ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ঢাকা ও মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:১৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সুন্দরবন শুধু লোনাজল, কেওড়া গাছ আর বাঘের রাজত্ব নয়; এই বন জীববৈচিত্র্যে ভরপুর হাজার বছরের প্রাকৃতিক বিস্ময়। কিন্তু সুন্দরবন এখন প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হয়ে উঠছে হরিণ শিকারিদের দৌরাত্ম্যে। বনের গভীরে, চরগুলোতে পেতে রাখা সূক্ষ্ম নাইলনের ফাঁদ, স্প্রিংযুক্ত ঝাঁপানো ফাঁদ, কলায় বড়শি ঝুলিয়ে প্রলোভন কিংবা চেতনানাশক ওষুধ এর সবই রাখা হরিণ শিকারের উদ্দেশ্যে। পূর্ব সুন্দরবনের দুবলার চর, কচিখালী, তালপট্টি, মানিকখালী, কবরখালী ও হিরণ পয়েন্ট এলাকাগুলো শিকারিদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। স্থানীয়রা বলেন, এই জায়গাগুলো ‘হরিণ শিকারিদের স্বর্গরাজ্য’।
নির্দিষ্ট মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ও মধু আহরণের অনুমতি দেওয়া হলেও অনেক চোরা শিকারি সেই সুযোগে বনের গভীরে প্রবেশ করেন। তাদের কেউ অনুমতি নিয়ে, আবার কেউ অনুমতি ছাড়াই মাছ-কাঁকড়া ধরার নামে সুন্দরবনে ঢুকে বন্য প্রাণী, বিশেষ করে হরিণ শিকার করেন।
স্থানীয়রা বলছেন, সুন্দরবনের বাতাসে আগে নোনাজলের ঘ্রাণ, ভোরে হরিণের দৌড়ঝাঁপের শব্দ শোনা যেত। কিন্তু বাতাসে শুধুই হরিণের রক্তের গন্ধ। কান পাতলে শোনা যায় ফাঁদে আটকে প্রাণীর শেষ চিৎকার। সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি বাংলাদেশের শ্বাস উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেনÑ এই শ্বাস ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে। সরকার যদি দ্রুত এবং জরুরিভাবে সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে শুধু হরিণ নয়, হারাতে হবে সুন্দরবনও।
বনের ভেতরে শিকারিদের হরিণ শিকার প্রসঙ্গে বন বিভাগের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নাইলনের সুতা ও স্প্রিং বসানো ফাঁদগুলো এমনভাবে পাতা হয়, হরিণ বুঝতেই পারে না। এই ফাঁদে আটকা পড়লে শরীর কেটে যায়, শ্বাস আটকে যায় বা পা মুচড়ে যায়। মৃত্যুর আগে হরিণ দীর্ঘক্ষণ ছটফট করে। এটি শুধু নিষ্ঠুরতাই নয়, বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্যও হুমকির। কারণ হরিণ শুধু বনের সৌন্দর্য বা বাঘের খাদ্য নয়, এরা ঘাস নিয়ন্ত্রণে রেখে বনকে সুস্থ রাখে।’
হরিণের প্রিয় খাদ্য কেওড়া গাছের পাতা ও ফল। তাই শিকারিরা কেওড়া বনের নিচেই বেশি ফাঁদ পাতেন। স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবনের যেখানে কেওড়া গাছ বেশি, সেসব এলাকায় হরিণ চলাচল তুলনামূলক বেশি। শিকারিরা দড়ি দিয়ে ‘ডোয়া’ নামে লম্বা ফাঁদ তৈরি করে হরিণের চলার পথে রাখেন। এতে চলাফেরার সময় হরিণ আটকা পড়ে। ‘ছিটকে ফাঁদ’ নামে আরেক ধরনের ফাঁদে ধরা পড়ে হরিণ। শিকারিরা সাধারণত দড়ির বোঝা নিয়ে বনে ঢোকে এবং ভেতরেই ফাঁদ তৈরি করেন। পরে এসব ফাঁদ বস্তায় ভরে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়, বারবার ব্যবহারের জন্য।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি (২৬ নভেম্বর) বন বিভাগের চরপুটিয়া টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীদের টহলে গহিন জঙ্গলের চরের খাল এলাকা থেকে উদ্ধার করে ৮০০ ফুট লম্বা হরিণ শিকারের পেতে রাখা ফাঁদ। একই দিনে হুলার ভারানী ও সূর্যমুখী খালসংলগ্ন বনাঞ্চলে হেঁটে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় আরও ১৩৫ ফুট লম্বা ফাঁদ। এর আগের দিন অর্থাৎ ২৫ নভেম্বর দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চরপুটিয়া ফাঁড়ির টহলে উদ্ধার হয় আরও দুটি ফাঁদÑ একটি ৫০০ ফুট লম্বা, আরেকটি বস্তায় ভরা অবস্থায়। একই দিনে শেলার চর এলাকার ভাঙার খাল থেকে উদ্ধার করা হয় ৩০০ ফুট লম্বা ফাঁদ।
জানা যায়, পাচারকারীরা কাঠকাটা, মহেশ্বরপুর, জসিং, কৈখালী স্টেশন ও বুড়িগোয়ালিনী খালপথ দিয়ে বনে ঢোকে এবং নদীপথে শিকার করা হরিণের মাংস বনের বাইরে পাঠিয়ে দেয়। এভাবে শিকার হওয়া মাংস পৌঁছে যায় মোংলার চিলা, জয়মনি, বৈদ্যমারী, কাটাখালী, মোরেলগঞ্জের জিউধরা, গুলিশাখালী, শরণখোলার ধানসাগর, রামপাল, তাফালবাড়ী, ঢাংমারী, খাজুরা, বানীশান্তা, সুতারখালী ও কালাবগি এলাকার বাজার ও ঘরে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, শিকার রোধে জেলে-মৌয়ালরা যদি বনের ভেতরে কোনো ফাঁদ দেখে তা উদ্ধার করে জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি ফাঁদ উদ্ধারের জন্য ২ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কোস্ট গার্ডও নদীপথে নজরদারি বাড়িয়েছে। এ বিষয়ে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সিয়াম-উল-হক বলেন, ‘সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে নিয়মিত টহল চলছে। পাচারকারীরা যাতে নদীপথে মাংস পরিবহন করতে না পারে, সে জন্য বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।’ তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাস্তবে অভিযানের সংখ্যা বাড়লেও শিকার বন্ধ হয়নি।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনভার্সেশন (আইইউসিএন) বা আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের হিসাবে বর্তমানে সুন্দরবনে হরিণ রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি। এর আগে ২০০৪ সালে হরিণের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৩ হাজার। অর্থাৎ গত ১৯ বছরে সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫৩ হাজার। কিন্তু বন বিভাগের তথ্য মতে, চোরা শিকারের কারণে এই বৃদ্ধির ধারা এখন থমকে গেছে। এক বন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, ‘একটি হরিণের প্রজনন চক্র প্রায় এক বছর। কিন্তু প্রতিদিন যদি অন্তত পাঁচটি হরিণ মারা যায়, তার মানে বছরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ হরিণ কমছে। এটি টেকসই নয়।’