খুলনা
মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:৪৩ পিএম
খুলনার কয়রা উপজেলার অবহেলিত জনপদ উত্তর বেদকাশীর কাঠকাটায় প্রায় ৩২ কিলোমিটার সড়কজুড়ে আজও ছড়িয়ে আছে এবড়ো-থেবড়ো ভাঙাচোরা অংশ ও অসংখ্য খানাখন্দ। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
খুলনার উপকূলঘেরা জনপদে বাস্তবতা যেন একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন পৃথিবীর ছবি। একদিকে নির্বাচনের মৌসুমে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, ঝলমলে পোস্টার আর ব্যানারে ভরা সড়ক; অন্যদিকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই উপকূলবাসীর উঠোনে নোনাজল, ভাঙা বেড়িবাঁধের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ছে নদীর গর্জন। রাতভর মানুষ ছুটছে বালুভর্তি বস্তা কাঁধে নিজেদের ঘর, জমি আর ভবিষ্যৎ বাঁচানোর জন্য। উন্নয়ন যেন কাগজে আটকে আছে আর দুর্ভোগের বাস্তবতা রয়ে গেছে মাটিতেই।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই উপকূলীয় অঞ্চল শুধু প্রকৃতির প্রতিকূলতার নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত অবহেলারও শিকার। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এই সংকটগুলো হঠাৎ তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্বল বাস্তবায়ন ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি এগুলোকে আরও গভীর করেছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল রক্ষায় নির্মিত ১,০১৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী অবকাঠামো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এই বাঁধগুলোর অন্তত তিন-চতুর্থাংশই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে বাঁধ শব্দটি এখন নিরাপত্তার প্রতীক নয়, বরং আশঙ্কার নাম।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর স্রোত বেড়েছে, জোয়ারের উচ্চতা অস্বাভাবিক হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতাও বাড়ছে। এসব বাস্তবতায় বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজন ছিল আধুনিক নকশা, জিওটেক্সটাইল ব্যবহার, প্রশস্ত স্লোপ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ মেরামত কাজই হয় স্বল্পমেয়াদি চিন্তা থেকে সঙ্কুচিত বাজেট, দুর্বল তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাবের সমন্বয়ে।
ফলে বর্ষা বা জোয়ার এলেই বাঁধ ভেঙে পড়ে। কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা কিংবা বটিয়াঘাটার বহু গ্রামে একই দৃশ্য নদীর পানি ঢুকে ফসলি জমি নষ্ট হয়, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
কয়রা মহেশ্বরীপুরের বাসিন্দা হালিমা খাতুন বললেন, আমাদের ঘর ছিল ওইখানে, এখন সব গাঙ হয়ে গেছে। বছর বছর পানি আসে, জমি যায়। সরকার বদলায় কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায় না।
খুলনা-৬ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পি বলেন, নির্বাচিত হলে তার প্রথম কাজ হবে ভৈরব নদে একটি সেতু নির্মাণ এবং নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, কয়রা ও পাইকগাছার মানুষকে চিকিৎসার জন্য ১০৪ কিলোমিটার ভাঙাচোরা রাস্তা পাড়ি দিয়ে খুলনা শহরে আসতে হয়। এই দুর্ভোগ লাঘবে ওই এলাকায় ২৫০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে স্থানীয় মানুষ নিজ এলাকাতেই চিকিৎসাসেবা পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার চিন্তাও রয়েছে। এতে সারা দেশের মানুষ কয়রা-পাইকগাছায় আসবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যারা এলাকা ছেড়ে শহরে চলে গেছে, তারা আবার নিজ এলাকায় ফিরে আসবে, বলেন তিনি।
মনিরুল হাসান বাপ্পি বলেন, আমরা একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও মডেল কয়রা-পাইকগাছা গড়ে তুলতে চাই।
উপকূলীয় খুলনার সবচেয়ে নীরব কিন্তু ভয়ংকর সংকট হলো লবণাক্ততা। মাটি ও পানিতে লবণের মাত্রা বাড়তে থাকায় সুপেয় পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্ষা ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় টিউবওয়েলের পানি নোনা, পুকুর ও জলাশয়ের পানি পানযোগ্য নয়।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু এলাকায় রিভার্স ওসমোসিস (আরও) প্লান্ট বসানো হলেও সংখ্যায় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক প্লান্ট আবার রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়ে আছে। ফলে নারীদের কিলোমিটার পর কিলোমিটার হাঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়, যা তাদের সময়, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি পান করার ফলে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন জটিলতা, কিডনি ও ত্বকজনিত রোগ বাড়ছে। অথচ নিরাপদ পানির স্থায়ী সমাধানে বড় মাপের সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
গ্রামীণ উপকূলের বাইরে শহর খুলনাও ভিন্ন কোনো স্বস্তির জায়গা নয়। মহানগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় পরিকল্পিত ড্রেন নেই, যেখানে আছে সেগুলোও ভরাট ও অকার্যকর।
বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ড্রেনেজের সমস্যাটা কোনো সরকারের সময়ই সমাধান হয়নি। আমরা পানি সহ্য করি, যানজট সহ্য করি নেতারা শুধু নির্বাচনের সময় এসবের কথা বলেন।
একসময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি জুটমিলের ভার বইছে। খালিশপুর ও দৌলতপুর এলাকার হাজারো শ্রমিক পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে। নতুন শিল্প স্থাপনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে খুলনার উপকূলীয় ছয়টি আসন ও মহানগরে প্রায় ২০ লাখ ভোটার আবারও আশার আলো দেখছেন। তবে সেই আশার সঙ্গে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা ও অনাস্থা।
এক সাবেক জুটমিল শ্রমিকের ভাষায়, ভোটে উৎসাহ নাই। উৎসাহ আছে কবে আমাদের মিল চালু হবে। যে নেতৃত্ব মিল চালু করবে, তাকেই ভোট দেব। এই বক্তব্য শুধু একজনের নয়, এটি হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশার প্রতিফলন।
প্রার্থীরা অবশ্য প্রতিশ্রুতির ঝুলি খুলে বসেছেন টেকসই বেড়িবাঁধ, লবণাক্ততা মোকাবিলায় পানি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক হাসপাতাল, কর্মসংস্থান। খুলনা-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, এই অঞ্চলে আধুনিক হাসপাতাল নেই। নির্বাচিত হলে এটি হবে আমার প্রথম কাজ। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন এই প্রতিশ্রুতিগুলো কি আগের মতোই কাগজে থেকে যাবে, নাকি বাস্তবায়নের মুখ দেখবে? খুলনার মানুষের জীবন মানেই প্রতিদিনের লড়াই নদীভাঙন, লবণাক্ততা, নিরাপদ পানির সংকট, ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ আর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে। তবু নির্বাচন এলেই তারা আবারও আশা করেন হয়তো এবার কেউ তাদের কথা শুনবে। ২০ লাখ ভোটারের এই জেলা এখন অপেক্ষায় কে আসবে শুধু আশ্বাস দিতে নয়, বরং সমাধান, প্রকল্প, বাজেট ও বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা নিয়ে? উত্তর মিলবে ভোটকেন্দ্রে। আর মানুষের প্রত্যাশা একটাই নিরাপদ বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানি এবং সম্মানজনক জীবনের টেকসই ভবিষ্যৎ।