ইসমাইল হোসেন লিটন, শরণখোলা (বাগেরহাট)
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:৫৫ পিএম
সুন্দরবনের নদীতে আর আগের মতো মাছ পান না জেলেরা। ফলে জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। ছবি: সংগৃহীত
‘এখন আর আগের মতো মাছ পাই না। তা ছাড়া জেলের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। সুন্দরবনে তো এখন আর গোলপাতা আহরণ করা যায় না, কাঠ জোগাড় করা যায় না; বনসম্পদ আহরণের পারমিট দেওয়াই বন্ধ হয়ে গেছে। তাই ওইসব পেশাজীবীর মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো গতি নাই। কী আর করব, বলেন? মাছ না পাওয়া গেলেও মাছের খোঁজই করি।’ বলছিলেন বাবুল ফরাজি। পাশেই বসে ছিল তার ছেলে ডালিম ফরাজি। শরণখোলা উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন খুড়িয়াখালী গ্রামের জেলে বাবুল ফরাজি ৪৫ বছর ধরে মাছ ধরছেন সুন্দরবন থেকে। একসময় অবশ্য কাঠও কাটতেন। কিন্তু এখন শুধু মাছই ধরেন বাবা ও ছেলে মিলে। মাছ ধরে জীবিকা চালাচ্ছেন তারা।
সম্প্রতি
শরণখোলা বাজারে গিয়ে দেখা গেল,
সুন্দরবনের নদী থেকে ধরে
আনা মাছ বিক্রি করছেন
বাবা-ছেলে। কথায় কথায় বললেন,
কোনো বিকল্প কাজ নেই তাদের।
জমিজমাও নেই। মহাজনের কাছ
থেকে দাদন নিয়েছেন। তাই
বাঘ, কুমির, সাপ ও হিংস্র
জীবজন্তুর আক্রমণে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি থাকলেও জীবিকার তাগিদে বনে যান মাছ
ধরতে।
বাবুল
শুনেছিলেন ‘প্রতিবেশ প্রকল্পের’ আওতায় একটি এনজিও তাদের
বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। এনজিওটির লোকজন এসে দু-তিনবার
সভা করে সচেতনতামূলক অনেক
কথাবার্তা বলেছেন। বাবুলসহ অনেকের নাম লিখে নিয়ে
গেছেন। অনেক আশায় ছিলেন
তারা, অন্য কোনো কাজ
পেলে তাদের আর বনে যেতে
হবে না। কিন্তু সেই
এনজিওর এখন আর সাড়াশব্দ
নেই। নিরাশকণ্ঠে বাবুল বলছিলেন, ‘সভা আর আলোচনায়
আমাদের পেট ভরে নাকি?’
বাবুল ফরাজির সঙ্গে কথা হওয়ার মাস-আড়াই আগে সোনাতলা গ্রামে কথা হয়েছিল ইউনুস হাওলাদারের (৬৪) সঙ্গে। দুই বছর হলো তিনি আর সুন্দরবনে মাছ ধরেন না। ২০২৩ সালে সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রথম দিনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন থেকে মাছ ধরে বের হতে তার ঘণ্টা চারেক দেরি হয়েছিল। বন বিভাগ তখন তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে। ক্ষোভে-দুঃখে তিনি বনে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এখন ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালান। অবশ্য তার ১৭ বছরের ছোট ছেলে মাহবুব এখনও মাছ ধরতে সুন্দরবনে যায়। ইউনুস হাওলাদার জানালেন, কোনো প্রকল্পের সুবিধা তিনি কখনও পাননি। এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান হলে পরিবার ফেলে রিকশা চালাতে ঢাকায় যেতে হতো না।
বনজীবীদের
এসব কথার সূত্র ধরে
প্রতিদিনের বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গত
১ জুলাই থেকে ৩০ নভেম্বর
পর্যন্ত ‘প্রতিবেশ’ নামের প্রকল্পটি সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানো হয়। প্রকল্পের নথিপত্র
খোঁজা হয়, কথা বলা
হয় সংশ্লিষ্ট এনজিও, বন বিভাগ, বন
বিশেষজ্ঞ, বনজীবী এবং সুন্দরবন-সংশ্লিষ্ট
এলাকার অন্তত ২৫ জনের সঙ্গে।
এ বিষয়ে জানতে তথ্য অধিকার আইনেও
আবেদন করা হয়।
