ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩০ এএম
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ‘পুষ্টিহীন’ দশা
অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতি বছর দেশে ৩৫ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং প্রতিদিন অন্তত ৫ শতাংশ মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এ থেকে উত্তরণে খাদ্যে নিরাপদতা নিশ্চিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। খাদ্য নিরাপদতা নিশ্চিতে কর্মকর্তা পর্যায়ে জনবল রয়েছে ১২৯ জন। অর্থাৎ সোয়া ১৩ লাখ মানুষের পেছনে মাত্র একজন করে কর্মকর্তা রয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাম ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। এটি চলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তেমনই কানাডা, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত সংক্রান্ত সংস্থাগুলোও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। অথচ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম তদারকি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়!
বিএফএসএর সাংগঠনিক কাঠামো অনুসারে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব মোট জনবল ৩৭৪ জন। এর মধ্যে কর্মকর্তার সংখ্যা ১২৯ জন। অর্থাৎ প্রায় সোয়া তেরো লাখ জনগণের খাদ্য নিরাপদতার দায়িত্ব পড়ে একজন কর্মকর্তার ঘাড়ে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে জনবল আছে ১৮ হাজার, কানাডায় ১৪ হাজার, ভারতে ৭ ও ইন্দোনেশিয়ায় ৪ হাজার।
বিএফএসএ সূত্রে জানা যায়, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জনবল বাড়াতে ২০২২ সালে ১৮০০ পদ সৃজনের রূপরেখা দিয়ে জনপ্রশাসনে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। সেখানে মাত্র ৮টি নতুন পদ সৃজনের জন্য অনুমোদন পায়।
২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বিএফএসএর দুটি গবেষণায় দেখা যায়, লালশাক ও শিম, শসা, ঢেঁড়স, পটোলের মতো সবজিতে মিলছে ক্ষতিকর ভারী ধাতু। আম, লিচুসহ অন্যান্য ফলেও কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্যগত সমস্যা। সেদিন চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন, এসব গবেষণা ও ফলাফলের দায় সম্পূর্ণ গবেষকের, আমরা এর দায় নেব না।
বিএফএসএ প্রতি বছর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের অনুদান দিয়ে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০টি গবেষণার অনুকূলে প্রায় ১ কোটি টাকা দেওয়া হয়। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য, প্রাপ্ত নেতিবাচক ফলাফলের প্রতিরোধের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া। অদৃশ্য কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, তাদের চিঠিও ইস্যু করা হয়নি।
বিএফএসএ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৭১৩টি নমুনা পরীক্ষা করে। তার মধ্যে মানসম্মত নমুনার সংখ্যা ১ হাজার ১৪২টি, বাকি ৫৭১টি নমুনার ফলাফলে বিরূপ অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট উপাদানসমূহ অনুমোদিত মাত্রার ওপরে। মোট পরীক্ষণকৃত নমুনার প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্যই মান বহির্ভূত। কিন্তু এই ৩০ শতাংশ মান বহির্ভূত নমুনার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ না নিয়ে দায়সারা পত্র প্রেরণ করেই দায়িত্ব সেরেছে।
২০১৫ সালে বিএফএসএ প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো বিভিন্ন পদের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। আইনে চেয়ারম্যানের ক্ষমতাবলে প্রশাসনিক জরিমানা প্রয়োগের বিধান থাকলেও অজানা কারণে কেউ কর্মকর্তাদের এই ক্ষমতা দেয়নি। উল্টো চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় জেলা কর্মকর্তারা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একই পদমর্যাদার সহকারী পরিচালকদের নেতৃত্বে পরিচালিত বাজার অভিযানে ‘সহায়ক স্টাফ’ হিসেবে অংশ নিচ্ছে।
বর্তমান খাদ্য উপদেষ্টা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন প্রায় ১৫ মাস। এ সময়ে মাত্র একবার নিরাপদ খাদ্য বিএফএসএর কার্যালয় পরিদর্শন করেছেন। সময় ছিল ১০ মিনিট। ২০২০ সালে কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা পর্যায়ে ১০২ জনকে প্রথম নিজস্ব জনবল নিয়োগ করা হয়। এ সময় ২৬ জন সমগ্রেডের অন্য চাকরিতে চলে গেছেন।
বিএফএসএর খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন সেক্টরের সাবেক সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জনবল সংকট দূরীকরণে আমরা প্রস্তাব দিয়ে এসেছিলাম। সেটি অনুমোদন দেওয়া আছে। আমরা পর্যায়ক্রমে লোকবল নিয়োগের কথা বলেছিলাম।
বিএফএসএর বর্তমান চেয়ারম্যান জাকারিয়া প্রায় ১ বছর ৮ মাস যাবৎ কর্মরত। তার পড়াশোনা ছিল পদার্থবিজ্ঞানে। এর আগের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল কাইউম সরকার পড়েছেন বিবিএ-তে। অথচ নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর ৯ নম্বর ধারায় বলা আছে, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হতে হলে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে কমপক্ষে ২৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন। চেয়ারম্যানের পরের পদ সদস্য। বিএফএসএর মোট সদস্য চারজন। ২০১৩ সালে সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০ বছরের নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ থাকলেও কখনোই তা প্রতিপালন করা হয়নি। বর্তমানে কর্মরত আ ন ম নাজিম উদ্দীন পড়াশোনা করেছেন লোক প্রশাসনে। নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে ন্যূনতম অভিজ্ঞতাহীন এই ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে।
এ ছাড়া উপপরিচালকের ১২টি পদে প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল ডিগ্রিধারী কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে প্রশাসন ক্যাডার থেকে প্রেষণে পদায়ন করা হয়। বিএফএসএর সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে। এখানে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয় তাদের বিশাল একটি অংশ কাজ করে না।
বিএফএসএর প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান মুশতাক হাসান মুহম্মদ ইফতেখার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী করতে হলে মূলে যেতে হবে। বর্তমানে তারা নিজেদের বিএসটিআই, ভোক্তা অধিদপ্তর পর্যায়ের এজেন্সি মনে করছে। অথচ বিএফএসএ তৈরি করা হয়েছে সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ দেশের সাড়ে ৪০০ এজেন্সির অ্যাপেক্স বডি হিসেবে। সেসব প্রতিষ্ঠান খাদ্য নিরাপদতা নিশ্চিত করবে আর বিএফএসএ রোল অব গেম ঠিক করে দেবে।
প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক আজ
নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) প্রতিষ্ঠার ভেজাল ও দূষিত খাদ্য সম্পর্কিত অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসলেও উচ্চ পর্যায়ের সভা কখনও অনুষ্ঠিত হয়নি। সে লক্ষ্যে আজ রবিবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে একটি পর্যালোচনা সভা হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। সভায় কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের পাশাপাশি অংশ নিবেন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, কৃষি সচিব, খাদ্য সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, বাণিজ্য সচিব এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব। এ ছাড়া থাকবেন বিএসটিআই ও ভোক্তার মহাপরিচালক এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান।