তানভীর হাসান ও কবির হোসেন
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৮:৫৫ এএম
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনাটি দীর্ঘ পরিকল্পনার ফসল। কারণ খুনের চেষ্টাকারীরা কৌশলে তার পাশেই দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছিল এবং হাদিও তাদের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। এ কারণে হামলাকারীরা ছিলেন সন্দেহের বাইরে। ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ফয়সাল করিম দাউদ নামে একজনকে শনাক্ত করে তার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। যাকে বিভিন্ন সময় হাদির পাশে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এ কারণে এটি দীর্ঘ পরিকল্পিত একটি হত্যাচেষ্টার ঘটনা বলে ধারণা করছেন তদন্তে যুক্ত কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, হামলাকারীরা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্য সীমান্তে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।
এদিকে হাদির ওপর হামলার ঘটনায় এখনও কোনো মামলা করা হয়নি। তবে তদন্ত এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
হাদির অবস্থা এখনও ‘আশঙ্কাজনক’: মেডিকেল বোর্ড
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাদির অবস্থা এখনও ‘আশঙ্কাজনক’। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) বিকালে হাসপাতালের আইসিইউ অ্যান্ড এইচডিইউর সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. জাফর ইকবালের পাঠানো বার্তায় এ তথ্য জানা গেছে। বার্তায় বলা হয়েছে, হাদির চিকিৎসায় হাসপাতালটির বিভিন্ন বিভাগের ১৩ জন চিকিৎসকের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। হাদির বর্তমান অবস্থার বিষয়ে বলা হয়েছে, তার মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেহেতু অস্ত্রোপচার হয়েছে, সেহেতু এখন তাকে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ব্রেন প্রটেকশন প্রটোকল অনুসরণ করে অন্য সব সাপোর্ট চালিয়ে যেতে হবে। যদি অবস্থা একটু স্থিতিশীল হয়, তাহলে মস্তিষ্কে আবার সিটি স্ক্যান করানো যেতে পারে।
‘ব্রেন স্টেমে’ আঘাতের কারণে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন ওঠানামা করছে জানিয়ে বার্তায় বলা হয়, ‘রক্তচাপের জন্য সাপোর্ট যেভাবে দেওয়া আছে, সেটা সেভাবেই চলবে। যদি হৃদস্পন্দন কমে যায়, তাহলে সাময়িকভাবে পেসমেকার লাগানো হবে। এজন্য একটি দল প্রস্তুত আছে। হাদির ফুসফুসে আঘাত আছে ও ‘চেস্ট ড্রেইন টিউবে’ অল্প রক্ত আসছে বলেও মেডিকেল বোর্ডের বার্তায় বলা হয়। ‘ফুসফুসে সংক্রমণ’ ও ‘এআরডিএস’ যেন ডেভেলপ না করে, সেদিকে খেয়াল রেখে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। বার্তায় বলা হয়, তার কিডনির কার্যক্ষমতা ফেরত এসেছে, সেটাকে ধরে রাখার জন্য ‘ফ্লুইড ব্যালেন্স’ যেভাবে ঠিক রাখা হচ্ছে, সেভাবেই চালিয়ে যেতে হবে। হাদির শরীরে রক্ত জমাট বাঁধা ও রক্ত ক্ষরণ হওয়ার মধ্যে যে ‘অসামঞ্জস্যতা’ দেখা দিয়েছিল (ডিআইসি) সেটা অনেকটাই ঠিক হয়ে আসছে জানিয়ে বোর্ড বলছে, ‘এটাকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদান ট্রানফিউস করতে হবে।’
সন্দেহভাজনদের তালিকায় ৭ জন
ধারণা করা হচ্ছে, হাদিকে হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনা দেশের বাইরে বসে করা হয়েছে। মূল টার্গেট ছিল খুন করা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় দেশে অবস্থান করা প্রশিক্ষিত কিলারদের। এদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেই মূল রহস্যভেদ করা যাবে। তবে পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানাচ্ছে, সন্দেহভাজনরা এর মধ্যে গোয়েন্দা জালে উঠে এসেছে। এখন তাদের হেফাজতে নেওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। সন্দেহভাজনদের তালিকায় রয়েছে ৭ সদস্যের একটি প্রশিক্ষিত দল। এদের মধ্যে শোভন, সিয়াম ও নাদিমের নাম পাওয়া গেছে। তবে নামগুলো আসল নাকি ছদ্মনাম তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এটি একটি কন্ট্রাক কিলিং চেষ্টার ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ৭ জনকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে গ্রেপ্তারের কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে।’
‘দুবাই থেকে হামলার নির্দেশ’