তবে প্রকল্পটির বরাদ্দ, কাজ, উদ্দেশ্য, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন সম্পর্কে কোনো তথ্যই মেলেনি বন বিভাগের কাছ থেকে। প্রকল্পটির নথিপত্র চেয়ে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাটির (এনজিও) কাছে তথ্য অধিকার আইনে একাধিক আবেদন করেও সাড়া মেলেনি। এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে যোগাযোগ করেও প্রকল্প সম্পর্কে তথ্য মেলেনি। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রমতে, এনজিও ব্যুরোর ছাড়পত্র ছাড়াই এ প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
প্রতিবেশ
প্রকল্পের নথিপত্রের খোঁজে
ইউএসএআইডির
অর্থায়নে সুন্দরবন অঞ্চলে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবেশ প্রকল্পের কাজ করেছে এনজিও
সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স
স্টাডিজ (সিএনআরএস)। কিন্তু বর্তমানে
এলাকায় এই কার্যক্রম চলমান
না থাকায় নথিপত্র সংগ্রহ করতে গত ৩১
জুলাই দুপুরে ঢাকায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে যাওয়া হয়।
সংস্থার
নির্বাহী পরিচালক ড. মোকলেছুর রহমান
এ সময় অফিসে ছিলেন
না। কথা হয় মো.
মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি সংস্থাটির পরিচালিত
বায়োডাইভারসিটি ফর রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস
প্রকল্পের প্রধান। সুন্দরবনের বনজীবীদের জীবন-জীবিকা-সংক্রান্ত
বিভিন্ন প্রকল্পের ফলাফল নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি
করছি জানিয়ে তার কাছে ‘প্রতিবেশ’
প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি যেসব
বিষয়ে তথ্য দরকার, সেসবের
একটা তালিকা তাকে ইমেইল করতে
বলেন। ১০ দিনের মধ্যে
তথ্যগুলো দেওয়ার চেষ্টা করবেন। কথামতো প্রতিবেশ প্রকল্পের নথিপত্র, বরাদ্দের পরিমাণ ও বনজীবীদের তালিকা
চেয়ে ২ আগস্ট তাকে
ইমেইল করা হয়। কিন্তু
তিনি এক সপ্তাহ পরে
ফোনে জানান, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই
ইউএসএআইডির অর্থ সহায়তা বন্ধ
হয়ে গেছে। তাই শর্ত অনুযায়ী
এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া
সম্ভব নয়।
পরে এই প্রকল্পে যুক্ত সিএনআরএসের মাঠ কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত তারা ‘প্রতিবেশ’ প্রকল্পের কাজ করেছেন। তারা বন বিভাগের আওতায় সুন্দরবন নিয়ে কাজ করা সহব্যবস্থাপনা কমিটি (সিপিজি), ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (ভিটিআরটি) ও পিপলস ফোরামের সদস্যদের সচেতনতা তৈরিতে কাজ করেছেন। বনজীবীদের একটি তালিকা তৈরি করে তারা বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ অফিসে জমা দিয়েছিলেন। প্রকল্প শেষ হওয়ায় তিনি এখন অন্যখানে চাকরি করছেন। এ-সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র তার কাছে নেই।
সহব্যবস্থাপনা
কমিটির বক্তব্য
কথা
হয় সুন্দরবনের সুরক্ষা নিয়ে অংশগ্রণমূলক কাজে
নিয়োজিত শরণখোলা সহব্যবস্থাপনা কমিটির (সিপিজি) সহসভাপতি আবদুল ওয়াদুদ আকনের সঙ্গে। তিনি তিন বছর
ধরে এ কমিটির সভাপতি।
তবে এ সংগঠনটিতে জড়িত
আছেন ২০১৩ সাল থেকে।
আব্দুল
ওয়াদুদ বললেন, তিনি কখনও বনজীবীদের
জীবিকা উন্নয়নে কোনো কাজ হতে
দেখেননি। তবে সিএনআরএস নামের
এনজিওটি ইউএসএআইডির অর্থায়নে গত তিন বছর
‘প্রতিবেশ’ প্রকল্পের আওতায় বনজীবীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কয়েকটি সভা করেছে। কিন্তু
তাদের জীবনযাত্রায় এর কোনো প্রভাব
পড়েনি।
পিপলস ফোরামের সভাপতি তুহিন বয়াতি জানান, ‘প্রতিবেশ’ প্রকল্পের মাঠ কর্মকর্তা মো. আরিফুর ইসলাম মাঝেমধ্যে তাদের সভায় এসে সচেতনতামূলক বক্তব্য রাখতেন। তিনি বলেন, ‘এর বেশি কিছু না। এমনকি তারা এক কাপ চা পর্যন্ত খাওয়াতেন না। শুনেছি আমাদের একটি তালিকা করে বন বিভাগের কাছে জমাও দিয়েছেন।’
বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে তথ্য
গত ৭ জুলাই খুলনা
অঞ্চলের বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে
গিয়ে ‘প্রতিবেশ’ প্রকল্প সম্পর্কে খোঁজ নিতে গেলে
বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, তার দপ্তরে চলমান
‘সুন্দরবন পরিবেশবান্ধব সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’
এবং ‘সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের’ নথিপত্র রয়েছে। তবে ‘প্রতিবেশ প্রকল্পে’র কোনো নথিপত্র
দপ্তরে নেই। তিনি ওই প্রকল্প
দুটির নথিপত্র পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। সেসব
নথিপত্র খতিয়ে দেখা গেছে, একশত
সাতান্ন কোটি সাতাশি লক্ষ
একান্ন হাজার টাকার সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পটি ১ জানুয়ারি ২০২১
থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪
সালে বাস্তবায়িত হয়।
আটাশ কোটি উনসত্তর লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকার সুন্দরবন পরিবেশবান্ধব পর্যটন (ইকো-ট্যুরিজম) সুবিধা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদকাল ছিল ১ জানুয়ারি ২০২০ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত। তবে প্রকল্প দুটির নথিপত্র খতিয়ে দেখা যায় ডিপিপিতে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হলেও অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের
বক্তব্য
পূর্ব
সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা রানা দেব বলেন,
প্রতিবেশ প্রকল্প সম্পর্কে তিনি তেমন কিছুই
জানেন না। তবে সিএনআরএস
তাদের কাছে বনজীবীদের একটি
তালিকা জমা দিয়েছে।
শরণখোলার
সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাহাবুব হোসেন
প্রকল্প চলাকালীন সময় তিন বছর
দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি
বললেন, এই প্রকল্পে সিএনআরএস
মূলত সিপিজি, ভিটিআরটি, পিপলস ফোরামের সদস্যদের সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করেছে।
বন বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকতা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে
বলেন, প্রতিবেশ প্রকল্পটি বন বিভাগ বাস্তবায়ন
করেনি। এটি ইউএসএআইডির অর্থায়নে
সিএনআরএস নামের এনজিও বাস্তবায়ন করেছে। তার জানামতে, ইউএসএআইডি
কিছু তহবিল এনজিও ব্যুরোর ছাড়পত্র ছাড়াই সরাসরি ব্যয় করতে পারে।
‘প্রতিবেশ’ প্রকল্পটি সেইভাবে পরিচালিত হয়েছে।
গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর কার্যালয়ে প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশ’ প্রকল্পের কোনো নথিপত্র বন বিভাগের কাছে নেই। দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি সরাসরি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএসকে নিয়োগ দিয়ে কাজ করেছে। এটি বন বিভাগের কোনো প্রকল্প নয়। আমরা তাদের সহযোগিতা করেছি মাত্র।
প্রকল্প
এবং প্রকল্পের সুফল
