নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:২৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, শহীদদের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান, অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন এবং বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে সঠিক ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরতে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রায় ১৭ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করা হয়েছে। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও বাহিনীগুলোর মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবেদনে বেশ কিছু কাঠামো ও নীতিগত প্রস্তাবও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে জাতীয় বিপর্যয়ে সামরিক বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনাল মোতায়েনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি পর্যালোচনার করার সুপারিশ করেছে কমিশন। সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার সুপারিশ করে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো কাজে নিয়োজিত করলে তাদেরকে কোনো রকম রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই কাজ করতে দিতে হবে। প্যারালাল কমান্ড স্থাপন হবে আত্মঘাতী। এ ছাড়া দেশের কোনো বাহিনীকেই সে বাহিনীর ‘ক্লাসিক্যাল রোল’-এর বাইরে নিয়োজিত না করতে প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ইতোমধ্যে ঘোষিত সেনা শহীদ দিবসকে ‘গ’ শ্রেণি হতে ওপরের শ্রেণিতে উন্নীত করার সুপারিশ করে প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে, এই দিনে সশস্ত্র বাহিনী ও অন্য সকল বাহিনীতে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার এবং হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রকারী ও সহায়তাকারীদের স্বরূপ উন্মোচনের মাধ্যমে এই ঘটনার প্রকৃত ইতিহাস চর্চা জরুরি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর তিনটি মৃতদেহ অশনাক্ত অবস্থায় ছিল। অপরদিকে তিনজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে অশনাক্ত মৃতদেহ তিনটি যাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি তাদের আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া হয়েছিল। মেজর সৈয়দ গায়ালী দস্তগীর এবং ডিএডি মো. ফসিহ উদ্দিনের স্বজনের এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ না থাকলেও মেজর মো. তানভীর হায়দার নূরের স্ত্রী তাসনুভা মাহা এখন পর্যন্ত প্রদত্ত মৃতদেহটিকে তার স্বামীর মৃতদেহ হিসেবে গ্রহণ করেননি। মিসেস তাসনুভা মাহার দাবির প্রতি সম্মান রেখে তার স্বামীকে ‘মিসিং ইন অ্যাকশন’ দেখিয়ে দেশের প্রচলিত আইন/সেনা আইন অনুযায়ী বিষয়টি সুরাহা করার সুপারিশ করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রধানের বক্তৃতা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার সময় যেসব অফিসার আবেগপ্রবণ হয়ে কথা বলেছিলেন তাদের মধ্যে ৬ জন অফিসারকে পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত করা হয়। সহকর্মী অফিসারদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। উক্ত ৬ জন অফিসারকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পুনর্বাসনের সুপারিশ করেছে কমিশন। চাকরিচ্যুত ৬ সেনা কর্মকর্তা হলেনÑ বিএ-৩১৩২ লে. কর্নেল মো. সামসুল ইসলাম, বিএ-৩৩৬০ লে. কর্নেল মাহদী নাছরুল্লাহ শাহীর, বিএ-৩৫৬৩ লে. কর্নেল মো. শফিউল হক চৌধুরী, বিএ-২৬১৭ মেজর মো. মোহসিনুল করিম, বিএ-৬৪৯১ ক্যাপ্টেন হাবিবা ইসলাম এবং বিএ-৬৫৬০ ক্যাপ্টেন এ কে এম আন্নুর হোসেন। এ ছাড়া কমিশন তাদের প্রতিবেদনে তাপস হত্যাচেষ্টা মামলায় ফাঁসিয়ে অন্যায়ভাবে ৫ জন অফিসারকে চাকরিচ্যুতিসহ জেল দেওয়া হয়। তাদের শাস্তি প্রত্যাহারপূর্বক যথাযোগ্য মর্যাদায় পুনর্বাসনের সুপারিশ করা হয়েছে। এই ৫ জন সেনা কর্মকর্তা হলেনÑ বিএ-৫৫৯০ মেজর ডা. হেলাল মুহাম্মদ খান, পিএসসি, বিএ-৬১১৫ ক্যাপ্টেন মো. রেজাউল করিম, বিএ-৬৪২৫ ক্যাপ্টেন খন্দকার রাজীব হোসেন, বিএ-৬৪২৮ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফুয়াদ খান শিশির এবং বিএ-৬৭০১ ক্যাপ্টেন মো. খান সুবায়েল বিন রফিক।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হযেছে, যে তিনজন বিডিআর সদস্য বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন তাদের আত্মত্যাগের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর মো. নূরুল হককে ইতোমধ্যেই শহীদ ঘোষণা করা হয়েছে। আরডিও-৮৭ এডি খন্দকার আব্দুল আউয়াল এবং জেসিও-৪৩৭৭ সুবেদার সহকারী মো. আবুল কাশেমকে শহীদ ঘোষণা করে জাতীয় স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হলো। এ ছাড়া বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সময় বিডিআরের মালিসহ যে পাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন তাদেরকেও শহীদ ঘোষণা এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে সুপারিশ করেছে কমিশন।
কমিশনের প্রতিবেদনে বিজিবিতে কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং মনোবল ও নৈতিকতার উন্নয়ন। পদোন্নতি ও পুরস্কার প্রদান প্রক্রিয়ায় লিখিত ও ঘোষিত নীতিমালার আলোকে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক নীতি অনুসরণ করার পাশাপাশি সবার জন্য উন্নত রেশন, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পারিবারিক সুবিধা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাকরণ, মানসিক ও নৈতিক সহায়তা প্রদানে প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি বিশেষ ক্ষেত্রে ‘স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও সাইকোলজিক্যাল ইভালুয়েশন প্রোগ্রাম’ চালু করার সুপারিশও করা হয়েছে।