পুলিশের পরিকল্পনা
নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৭ এএম
পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
নির্বাচন মানেই উত্তাপ। আর সেই উত্তপ্ত মাঠে আইনের গুরুত্বপুর্ণ ঢাল পুলিশ। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ করতে ইতোমধ্যেই নো-কম্প্রোমাইজ নির্দেশনা জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। ভোটের আগে, ভোটের দিন ও ভোটের পরে পুলিশের কোন ইউনিট, কোন কর্মকর্তা কোথায় থাকবেন, কী করবেন, কখন কী ব্যবস্থা নেবেন, কখন বলপ্রয়োগ হবেÑ এসব অনুসরণে জারি করা হয়েছে কঠোর নির্দেশনা। পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এই তথ্য জানিয়েছে।
সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তিই নির্বাচন। সেই ভিত্তি অটুট রাখাই পুলিশের রাষ্ট্রীয় সব দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম। যে কারণে পুলিশেরও মূল লক্ষ্য তিনটি। গণতন্ত্রের ভিত শক্ত করা, আইনের শাসন বজায় রাখা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর দপ্তরেরর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন আয়োজনের টার্গেট রয়েছে সংশ্লিষ্ট সবার। যে কারণে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে এবার কোনো ছাড় নেই। পুলিশের কোনো সদস্য কোনো দল, প্রার্থী বা গোষ্ঠীর পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়াবে না। সবার জন্যই এক আইন, এক আচরণ।
সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনে পুলিশ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা, নির্বাচন আইন ও আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করবে। ভোটারদের নিরাপদ পরিবেশ, সব দল ও প্রার্থীর প্রতি সমতা, ভোটকেন্দ্র, ব্যালট বাক্স, ইভিএম, প্রিসাইডিং অফিসার, নির্বাচন কর্মকর্তা ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের দায়িত্ব। সারা দেশেই সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে থাকবে রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন অফিস। বিশৃঙ্খলা হলে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জাল ভোট, ভয়ভীতি, সহিংসতা দেখামাত্রই অ্যাকশনে যাবে পুলিশ। নারী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পরিস্থিতি বাধ্য করলে আইনের সীমার মধ্যে পরিমিত বলপ্রয়োগের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ডিআইজি পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, অফিসার ইনচার্জরা (ওসি) হচ্ছেন মাঠের ফিল্ড কমান্ডার। অস্ত্র ও গোলাবারুদের কার্যকারিতা যাচাই, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ব্রিফিং, থানায় কন্ট্রোল রুম চালু, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল, সংবেদনশীল কেন্দ্রে বিশেষ নজর, নারী ও দুর্বল ভোটারদের নিরাপত্তা, আন্তঃবাহিনী সমন্বয়, বিজয় মিছিল ঘিরে সহিংসতা প্রতিরোধ, চেকপোস্ট ও তল্লাশি, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটের অন্তত ৭২ ঘণ্টা আগে সন্দেহভাজনদের ওপর নজরদারি নিশ্চিতের জন্য সকল অফিসার ইনচার্জদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন শেষে অস্ত্র ও জনবল নিরাপদে ফেরত আনার দায়িত্বও তাদের। স্ট্রাইকিং ফোর্স বা কুইক রেসপন্স টিম সহিংসতার সংবাদ পেলেই বিলম্ব না করেই ঘটনাস্থলে যাবে। কেন্দ্র দখল, সংঘর্ষ বা গুরুতর বিশৃঙ্খলায় আইনানুগ বলপ্রয়োগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে। ভোটার ও কর্মকর্তাদের জীবনরক্ষার অগ্রাধিকার। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সহায়তা, গুরুতর কেন্দ্রে রিজার্ভ অবস্থান এবং ব্যালট পরিবহন, গণনা ও ফল ঘোষণাকালে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে তারা।
ওই কর্মকর্তা বলেন, মোবাইল টিম কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রে টহল দেবে। আচরণবিধি লঙ্ঘন, অবৈধ প্রচারণা, ভয়ভীতি, বোমাবাজি রোধেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। শুধু তাই নয়Ñ কেন্দ্র ও আশপাশের বাড়িঘরে অস্ত্র জমায়েতও ঠেকাবে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রাখবে। ভোট শেষে ব্যালট ও সরঞ্জাম পরিবহনে সহায়তা করবে।
এদিকে ভোটকেন্দ্রে মোতায়েন পুলিশ ও ফোর্স নির্বাচনের পূর্বে ৪ দিন, নির্বাচনের দিন ও পরে ২ দিন অর্থাৎ ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে। ভোটকেন্দ্রের চারপাশে ৪০০ গজ নিষিদ্ধ এলাকায় কঠোরভাবে কার্যকর থাকবে। ভোট শেষে ভোটারদের কেন্দ্র ত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে। আচরণ হবে বিনয়ী, কোনো উস্কানি নয়। অস্ত্রের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। কোনো প্রার্থী বা এজেন্টের ওপর খাবার ও আবাসনের জন্য নির্ভর করা যাবে না। কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গুজব নয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশই চূড়ান্ত। সংবেদনশীল কেন্দ্রে বডি-ওর্ন ক্যামেরা বাধ্যতামূলক রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন ও জননিরাপত্তা সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করবে ডিএসবি ও সিটিএসবির সদস্যরা। তারা সন্ত্রাস, নাশকতা ও রাজনৈতিক সহিংসতা শনাক্ত করবে। ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কতা, কেপিআই ও সংবেদনশীল স্থাপনার নিরাপত্তা এবং জরুরি সতর্কবার্তা ও সমন্বিত অপারেশনও পরিচালনা করবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের করা বুকলেট থেকে জানা যায়, কোনো প্রার্থীর সঙ্গে ছবি, আড্ডা বা ঘনিষ্ঠতা; ভোটকক্ষে অযথা হস্তক্ষেপ বা অনুমতি ছাড়া প্রবেশ; ভোটার প্রভাবিত করা; পক্ষপাতমূলক আচরণ; অকারণে লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ; রাজনৈতিক মিছিল বা অফিসে উপস্থিতি; সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক পোস্ট; যাচাই ছাড়া মিডিয়াকে তথ্য দেওয়া; দায়িত্বে মোবাইল অপব্যবহার; ভোটের গোপন তথ্য ফাঁসও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরও কারও বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক তদন্ত হবে। সিসিটিভি, মিডিয়া ফুটেজ ও নির্বাচন কমিশনের মনিটরিং চলবে। দোষ প্রমাণ হলেই দায়ী সদস্য বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হবে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও মামলা। এ ছাড়া ভোটকক্ষ থেকে লাইভ সম্প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সাংবাদিকের সংখ্যা ও অবস্থানের সময়ও সীমিত করা হয়েছে।
বুকলেট থেকে আরও জানা যায়, ভোটারের অধিকার নিশ্চিত করা ভয়মুক্ত ভোটাধিকার, ভোটের গোপনীয়তা, শারীরিক নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন সমতা এবং চাপমুক্তভাবে প্রার্থী নির্বাচনে পূর্ণ সহযোগিতা করাই পুলিশের দায়িত্ব। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, ইসি হেল্প ডেস্ক ১০৫, জেলা, কেন্দ্র, মোবাইল ও স্ট্রাইকিং টিম এবং সব নম্বর প্রস্তুত ও সক্রিয় থাকবে।