একটি সূত্রমতে, হাদির ওপর হামলার ঘটনায় দুবাইতে অবস্থান করা এক শীর্ষ সন্ত্রাসী যুক্ত থাকার আলামত মিলেছে। এই সন্ত্রাসী সম্প্রতি দুই দফা ভারতে এসেছেন, এমন তথ্য রয়েছে। ওই সন্ত্রাসীকে একটি পক্ষ হত্যার কন্ট্রাক্ট দেয়। এরপর দুবাইতে বসে হাদির ওপর হামলার নির্দেশ দেন তিনি। সূত্রমতে, অনেক আগে থেকেই তার হয়ে কাজ করে আসছিল ফয়সাল করিম দাউদ। দাউদ শার্প শুটার হিসেবে পরিচিত। এর আগে এক ঘটনায় দাউদ ২টি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হলে তাকে জামিনে মুক্ত করে হাদির পাশে ভিড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সে দ্রতই হাদির আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তার ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। আসামিরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর এ হামলার কারণ আরও ভালোভাবে জানা যাবে বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এর পেছনে দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্র রয়েছে।
পুলিশকে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ
ইতোমধ্যে হাদির ওপর হামলা করা একজনের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন হাদির ওপর হামলাকারী আদাবর থানার নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তার ব্যাপারে তথ্য দিতে সবাইকে অনুরোধ জানিয়ে ডিএমপি জানায়, ওসমান বিন হাদির ওপর হামলাকারীদের খুঁজতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। শনাক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে পুলিশকে জানাতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। যোগাযোগের জন্য তিনটি মুঠোফোন নম্বর জানিয়েছে পুলিশ। এগুলো হলোÑ ০১৩২০০৪০০৮০ (মতিঝিলের উপকমিশনার), ০১৩২০০৪০১৩২ (পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ও ৯৯৯ নম্বর। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন থাকবে।
সন্দেহভাজন দাউদ কখনও তাদের গ্রামে যায়নি
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সন্দেহভাজন ব্যক্তির একাধিক ছবি যাচাই-বাছাই করে জানা যায়, ওই ব্যক্তির বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে। তার নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রহুল ওরফে দাউদ। স্থানীয় বাসিন্দা হুমায়ূন কবিরের ছেলে দাউদকে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুট করে নেওয়ার ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে আদাবর থানায় মামলা রয়েছে। সন্দেহভাজন এই দাউদ গত ৯ ডিসেম্বর কালচারাল সেন্টারে গিয়ে হাদির পাশে বসে আলোচনাও শুনেছেন।
মাসুদের আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়রা জানান, সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রহুলের বাবা হুমায়ন কবির ওরফে মালেক প্রায় ৩৫ বছর আগে ঢাকাবাসী হন। সন্দেহভাজন হামলাকারী মাসুদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। গ্রামের বাড়িতে সে কখনও আসেনি। গ্রামের কেউ তাকে কেউ কখনও দেখেনি বা চেনে না। তাদের গ্রামের সম্পত্তিও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। মাসুদের চাচি মিনারা বেগম (৫৫) বলেন, ‘মাসুদের পরিবার ৩৫ বছর ধরে ঢাকায় থাকে। আমরা কখনও তাদের দেখিনি এবং তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগও নেই।’
যা বলছেন কর্মকর্তারা
সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী জানান, ওসমান বিন হাদীর ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত আসামিরা যাতে কোনোভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালাতে না পারে, সেজন্য বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল শনিবার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে এক অনুষ্ঠান শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থীর নিরাপত্তায়ই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। শিগগিরই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।’ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনই বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। পরে বিস্তারিত জানা যাবে। আমরা প্রাইম টার্গেটকে খুঁজছি। এখনও ২৪ ঘণ্টা পার হয়নি। হোপফুলি এটা আমরা ডিটেক্ট করতে পারব।’