নূর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:১২ এএম
অবৈধ লেনদেন। প্রতীকী ছবি
আর্থিক লেনদেন, নানা অনিয়ম ও প্রতিবন্ধকতা দূর করতে অনলাইনে সাধারণ ডায়রি (জিডি) চালু করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা মিলছে না। ডিজিটাল পদ্ধতিতে জিডি চালুর কিছুদিন পরই নানা জটিলতার পাশাপাশি উঠছে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও। অনলাইন জিডির নিয়ন্ত্রণ এখন থানার পার্শ্ববর্তী কম্পিউটার দোকানি ও দালালচক্রের হাতে। তাদের এড়িয়ে সরাসরি থানায় গেলেও কাজ হচ্ছে না। খোদ থানা থেকেই বলা হচ্ছে, দোকানে গিয়ে অনলাইন করে আসতে। এ ছাড়া মিলছে না জিডির নম্বর ও তদন্ত কর্মকর্তার সই। আর এ কাজের জন্য সেবাগ্রহীতাকে গুনতে হচ্ছে ৩০০-৫০০ টাকা। ভোগান্তি তো আছেই। এ ছাড়া দক্ষতার অভাব ও এনআইডি জটিলতাসহ নানা কারণে অনলাইন জিডিতে আগ্রহও হারাচ্ছে মানুষ।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, থানায় গেলে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা কম্পিউটার দোকান থেকে আবেদন করার কথা বলেন। দোকানে গেলে দেখা যায় দীর্ঘ সিরিয়াল, অপেক্ষার বিড়ম্বনা আর ২০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ। অথচ অনলাইন জিডি করতে কোনো সরকারি ফি নেই বলে ঘোষণা ছিল পুলিশ সদর দপ্তরের।
তারা বলছেন, সরকারি অ্যাপ (GD App) বা ওয়েবসাইটে (gd.police.gov.bd) প্রবেশ করতে গেলেই আটকে যান সেবাগ্রহীতারা। এনআইডি নম্বর, মোবাইল ভেরিফিকেশন, লাইভ ছবি তুলতে না পারা কিংবা পুরোনো এনআইডির সঙ্গে ছবি ম্যাচ (মিল) না হওয়াÑ এসব কারণেই হাজারো মানুষ বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, এনআইডিতে থাকা ছবি ১০-১২ বছর আগের। লাইভ ছবির সঙ্গে মিলছে না। বারবার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রযুক্তিগত ঝামেলা সামলাতে না পারায় সেবাগ্রহীতারা বাধ্য হয়ে থানায় গেলেও দোকানদারদের অঘোষিত টোল দিয়েই জিডি করতে হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কম্পিউটার দোকানগুলোতে অনলাইন জিডির আলাদা প্যাকেজ রয়েছে। শুধু অ্যাকাউন্ট খোলা ২০০ টাকা, পুরো জিডি প্রক্রিয়া ৩০০-৫০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। জটিলতা থাকলে ‘আরও লাগবে ভাই, ব্যাপারটা কঠিন’ উল্লেখ করে ব্যক্তিভেদে আরও বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে।
দোকানদাররাও ভুক্তভোগীদের যুক্তি দেখাচ্ছেন, ‘ভাই, সার্ভার স্লো, ছবি তুলতে সমস্যা, বারবার রিজেক্ট আসে, তাই সময় লাগে। এজন্য চার্জ নিচ্ছি।’ বিকল্প না থাকায় সাধারণ মানুষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও টাকা দিয়েই কাজ শেষ করেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে অনলাইনে তিন লাখ ৬০ হাজার ৭৬৪টি জিডি রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪২ হাজার ৮৭৮টি মানুষ সত্যিকার অর্থে ‘ঘরে বসে’ করেছেন। বাকি তিন লাখ ১৭ হাজার ৮৮৬টি জিডি হয়েছে থানা বা বাইরে দোকানের সহায়তায়, যেখানে ব্যবহার হয়েছে পুলিশের লগইন বা দোকানের কম্পিউটার।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুরনো এনআইডিতে নিম্নমানের ছবি ও বায়োমেট্রিক না মেলার কারণে অনেকেই ব্যর্থ হচ্ছেন। যে কারণে ছবি ৯৫% মিললেই রেজিস্ট্রেশন দিচ্ছি। পুরনো এনআইডির ছবি নিম্নমানের হওয়ায় অনেকে জিডি করতে গিয়ে হাল ছেড়ে দেন। আবার অনেকে দোকানে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাজ সেরে নেন।
মতিঝিল থানায় মোবাইল হারানোর জিডি করতে আসা যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা শান্ত বলেন, থানায় গেলে পুলিশ নিজে না করে দোকানে পাঠিয়ে দেয়। দোকান থেকে অনলাইন করে আসার কথা বলেন। সেখানে আবেদন করতে ৩০০-৫০০ টাকা নেয় দোকানদাররা।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সবাই চায় না থানার কম্পিউটার দিয়ে মানুষকে সহায়তা করতে। অনেক সময় ভিড় থাকে, থানার লোকবলও কম। তাই বাইরে পাঠিয়ে দেয়।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, এনআইডির ছবি-ম্যাচিং সফটওয়্যার আরও আধুনিক করতে হবে। থানায় ‘অনলাইন জিডি ডেস্ক’ বাধ্যতামূলকভাবে চালু করতে হবে। ‘ফ্রি সার্ভিস’-এ বার্তা প্রচার করতে হবে। অ্যাপ ইন্টারফেস আরও সহজ ও বাংলা-বান্ধব করতে হবে।
এ বিষয়ে ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জিডি করতে টাকা লাগে না। যদি দোকান থেকে অনলাইন করে আনার কথা পুলিশ বলে এবং দোকানিরা টাকা আদায় করেÑ এমন অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও এমনটি হওয়ার কথা নয়।