডাইভারশন খাল ও সন্নিহিত খালসমূহের পুনর্বাসন’ প্রকল্প ৫৭ কোটি ২৪ লাখ ২৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০ ফুট প্রস্থের ৩ দশমিক ২৫২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়ক নির্মাণের কথা থাকলেও দেড় কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়। কোনো সড়কের সঙ্গে সংযোগ না থাকায় এটিতে এক দিনও যানবাহন চলেনি। অসমাপ্ত সড়কটি এখন পরিত্যক্ত আছে। যদিও ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের পুরো অর্থ। ভূমি অধিগ্রহণে বাড়তি ৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ না থাকায় প্রকল্পটির অর্ধেক বাস্তবায়ন করে কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক পরিকল্পনায় অর্থ অপচয় হওয়ার পেছনে মূল কারণগুলো হলো অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কাজ শেষ না হওয়া, অহেতুক ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সওজের একজন বিভাগীয় প্রকৌশলী বলেন, অনেক সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা ভুল স্থানে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যেমন, যেখানে সড়ক যোগাযোগ বা নাগরিক সুবিধা নেই সেখানে সড়ক তৈরি করা। প্রকল্প শুরু না হতেই মেয়াদ শেষ হয়ে যায় অথবা মেয়াদ বাড়ানো সত্ত্বেও কাজ শেষ হয় না, যার ফলে অর্থের অপচয় হয়। প্রকল্পের নকশা বা অন্যান্য কারণে নির্মাণ ব্যয় অনেক বেড়ে যায়, যেমনটি বিআরটি প্রকল্পে দেখা গেছে। বিভিন্ন জটিলতা, যেমন অনুমোদনে বিলম্ব বা দুর্নীতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়, যা সরাসরি অর্থের অপচয় ঘটায়। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ জেলায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই-হবিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের জন্য ৬৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের আয়োজন করেছিল সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক মন্ত্রণালয়ের তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া দেখান।

এ বছরের অক্টোবর মাসে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফওজুল কবির খানের আগমন উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত অস্থায়ী সংস্কার করা হয়। ২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়, যা মূলত অপচয়। কেননা এ ব্যয় স্থায়ী কোনো কাজে লাগবে না। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশীমুল গ্রামে ঘুঙ্গুর নদীর ওপর ২০০৫ সালে নির্মিত এক ‘অদ্ভুত সেতু’ বিগত ২০ বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। রাস্তা থেকে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে নির্মিত এই সেতুর একপাশে সিঁড়ি থাকলেও অপর পাশে ওঠানামার জন্য কোনো সিঁড়ি না থাকায় ২০ বছরেও এটির কোনো সুফল পায়নি কেউ। 

চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার থেকে শাহ্ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মিত ৩ বছর মেয়াদি ১৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ত্রুটিপূর্ণ স্প্যানের দৈর্ঘ্যের নকশা ও ফাউন্ডেশন নকশা, পিসি গার্ডার অপসারণসহ বেশকিছু অংশের কাজও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও ভুলে ভরা। এসব নকশা ঠিক করতে প্রকল্পের ব্যয় এক হাজার ২৯৯ কোটি ৭০ লাখ ১৬ হাজার টাকা বাড়ানো হয়। প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। ভুল নকশার কারণে প্রকল্পের সময়ও বেড়েছে একাধিকবার। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসম্পূর্ণ প্রকল্পটি তড়িঘড়ি উদ্বোধন করেন।

বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ রংপুর-লালমনিরহাটের সংযোগ স্থাপনে তিস্তা নদীর ওপর ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু ও সড়ক নির্মাণ হলেও পাথরবাহী ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে এই আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করা হয়নি, পরিকল্পনায় ভুল ছিল। ২০১৮ সালে সেতুটি উদ্বোধন করা হলেও গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ওই সড়ক সেতু দিয়ে বন্ধ রয়েছে ভারী যান চলাচল। 

৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঢাকা-মানিকগঞ্জ-ঘিওর সড়কের ঘিওর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সামনের পাকা সড়কের মাঝখানে এক যুগের বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে সংযোগ সড়কবিহীন প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার একটি সেতু। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় এখন সেতুটি পরিত্যক্ত ঘোষণাসহ অপসারণের কথা ভাবছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জেলা সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের জিলানী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, সেতু ভাঙার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়নি।

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সম্প্রতি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে ফরমায়েশি রাস্তা হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইনে একটি রাস্তা করেছেন। সেখানে মৎস্য সম্পদ, প্রাণিসম্পদ, কৃষি, পরিবেশ সব ধ্বংস করেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের টাকা অপচয় করা হয়েছে।’

এসব বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানের সাথে সওজের প্রধান কার্যালয়ে একাধিকবার চেষ্টা করে দেখা পাওয়া যায়নি। একই সময় অতিরিক্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এএসএম ইলিয়াস শাহ্‌কেও তার কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। 

যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তার বিপরীতে আয় খুবই অল্প। সেতু বিভাগের অধীন ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়ক এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলমান। আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও উড়াল সড়ক প্রকল্প পরিকল্পনায় আছে। 

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত শেখ মইনউদ্দীন গণমাধ্যমে বলেন, নতুন অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সতর্কভাবে এগোচ্ছে, যেন পরবর্তী সরকারের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ না পড়ে। সরকার ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা