× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সৌদিতে থাকা রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট নিতে অনীহা

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৭ এএম

সৌদিতে থাকা রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট নিতে অনীহা

সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে ধীরগতিতে। কাগজে-কলমে অগ্রগতি থাকলেও বাস্তবে বড় একটি অংশ পাসপোর্ট নিতে কনস্যুলেটে হাজির হচ্ছে না। মোবাইল ফোনে কল ও খুদেবার্তা পাঠিয়েও অনেককে পাওয়া যাচ্ছে না। এই অনীহার পেছনে রয়েছে ফির আশঙ্কা, অবস্থান অনিশ্চয়তা এবং জটিল কূটনৈতিক বাস্তবতা।

সৌদি আরবে থাকা রোহিঙ্গারা জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক নন। তবু দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানরত এই জনগোষ্ঠীকে বৈধতার আওতায় আনতে সৌদি সরকার ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশকে পাসপোর্ট দিতে চাপ দিয়ে আসছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার এই প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও সৌদির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল সৌদি আরব সফর করে। ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের বিন আবিয়াহ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে পাসপোর্ট হস্তান্তরে ধীরগতির বিষয়টি উঠে আসে। এ সময় পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল নুরুল আনোয়ার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন অনুবিভাগের প্রধান অতিরিক্ত সচিব ফয়সল আহমেদসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রাষ্ট্রদূতকে জানান, সৌদিতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন ও বহিরাগমন এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তর পূর্ণোদ্যমে কাজ করছে। বিশেষ টিমও পাঠানো হয়েছে। তবু আবেদনকারীদের উপস্থিতির হার কম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, পাসপোর্ট নিতে অনীহার পেছনে প্রধান কারণ আর্থিক ভয়। রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিলে সৌদি সরকার তাদের ওপর উচ্চহারে অবস্থান বা আয়ের ফি আরোপ করতে পারে। আলোচনায় রয়েছে, সব পাসপোর্ট হস্তান্তর শেষ হলে মাসিক ৬০০ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত ফি নেওয়া হতে পারে।

এ ছাড়া পাসপোর্ট পেলে ভবিষ্যতে ফেরত পাঠানো (ডিপোর্টেশন) সহজ হবেÑ এমন আশঙ্কাও কাজ করছে। ফলে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে কনস্যুলেটে আসছেন না। সরকারি ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ভীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা উপস্থিতির হার কমিয়ে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, ১৯৭৭ সালের দিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সৌদি আরবে প্রবেশ করে। তৎকালীন বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ মানবিক বিবেচনায় প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেন। শুরু থেকেই সৌদি সরকার তাদের ‘বাংলাদেশে থাকা বাস্তুচ্যুত নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে।

পরবর্তীতে অনেকে নানা কৌশলে বাংলাদেশ মিশন থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন এবং সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশে যাতায়াতও করেন। এসব তথ্যপ্রমাণ সৌদি সরকার বাংলাদেশকে দিয়েছে। কিন্তু কীভাবে তারা পাসপোর্ট পেলেনÑ সে বিষয়ে কখনও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি।

সৌদি শ্রমবাজারে প্রায় ২৫ লাখ বিদেশি শ্রমিক ফেরত পাঠানোর চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের বৈধতা দেওয়াকে কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে দেখছে সৌদি সরকার। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে সৌদিতে বৈধভাবে থাকবেন, কিন্তু কখনও বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই শর্তেই পাসপোর্ট হস্তান্তর কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে সৌদি সরকার।

সক্ষমতা থাকলেও গতি নেই : তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তালিকায় ৬২ হাজার ২৪০ জনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। এর মধ্যে কনস্যুলেটে হাজির হয়েছেন ৩৮ হাজার ২৩৮ জন। অনুপস্থিত ছিলেন ২৪ হাজার ৯ জনÑ মোট আবেদনের ৩৭ শতাংশ। এ পর্যন্ত বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন : ২১,৬৪৮ জন, পাসপোর্ট হস্তান্তর : ১৭,৩৭৪টি, প্রিন্টের জন্য অনুমোদিত : ২০,৯৯০টি। সৌদিস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সক্ষমতা প্রতিদিন ৪০০ পাসপোর্ট সরবরাহের। কিন্তু ২০০ জনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট এলে উপস্থিত হন গড়ে ১৫০ জন। অনুপস্থিতির কারণেই নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা দরকার হলেও স্বচ্ছতা, মানবিকতা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের পাসপোর্ট বিতরণ এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং দেশের নীতিনির্ধারণেরও প্রতিফলন। সৌদি আরবের শ্রমবাজারে অবস্থানরত এই সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীকে বৈধতা দেওয়া বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি কৌশলগত সুবিধা দেয়। 

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দিক থেকে এটি সতর্কতার দাবি রাখে-পাসপোর্ট প্রদানের শর্ত। তবে সৌদি সরকারের চাপে দ্রুত হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দেশীয় নীতিমালা, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সমন্বয় করে চলতে হবে। অনুপস্থিতির উচ্চ হার এবং দ্বিধাগ্রস্ত আবেদনকারীরা প্রক্রিয়াকে ধীর করছে, যা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে ৬৯ হাজার পাসপোর্ট হস্তান্তরের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। সৌদি সরকার বারবার তাগাদা দিচ্ছে, বাংলাদেশ সময় চাইছে। এই টানাপড়েনের মধ্যে রোহিঙ্গাদের অনীহা প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমতাবস্থায় সরকারকে দ্রুততার পাশাপাশি তথ্য যাচাই, নিরাপত্তা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় করতে হবে। নইলে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতে বড় কূটনৈতিক ও নীতিগত সংকটে রূপ নিতে পারে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা