একাদশ সংসদ নির্বাচন
তানভীর হাসান ও নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:২৯ এএম
শেখ হাসিনা রেজিমে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে ভোট ডাকাতির স্বার্থে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি এবং মামলা-হামলার ঘটনা ছাড়াও বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যা ঘটেছিল, তা নজিরবিহীন। অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে বিদেশ থেকে তাদেরই আনা পর্যবেক্ষকরাও তা অস্বীকার করতে পারেননি। বরং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ তৎকালীন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অনেকেই রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পরিকল্পিত ভয়াবহ অন্ধকার অধ্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং প্রতিবেদনও দিয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের যারা অন্ধকার এই অধ্যায় রচনায় জড়িত ছিলেন, তাদের অনেককে সেই নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে দেওয়া হয় অগ্রিম পদোন্নতি। এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক কর্মকর্তাই নির্বাচনের রাতে নিজ দায়িত্বেই ভোট ডাকাতি করেন। সফল ভোট ডাকাতির পরপরই পুরস্কার হিসেবে তাদের সবাইকে তিন ধাপে দেওয়া হয় পদক, ব্যাজ ও লোভনীয় পোস্টিং। ভেতরে ভেতরে পুলিশ সদস্যরাই একে ‘ইনসেনটিভ-ভিত্তিক ভোট ডাকাতি মডেল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকেই বিস্ময়কর সব অভিযোগ ও ঘটনা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ্যে আসতে থাকে। ভোট ডাকাতি সফলভাবে বাস্তবায়ন ও অর্থ বিতরণে যুক্ত পুলিশ সদর দপ্তরের তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর গড়ে তোলা টিম জাবেদের প্রত্যেক সদস্যকেই দেওয়া হয় বিপিএম ও পিপিএম পদক। ওই বছর পুলিশের পদক তালিকার সাইটেশন বইও ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় দুই-তিন গুণ বেশি বড়। টিম জাবেদের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে সফলভাবে ভোট ডাকাতির জন্য তৎকালীন ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, ৮ রেঞ্জ ডিআইজি, ৮ মেট্রোপলিটন কমিশনারসহ বহু কর্মকর্তা পদক ও আইজিপি ব্যাজও পান। পরে তাদের বড় একটি অংশকে পুনরায় দেওয়া হয় কৌশলগত ও লাভজনক পোস্টিং। এসব স্বীকৃতি ও পুরস্কারের প্রতিদান হিসেবে তাদের সবাই নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পালন করেন আগ্রাসী ভূমিকা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে জানা গেছে, তাদের অনেকেই জুলাই গণহত্যায় জড়িত ছিলেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কৌশলগত ও লাভজনক পোস্টিং পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের সবাই ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই ভূমিকা রাখেন। অধিকাংশই আবার সরাসরি ভূমিকা রাখেন জুলাই গণহত্যায়। এর মধ্যে অন্যতম পুলিশ সদর দপ্তরের তৎকালীন ডিআইজি (ফাইন্যান্স) আবু হাসান মুহাম্মদ তারিকÑ যিনি পরে ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে অ্যাডিশনাল আইজিপি (ফাইন্যান্স) পদে পদোন্নতি পান। ৫ আগস্টের গণহত্যায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগদুষ্ট এই কর্মকর্তাকে পরে ঢাকা পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর হিসেবে পদায়ন করা হয়। বর্তমানে তিনি ওএসডিতে রয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (লজিস্টিক) ব্যারিস্টার হারুনুর রশিদকেও করা হয় র্যাবের মহাপরিচালক। তার বিরুদ্ধেও ভোট ডাকাতি ও জুলাই গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি অবসরে। গণহত্যা ও ভোট ডাকাতিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে আরও রয়েছেনÑ আনোয়ার হোসেন, ডিআইজি (অপারেশন্স), বর্তমানে