ফিরে দেখা ২০২৫
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:০৫ পিএম
ফেলে আসা ২০২৫ সালের দিকে ফিরলে দেখা যায়, এগিয়ে চলার স্বাভাবিক ছন্দ এখনও ফিরে পায়নি প্রশাসন। আর তাই স্বস্তি নয়, বরং অতীতের উদ্বেগের গত বছরও বয়ে বেড়াতে হয়েছে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে পরিবর্তনের আশা নিয়ে তাকিয়েছিলেন তারা। কিন্তু পরিবর্তন ঘটেনি; বরং বিভ্রান্তি, দোদুল্যমানতা আর অনিয়মের জের টানতে হয়েছে তাদের।
সালতামামি করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, পদোন্নতি ও পদায়নে নীতিগত দুর্বলতার কারণে অতীত সরকারের ‘ফ্যাসিস্ট সুবিধাভোগী’ তকমা লাগিয়ে দিয়ে দলনিরপেক্ষ পেশাদার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি গত বছরও আটকে রাখা হয়েছে। অথচ একই সময়ে অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি ও সুবিধাভোগীদের পদোন্নতির পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল প্রশাসনের জন্য প্রতিশ্রুতিভঙ্গ ও আশাহীনতার বছর। কারণ গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে গণবিরোধী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পেছনে বড় একটি জনপ্রত্যাশা ছিল যে, প্রশাসনে লেবেলবাজির পরিবর্তে পেশাদারত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, সিদ্ধান্তসমূহ হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং বিভিন্ন পর্যায়ে এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে জন্ম নিয়েছে নতুন এক ধরনের বৈষম্য।
পরিস্থিতির সুযোগ নিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী দাবি আদায়ের নামে সচিবালয়ে আন্দোলনে নামেÑ যা সামাল দিতে সরকার হিমশিম খায়। এ সময় অর্থ উপদেষ্টাকে অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনাও ঘটে। সিদ্ধান্তহীনতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারীদের আটক ও চাকরিচ্যুত করার মধ্যে দিয়ে বরং আস্থাহীনতা ডেকে এনেছে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তাই অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ ও হতাশা বেড়েছে। দেখা দিয়েছে নতুন করে বৈষম্য, বিতর্ক, অসন্তোষ ও সিদ্ধান্তহীনতা। জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে স্বচ্ছতা না থাকায় শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন কর্মকর্তারা। সকালে ডিসি নিয়োগ দিয়ে বিকালে বাতিল সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে সবাইকে। প্রশাসনে এমন ঘটনা ‘নজিরবিহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
চুক্তিভিত্তিক সিনিয়র সচিব থেকে পরিকল্পনা কমিশনে ‘ডাম্পিং’
২০২৫ সালের শুরুতেই প্রশাসনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব (চুক্তিভিত্তিক) মোখলেস উর রহমানের পদায়ন। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত এই জ্যেষ্ঠ আমলাকে সরাসরি অপসারণ না করে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য পদে পাঠানো হয়। প্রশাসনের ভেতর এটিকে দেখা হচ্ছে একটি নীরব অপসারণ হিসেবে। প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠার উদাহরণ নয়, বরং কৌশলে ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনা। এতে প্রশাসনে স্বচ্ছতার বদলে ভয় তৈরি হয়। তারা বলছেন, সাবেক জনপ্রশাসন সচিবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যদি গুরুতর হয়ে থাকে, তাহলে তাকে তদন্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত ছিল। ডাম্পিং পদায়ন করে গুরুতর নয় এমন আবহ তৈরি করার প্রয়োজন ছিল না।
এপিডি নিয়োগে সিদ্ধান্তহীনতা ও দোদুল্যমানতা
২০২৫ সালের সবচেয়ে সমালোচিত প্রশাসনিক অধ্যায় নিঃসন্দেহে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নিয়োগ। খুলনা বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ সরকারকে (বিসিএস ১৭ ব্যাচ) এপিডি নিয়োগের লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। বদলির আদেশ জারির পর ধরে নেওয়া হয়েছিল এ পদে তার নিয়োগ চূড়ান্ত। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই একটি বিশেষ গোষ্ঠী ফিরোজ সরকারকে এপিডি নিয়োগ না দিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রভাবিত করে এবং সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে যায়। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে জনপ্রশাসন সচিব নিজেই এপিডির দায়িত্ব নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি কেবল একটি নিয়োগ ব্যর্থতা নয়, এটি সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে।’