খুলনা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের
অধ্যাপক এ কে ফজলুল
হকের মতে, বনজীবীদের বিকল্প
কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দেখা
যায় না। তিনি বলেন,
‘বনজীবীদের নিজেদের মতো করে কর্মসংস্থান
তৈরি করে নেওয়া উচিত।
সেজন্য তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করা যেতে
পারে।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরবন ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের সমন্বিত অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান সিদ্দিকী সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ, প্রাণী, বন, জলবায়ু ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলছেন, ‘সুন্দরবন সুরক্ষায় নেওয়া প্রকল্পগুলোতে বন-নির্ভরশীল মানুষের কোনো গুরুত্ব থাকে না। সুন্দরবনের উন্নয়নে যে বরাদ্দ থাকে তার সম পরিমাণ অর্থ বনজীবীদের জীবন-জীবিকা উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত। কেননা তাদের জীবিকার টেকসই উন্নয়ন না করে সুন্দরবন রক্ষা করা সম্ভব নয়।’
তথ্য
অধিকার আইনেও মিলছে না তথ্য
ইতোমধ্যে
একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হই, ‘প্রতিবেশ’ ছাড়াও
সিএনআরএস সুন্দরবনের বনজীবীদের জীবন-জীবিকা উন্নয়নে ইউএসএআইডির অর্থায়নে অতীতে ‘ক্রেল’ নামের আরেকটি প্রকল্প মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করেছে।
এনজিওটির
কাছ থেকে ‘প্রতিবেশ’ প্রকল্পের তথ্য না পাওয়ায়
প্রতিদিনের বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গত
১৯ আগস্ট সংস্থাটির যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর তথ্য অধিকার আইন
২০০৯-এর ধারা ৪-এর বিধান এবং
৮ (১) ও (২)
অনুযায়ী ফরম ‘ক’-এ
আবেদন করি। ২০২১ থেকে
২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সিএনআরএস পরিচালিত ‘প্রতিবেশ’ প্রকল্পের বরাদ্দ-ব্যয় এবং কার্যক্রম
সম্পর্কে বছরভিত্তিক তথ্য, প্রকল্পের আওতায় বনজীবীদের বাছাই প্রক্রিয়ার ধাপ এবং তালিকাসহ
জরিপ রিপোর্ট চাওয়া হয়। ২০১২ থেকে
২০১৭ সাল পর্যন্ত পরিচালিত
‘ক্রেল’ প্রকল্পের বছরওয়ারি এলাকাভিত্তিক বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্যও
জানতে চাওয়া হয়। এছাড়া অর্থবছর
অনুযায়ী প্রকল্প দুটির সমাপ্তকৃত প্রতিবেদনের ফটোকপি পাওয়ার আবেদন করা হয়।
আবেদনের
জবাবে সংস্থাটি গত ২৫ আগস্ট
ইমেইলে স্বাক্ষরবিহীন একটি পত্রের মাধ্যমে জানায়, প্রকল্পের প্রধান বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান কেমনিক্স ইন্টারন্যাশনাল ইনক। সিএনআরএস এই
প্রকল্পের অনেকগুলো অংশীদারের একটি। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে কোনো প্রযুক্তিগত পদ্ধতি
বা আর্থিক তথ্যের মালিকানা তাদের অনুমতি ছাড়া প্রকাশযোগ্য নয়।
অন্যদিকে উপকারভোগীর ব্যক্তিগত তথ্য সিএনআরএসের ডেটা
প্রোটেকশন পলিসি অনুযায়ী কেবল বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষের
কাছে প্রকাশযোগ্য। সিএনআরএস আরও জানায়, ‘ক্রেল’
প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান উইনরক ইন্টারন্যাশনাল। এনজিওটি ওই প্রকল্পের অনেকগুলো
পার্টনারের একজন। তাদের বাস্তবায়িত অংশের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৮
সালের ৩১ জুলাই। সিএনআরএসের
নীতি অনুসারে পাঁচ বছরের বেশি
কোনো তথ্য সংরক্ষণ করা
হয় না।
এরপর
৯ সেপ্টেম্বর সিএনআরএসের নির্বাহী পরিচালক ড. মোকলেছুর রহমানের
বরাবর আপিল আবেদন করা
হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর
নির্বাহী পরিচালক স্বাক্ষরিত একটি পত্রের মাধ্যমে
সিএনএস জানায়, প্রকল্প দুটি ইউএসএআইডি এবং
বাংলাদেশ সরকারের। এগুলোর বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ছিল কেমনিক্স ইন্টারন্যাশনাল
ইনক এবং উইনরক ইন্টারন্যাশনাল।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ছিল বন অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিলপত্রটি গ্রহণ
করা সম্ভব হচ্ছে না। পূর্বে গৃহীত
সিদ্ধান্তটি প্রতিষ্ঠিত নীতি, প্রক্রিয়া এবং প্রযোজ্য নির্দেশনার
ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল। তাই ওই সিদ্ধান্তই
চূড়ান্ত।
এছাড়া
৩১ আগস্ট এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর উপপরিচালক (সাধারণ) ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
সিনিয়র সহকারী সচিব এসএম জামাল
আহমেদ বরাবর তথ্য অধিকার আইনে
একটি আবেদন করা হয়। এতে
তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা
একই তথ্যগুলো চাওয়া হয়।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর এসএম
জামাল আহমেদ চিঠি দিয়ে জানান,
সিএনআরএস সংস্থা কর্তৃক প্রতিবেশ প্রকল্প এবং ক্রেল প্রকল্প
দুটি এনজিও বিষয়ক ব্যুরো হতে অনুমোদন গ্রহণ
করে বাস্তবায়ন করেনি বিধায় এর তথ্যাদি ব্যুরোতে
নেই। চিঠিতে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এর ২
(উ) ধারা অনুসারে সংশ্লিষ্ট
এনজিও বরাবর আবেদন করে তথ্য সংগ্রহ
করার অনুরোধ করা হয়। তিনি
সিএনআরএস এনজিওটির নির্বাহী পরিচালক বরাবর পত্রটির একটি অনুলিপি পাঠান।
এ ব্যাপারে তথ্য কমিশনের সাবেক
কমিশনার নেপাল চন্দ্র সরকারের কাছে মতামত জানতে
চাইলে তিনি বলেন, ‘সংস্থাটির
কাছে যেসব তথ্য সহায়তা
চাওয়া হয়েছে তা দেওয়ার মতো
ছিল। যেহেতু তারা তথ্য দিতে
অস্বীকার করেছে, এখন তথ্য কমিশনে
অভিযোগ দাখিল করতে হবে। তবে
বর্তমানে কমিশনে কোনো কমিশনার নিযুক্ত
না থাকায় পরবর্তীকালে এ বিষয়ে শুনানি
হতে পারে।’ এ বক্তব্যের পর
গত ৩০ অক্টোবর প্রধান
তথ্য কমিশন বরাবর একটি অভিযোগ দাখিল
করে রাখা হয়েছে।
এ ব্যপারে সুজন সম্পাদক বদিউল
আলম মজুমদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জনগণের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে
তা দিতে তারা বাধ্য।
না হলে তা আইনের
সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হবে। তাছাড়া প্রকল্পের
স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে
যাবে।’
রিসার্চ
ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের (রিব) উপপরিচালক রুহি
নাজ বলেন, ‘যেকোন প্রকল্পের একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন
সংশ্লিষ্ট এনজিওর কাছে থাকা বাধ্যতামূলক।
দাতা সংস্থার সঙ্গে তাদের যে চুক্তি হয়েছিল,
তাও তাদের কাছে থাকার কথা।’
তিনি বলেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারা
এ বিষয়ে পাশ কাটিয়ে গেছেন।
তবে দাতা সংস্থার বিদেশ
থেকে আনা বা নিজস্ব
তহবিল এদেশের কোনো কাজে ব্যয়
হলে, সরকারের কোনো-না কোনো
সংস্থার কাছে তার জবাবদিহিতা
থাকতে হবে। না হলে
তারা কোথায় কাজ করেছে বা
আদৌও করেছে কি না- সে
প্রশ্ন থেকে যাবে।’