অবসরে; ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন, বর্তমানে অবসরে; সহেলী ফেরদৌস, শিক্ষাছুটির নামে পলাতক; আব্দুল্লাহীল বাকি, বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অডিট অ্যান্ড ইন্সপেকশন); খোন্দকার নুরুন্নবী, পলাতক; প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, পলাতক; হাসুনাল হায়দার ডিআইজি (পরিচালক), পুলিশ হাসপাতাল, বর্তমানে অবসরে; আরআরএমপি কমিশনার মনিরুজ্জামান, বর্তমানে অবসরে, পলাতক; ডিআইজি (খুলনা) রেজাউল হক; এএফএম আনজুমান কালাম, অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন, সিআইডি); আবিদা সুলতানা, রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি সংযুক্ত; ফারুক আহমেদ, অতিরিক্ত ডিআইজি পুলিশ সদর দপ্তর; মোহাম্মদ খোরশেদ আলম উপকমিশনার রাজশাহী; মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান, অতিরিক্ত ডিআইজি ল’, পুলিশ সদর দপ্তর; তাসমিয়াহ তাহলিল, অতিরিক্ত ডিআইজি মার্কেট ইন্টিলিজেন্স এসবি; সুনন্দা রায়, অতিরিক্ত ডিআইজি রাজশাহী সংযুক্ত; ড. মো. মঞ্জুরে আলম প্রামাণিক, অতিরিক্ত ডিআইজি পুলিশ সদর দপ্তর; নেছার উদ্দিন আহম্মেদ, উপকমিশনার সিএমপি; মিলন মাহমুদ, পুলিশ সুপার ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার জামালপুর; মোহাম্মদ এহসান সাত্তার, অতিরিক্ত ডিআইজি ডিঅ্যান্ডপিএস-২ পুলিশ সদর দপ্তর; আয়েশা সিদ্দিকা, পলাতক; আব্দুল্লাহ আল জহির, এআইজি ডেভেলপমেন্ট, পুলিশ সদর দপ্তর; মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, এআইজি ওভারসিস অ্যাফেয়ার্স পুলিশ সদর দপ্তর; মীর আবু তৌহিদ এসপি, পিটিসি, নোয়াখালী বর্তমানে সিআইডির বদলির আদেশপ্রাপ্ত; ছাইদুল হাসান, এসপি পিবিআই; আব্দুল মান্নান, এসপি, রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত; মো. শহীদুল ইসলাম, পলাতক; মো. কামরুজ্জামান, এসপি শেরপুর; আ ফ ম নিজাম উদ্দিন, এসপি, নৌ পুলিশ চট্টগ্রাম; মো, মাহবুব উজ জামান, ডিএমপির লালবাগ জোনে ডিসি হিসেবে সংযুক্ত; এম. নাজেম আহমেদ, এসপি, এনটিএমসি; ইশতিয়াক উর রশিদ, এনপি এলআইসি ইনচার্জ, পুলিশ সদর দপ্তর; কেএমএ মামুন চিশতী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার র্যাব; মো. মামুন অর রশিদ, এসপি, এনপিবিএন ঢাকা; মাসুক মিয়া, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, রেলওয়ে পুলিশ চট্টগ্রাম; নাজমুস সাকিব, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কক্সবাজার; সুদীপ্ত সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার র্যাব; কাজী মো. সালাউদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, জাতীয় সংসদ সচিবালয়; মো. মোস্তফা কামাল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, নৌ পুলিশ ঢাকা; মো. নুরে আলম, অতিরিক্ত উপকমিশনার, ডিবি ডিএমপি; মোহাম্মদ আবু তাহের, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পিআইও পুলিশ সদর দপ্তর; শামসুন্নাহার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ইউএন পুলিশ সদর দপ্তর; ফারহানা ইয়াসমিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার; ইসরাত জাহান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, নারায়ণগঞ্জ; জাহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পিটিসি খুলনা।
ভোট ডাকাতির পরিকল্পনা, সমন্বয়, তদারকি ও বাস্তবায়ন ছাড়াও জুলাই গণহত্যায় জড়িত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যত কোনো তদন্তই হয়নি। তাদের অনেকে পুলিশ বাহিনীতে এখনও বহাল এবং কারও কারও পুনর্বাসন ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিছু কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থায়নকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অনেককেই আবার ২০২৬ সালের নির্বাচন প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়ে যুক্ত থাকতে দেখা গেছে। নির্বাচন কমিশনের বৈঠকেও তাদের সরব উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে খোদ পুলিশের ভেতরেই ক্ষোভ রয়েছে বলে জানা গেছে।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ৭ সপ্তাহ আগে ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর পুলিশ বাহিনীতে ঘটেছিল সবচেয়ে বড় একক পদোন্নতি কার্যক্রম। অভিযোগÑ এই পদোন্নতিগুলো ছিল নির্বাচনের রাতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনের জন্য ‘অগ্রিম পুরস্কার’। ওই পদোন্নতিতে ২৩৫ জন কর্মকর্তাকে পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদোন্নতি, ১৫০ জন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ওই তালিকা তৈরিতে বিবেচনায় নেওয়া হয় রাজনৈতিক আনুগত্য, বিশ্বস্ততা ও ভবিষ্যৎ ‘অপারেশন’ বাস্তবায়নের সক্ষমতা। পদোন্নতির পরের দিন অর্থাৎ ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার’, ‘শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নাই’, ‘বিএনপি-জামায়াতকে বয়কট করুন’Ñ এমনসব স্লোগান প্রকাশ্যে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করতে থাকেন। অভিযোগ রয়েছেÑ বহু ওসি, এসপি ও ডিআইজি প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সভা-সমাবেশে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেন, যা ছিল নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।
ভোট ডাকাতির রাত, কেন্দ্রভিত্তিক ‘টার্গেট’ : অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর রাতে শুরু হয় মূল অপারেশন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে গঠিত টিম জাবেদের গড়ে তোলা প্রলয় কুমার জোয়ার্দারের নেতৃত্বাধীন ভোট ডাকাতির অ্যানালাইসিস টিমের সদস্যরা কেন্দ্রভিত্তিক হিসাব নির্ধারণ করে দেয়, কোন কেন্দ্রে কত শতাংশ ভোট ‘ম্যানেজ’ করতে হবে ও কোথায় বিরোধী ভোট বেশি, সেখানে কত ব্যালট আগেই ভরতে হবে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় হয় বলেও সূত্র জানিয়েছে। অনেক কেন্দ্রে অভিযোগ ওঠে, ভোটার উপস্থিতির চেয়ে বেশি ভোট কাস্ট ও কোথাও ১০০% বা তারও বেশি ভোট দেখানো হয়। ভোর হওয়ার আগেই ভর্তি ব্যালট বাক্সের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে আসে। তৎকালীন সময়ে ভাইরাল হওয়া এমন একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভোট দিতে না পেরে নাগরিকরা সেনাবাহিনীর গাড়ির সামনে সাহায্য চাইছেন, কিন্তু কোনো সাড়া না দিয়েই গাড়িটি চলে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগেই ভোট ডাকাতির বিষয়ে অবগত ছিলেন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের বিভিন্ন ইউনিটপ্রধান, মেট্রোপলিটন কমিশনার, অতিরিক্ত ও যুগ্ম কমিশনার, ডিবি, এসবি, সিআইডি, জেলা পুলিশ ও রেঞ্জ পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ২৯ ডিসেম্বর রাত ১১টার পর কেন্দ্রভিত্তিক নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো প্রক্রিয়াই মনিটর করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরের দ্বিতীয় তলার গোপন কন্ট্রোল রুম থেকে, যার নাম ছিল ‘কপোতাক্ষ’, যার বর্তমান নাম ‘হল অব গ্রান্ড’।
মিডিয়া ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ : নির্বাচনের দিন অভিযোগ ওঠে, মোবাইল অপারেটরদের ৩জি/৪জি ‘দেখাতে হবে’। কার্যত ৩জি/৪জি দেখিয়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় বিটিআরসি। দুপুরের পর টিভি ও সংবাদ মাধ্যমে চাপ দেওয়া হয়, যেন কোনো বিরূপ খবর প্রচার না করা হয়। ভোটগ্রহণের শুরুতে কিছু চিত্র প্রচার করা হলেও পরে অনেক গণমাধ্যমই তাদের অবস্থান বদলাতে বাধ্য হয়। দুয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি গণমাধ্যম অফিসে গিয়ে সরাসরি চাপ দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।