‘ফ্যাসিস্ট’ তকমায় আটকে আছে বিসিএস ২০ ব্যাচ
প্রশাসনে সবচেয়ে বড় অসন্তোষ রয়েছে বিসিএস ২০ ব্যাচের যুগ্ম সচিবদের মধ্যে। এই অসন্তোষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও কাটেনি। চার থেকে পাঁচ বছর ধরে যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেও এই ব্যাচের বড় একটি অংশ এখনও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পাননি। অথচ এ ব্যাচের অনেক কর্মকর্তাই মাঠ প্রশাসন, অর্থনীতি, উন্নয়ন প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা বা চার্জশিট কিংবা দুদকের মামলাও নেই বলতে গেলে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের জালে তাদের সবাইকে আটকে রাখা হচ্ছে। তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া থমকে আছে। প্রশাসনের একটি স্তরে তৈরি হয়েছে অঘোষিত স্থবিরতা। তাদের মতে, ভালো কাজের পুরস্কার নেই, কিন্তু ভুলের শাস্তি আছেÑ এমন বাস্তবতায় কেউই উদ্যোগী হয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন না, কাজ করার ঝুঁকিও নেবেন না। প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন বা কয়েকজন কর্মকর্তার অপরাধের জন্য পুরো ব্যাচের শাস্তি দেওয়া (যদিও সবাই অপরাধী নয়) সঠিক নয়। এটি প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
বিসিএস ২৪ ব্যাচ দুই সরকারের আমলেই বঞ্চিত
এদিকে হতাশার শেষ নেই বিসিএস ২৪ ব্যাচের কর্মকর্তাদের। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পদোন্নতি পাননি তারা; আবার অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও বঞ্চিত রয়েছেন। যোগ্যতা থাকার পরও তারা প্রথম দফায় যুগ্ম সচিব পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। পদোন্নতি পুনঃবিবেচনার দাবিতে এসএসবির চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে আবেদন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে ভুক্তভোগীরা সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) চেয়ারম্যান ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছেন। কিন্তু বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়নি। বঞ্চনা নিয়েও কাজ করতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চনায় তাদের মনোবল ভেঙে গেছে। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তাদের ভেতর ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে; যা ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পদোন্নতি আটকে রাখলে প্রশাসনের কর্মক্ষমতা কমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ দুর্বল হয়। এটি রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে তারা সন্দেহ ও ভয় দিয়ে প্রশাসন চালাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রশাসন কোনো দলের হতে পারে না, এটি রাষ্ট্রের। রাজনৈতিক তকমা দিয়ে প্রশাসন চালাতে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র নিজেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সদিচ্ছা থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে ব্যাচের ভিত্তিতে স্বচ্ছতার সঙ্গে সময় নির্ধারণ করে অতিরিক্ত ও যুগ্ম সচিবদের পদোন্নতি হতে পারে। এতে কর্মকর্তারা কাজের গতি ফিরে পাবেন।
অদৃশ্য ক্ষয়ে প্রশাসনের মনোবল ভাঙছে
দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের নীরব ক্ষয় সৃষ্টি করছে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছেন না, কিন্তু ভেতরে ক্ষোভ জমছে; যা ভবিষ্যতে বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র নীরবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। সরকার হয়তো পুরোটা বুঝতে পারছে না।
লেখার অপেক্ষা রাখে না, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসন ছিল বিশৃঙ্খল, এলোমেলো। বিতর্কিত পদায়ন, নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট এই প্রশাসনকে স্থবির করে তুলেছে।