× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফের দস্যুর কবলে সুন্দরবন, সক্রিয় অন্তত ১৬ বাহিনী

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ঢাকা ও মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:২৪ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

জল, জঙ্গল আর জীবনের মিলনমেলা সুন্দরবন। বহু শতাব্দী ধরে এই বন মানুষকে দিয়েছে জীবিকা, দিয়েছে আশ্রয়, নিঃশব্দে দিয়েছে সঙ্গ। কিন্তু সেই নীরব স্নিগ্ধতার আড়ালে আবারও ফিরেছে আতঙ্ক। ফের ভয়াবহ আতঙ্ক হয়ে উঠেছে জলদস্যুরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের আগস্টের পর থেকেই আবারও বনের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দস্যুচক্র। যাদের অধিকাংশই পুরনো দস্যু, কিংবা জেল থেকে পালানো অপরাধী।

বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সরকার দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে। এর আগে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে সুন্দরবনে সক্রিয় ৩২টি জলদস্যু দলের ৩২৮ সদস্য। সে সময় তারা ৪৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪ রাউন্ড গুলি জমা দেয়। এরপরই সরকার সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করেছিল। তখন ধারণা করা হয়েছিল, দুস্যদের এই আত্মসমপর্ণের মধ্য দিয়ে বহু দশকের দস্যুতার অবসান ঘটল। বন, নদী আর জীবিকার টানে জেলে ও বাওয়ালিরা নির্ভয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন, আর কাজ শেষে তারা নিরাপদে ঘরে ফিরবেন। কিন্তু সেই স্বস্তি আর শান্তি স্থায়ী হতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সুন্দরবনে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরনো ও নতুন দস্যুবাহিনী। 

বনজীবীরা বলছেন, এখনকার ভয়াবহতা আগের চেয়েও বেশি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একের পর এক অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে আবারও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বননির্ভর মানুষ। তবে কোস্ট গার্ডের দাবি তাদের অভিযানে জলদস্যুদের তৎপরতা অনেকটা কমেছে। কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোন বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৫ জলদস্যু ও তাদের সহযোগী। এ সময়ে ৪৮ জন জেলেকে জলদস্যুদের কবল থেকে উদ্ধার করার কথাও জানিয়েছেন তারা। সম্প্রতি কোস্ট গার্ডের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় সুন্দরবনের পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। বড় কোনো সক্রিয় দস্যু চক্র এখন নেই, তবে কিছু ছোট দল পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।’

ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ কিন্তু তাতে ছিল ফাটল

২০১৬ সালে আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরুর সময়ে আলোচিত দস্যু দল ছিল মাস্টার বাহিনী। তারা বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেয় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এবং পুনর্বাসনে রাজি হয়। তাদের দেখাদেখি আরও ৩২টি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। মোট ৩২৮ জন দস্যু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতিশ্রুতি দেয়। আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাওয়া এই দস্যুদেরকে সরকারের তরফ থেকে দেওয়া হয় আর্থিক অনুদান, মামলা প্রত্যাহারের সুবিধা এবং পুনর্বাসন প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সুযোগ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই প্রক্রিয়া ফিকে হয়ে যায়। তখন বলা হয়েছিল, সুন্দরবনের বুকে আর কখনও রক্ত ঝরবে না। কিন্তু পুনর্বাসন কার্যক্রম ছিল অসম্পূর্ণ ও অপ্রতুল। আত্মসমর্পণকারীদের স্থায়ী কাজ ছিল না, তাদের ওপর নজরদারিও ছিল দুর্বল। ফলে অনেকেই আবারও ফিরছে আগের জীবনে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন আত্মসমর্পণের পর পর্যাপ্ত পুনর্বাসন, নজরদারি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অনেকেই আবারও অপরাধ জগতে ফিরে গেছে।

আবারও সক্রিয় ১৬ দস্যু বাহিনী

কোস্ট গার্ড ও জেলেদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, বর্তমানে সুন্দরবনে অন্তত ১৬টি দস্যু বাহিনী সক্রিয়। তাদের মধ্যে রয়েছে করিম শরীফ বাহিনী (দলনেতা মো. করিম শরীফ), জাহাঙ্গীর বাহিনী (দলনেতা জাহাঙ্গীর), দয়াল বাহিনী (দলনেতা আলিফ মোল্লা দয়াল), দুলাভাই বাহিনী (দলনেতা রবিউল ইসলাম), ছোট সুমন বাহিনী (দলনেতা সুমন), হান্নান বাহিনী (দলনেতা হান্নান), রাঙ্গা বাহিনী (দলনেতা রাঙ্গা), ছোটন বাহিনী (দলনেতা ছোটন), মামা-ভাগনে বাহিনী (বাগেরহাট) প্রমুখ। এই বাহিনীগুলোর অনেকেই আগে আত্মসমর্পণ করেছিল। পরে ফের অস্ত্র হাতে তারা বনজীবীদের ওপর নিপীড়ন শুরু করেছে।

সুন্দরবনের ভেতরে দস্যুদের উৎপাত সম্পর্কে খুলনার কয়রার বাসিন্দা মো. রাশেদ আলী বলেন, ‘ভেবেছিলাম দস্যুর হাত থেকে মুক্তি মিলেছে। কিন্তু এখন আগের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি। একবার অপহৃত হলে মুক্তিপণ না দিলে ফেরা মুশকিল।’

কাঁকড়া ধরতে গিয়ে আসাবুর বাহিনীর হাতে অপহৃত দাকোপের জেলে মিনারুল ইসলাম জানান, ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কয়রার আনারুল ও আসমাউল সানা। মজনু বাহিনী তাদের মার্চ মাসে অপহরণ করে। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা ৫০ হাজার টাকা দিয়ে তাদের মুক্ত করে আনেন।

নতুন দস্যু গোষ্ঠীর উত্থান

গত বছরের ৫ আগস্টের পর সাতক্ষীরা জেলা কারাগার ভেঙে পালিয়ে যায় বহু কয়েদি। তাদের মধ্যে শ্যামনগরের কালিঞ্চি গ্রামের আবদুল্লাহ তরফদার ছিলেন নারী পাচার মামলার আসামি। অভিযোগ রয়েছে, কারাগার থেকে পালিয়ে সুন্দরবনে তিনি নতুন বাহিনী গঠন করেছেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ১০-১২ জন পালানো আসামি। এদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরনো অপরাধী, যারা অস্ত্র হাতে গড়ে তুলেছে নতুন দস্যু বাহিনী।

দস্যুদের হাতে এত অস্ত্র কীভাবে এমন প্রশ্নের উত্তর মিলেছিল আত্মসমর্পণের পর বনদস্যু মজনুর কাছে। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, ‘চোরাই পথে বিদেশ থেকে আসে বন্দুক। শহরের লোকজনই সেগুলো সুন্দরবনে পৌঁছে দেয়। এ ছাড়াও স্থানীয়ভাবে তৈরি ঠেলা বন্দুক বা এয়ারগান থেকে পরিবর্তিত অস্ত্রও ব্যবহার করা হয়।’ তবে অস্ত্রের মূল জোগানদাতা হিসেবে উঠে আসে বাচ্চু ওরফে ব্ল্যাকার বাচ্চুর নাম। ভারতের সঙ্গে তার চোরাই মালামালের ব্যবসা রয়েছে। নৌরুটে অবাধে পণ্য আনা-নেওয়ার সুবিধা করে দিতে তার বিরুদ্ধে বন কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও আছে। এ ছাড়া আল আমিন, করিম শরীফ, মিলন পাটোয়ারী, এমনকি কুখ্যাত খোকাবাবু সবাই আত্মসমর্পণ করলেও সুযোগ বুঝে তারা আবার বনাঞ্চলে প্রবেশ করেছে। এদের অনেকেই কোস্ট গার্ডের হাতে অস্ত্রসহ ধরা পড়ার পর জামিনে বেরিয়ে ফের দস্যুতায় ফিরেছে। এমনকি আসাবুর বাহিনীর প্রধান আসাবুর সানা গ্রেপ্তার হওয়ার সময় প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন ডাকাতি করব।’ জেলেদের মতে, তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছেনও। জামিনে বের হয়েই আবার নেমেছেন দস্যুতায়।

খুলনার পুলিশ সুপার টিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। গোয়েন্দা তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে।’ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক জানান, ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবনে দস্যুরা আবারও সক্রিয় হয়েছে। বনকে আবারও দস্যুমুক্ত করা হবে।’ 

প্রয়োজন টেকসই পুনর্বাসন

বিশেষজ্ঞদের মতে, দস্যুতা দমন করতে হলে শুধুমাত্র আত্মসমর্পণ নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক নজরদারিই হতে পারে মূল সমাধান। এ বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ড. মাহফুজুল হক বলেন, ‘দস্যুতার মূল কারণ দারিদ্র্য ও সুযোগের অভাব। অস্ত্র জমা দিলেই অপরাধ শেষ হয় না। দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান ছাড়া কেউ অপরাধ ছেড়ে থাকতে পারবে না।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা