× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ছয় সন্ত্রাসী গ্রুপের দখলে খুলনা

মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৮:৩৬ এএম

প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত

প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত

খুলনা নগরীতে মাদক, চাঁদাবাজি, আধিপত্য ও অস্ত্র ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গত দেড় বছরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী তৎপরতা ভয়ংকর মাত্রায় পৌঁছেছে। অভ্যুত্থানের পর খুনের ঘটনা ঘটেছে ৪৮টি। 

গত নভেম্বরেই সন্ত্রাসীদের হাতে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৭টি। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে খুলনা। দিন-দুপুরে আদালত এলাকায় হত্যাকাণ্ড মানুষকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় শিথিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ছয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপ। গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন থানা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে-গ্রেনেড বাবু বাহিনী, হুমা গ্রুপ, আশিক বাহিনী, পলাশ বাহিনী, নুর আজিম গ্রুপ এবং আরমান বাহিনী। প্রতিটি গ্রুপের রয়েছে শতাধিক সদস্য ও বিপুলসংখ্যক দেশীয়-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র।

মাদক ব্যবসায় প্রতি মাসে প্রায় ৭০-১০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়, যার অর্ধেক বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে কুগ্রেনেড বাবু। 

গত রবিবার দুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে খুলনা দায়রা জজ আদালত চত্বরে ঘটেছে বছরের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ড। ১২টার দিকে একটি অস্ত্র মামলায় হাজিরা শেষে আদালত ভবন থেকে বের হন দুই যুবক-ফজলে রাব্বি রাজন (৩৮) ও হাসিব (৪৫)। বের হতেই তাদের ওপর হামলে পড়ে মোটরসাইকেলযোগে আসা ১০-১২ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, প্রথমেই খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করে রাজনকে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। এরপর হাসিবকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এখানেই শেষ নয়, চাপাতি ও দা দিয়ে কুপিয়ে দুজনের মৃত্যু নিশ্চিত করে সন্ত্রাসীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। নিহতরা পলাশ বাহিনীর সহযোগী ছিলেন বলে জানায় পুলিশ। তাদের নামে অস্ত্র ও মাদকসহ একাধিক মামলা ছিল বলে নিশ্চিত করেন খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম। পলাশ ও গ্রেনেড বাবু গ্রুপের দ্বন্দ্বের জের ধরেই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে ধারণা।

এদিকে একই দিন রাত ৯টার দিকে লবণচড়া থানাধীন জিন্নাপাড়া মোড়ে গুলিবিদ্ধ হন যুবক সম্রাট (২৫)। তিনি খুলনা শিপইয়ার্ডে পিয়ন হিসেবে কর্মরত। এলাকাবাসীর বরাতে জানা যায়, রাতে চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় তিন-চারজন মুখোশধারী সন্ত্রাসী মোটরসাইকেলে এসে সম্রাটকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। প্রথম গুলিটি তিনি হাত দিয়ে ঠেকাতে গেলে তার কব্জিতে লাগে। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন। হামলাকারীরা কারা এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশের তথ্যমতে গত ১২ মাসে খুলনায় হত্যার ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ৪৮টি। এর মধ্যে গুলি করে হত্যা ২৪, কুপিয়ে হত্যা ১৮, গুম/অপহরণের পর খুন ৬। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অপরাধগুলোর ৮০%-এর সঙ্গে জড়িত মাদক সাপ্লাই রুট ও টাকা ভাগাভাগি। ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল ও কোকেন নদীপথে প্রবেশ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ রাজধানীতে সরবরাহ করা হয়। বন্দরসংলগ্ন তিনটি প্রধান রুট নিয়ন্ত্রণ করে গ্রেনেড বাবু ও তার সহযোগীরা। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) ত ম রোকনুজ্জামান জানান, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে খুন হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশ প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা।

গত এক বছরে খুলনায় ৩০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। তবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের বড় অংশই নকল বা অকেজো, যা অপরাধীরা ভিন্ন উদ্দেশ্যে রাখে। প্রকৃত কার্যকর অস্ত্র সীমান্ত দিয়ে ঢুকে যায় ভারতীয় চোরাচালান রুটে। অতিরিক্ত কমিশনার রাশিদুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ অস্ত্র মেড ইন ইন্ডিয়া। এগুলো মাদক সিন্ডিকেট ও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় খুলনার মাদকব্যবসা নতুন নয়। অতীতে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা, ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতার নাম গোয়েন্দা তালিকায় উঠে এসেছে। অভ্যুত্থানের পর গডফাদাররা এলাকা ছেড়ে পালালেও নিচের সারির কারবারিরা সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। গোয়েন্দাদের মতে, খুলনায় এখন ১২ জন পৃষ্ঠপোষক সক্রিয়, যারা ৩৫ জন পাইকারি বিক্রেতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তালিকা থাকলেও কাউকেই গ্রেপ্তার করা যায়নি।

র‌্যাব-৬ অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্টার আহমেদ বলেন, হত্যাকাণ্ড বেড়েছে, সেটা মানছি। তবে আমরা গডফাদারদের টার্গেট করছি। ইতোমধ্যে একাধিক গ্রুপের ৩০-৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বড় নেতৃত্বকে ধরলেই অপরাধ কমবে। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক আহসানুর রহমান জানান, খুলনায় মাদকের গডফাদার আগে ছিল ৯ জন। নতুন তিনজন যুক্ত হওয়ায় সংখ্যা এখন ১২। এদের অধীনে ৩৫ জন পাইকার ও ১০০০-এরও বেশি খুচরা বিক্রেতা রয়েছে। এদের অধিকাংশই রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী ফলে সরাসরি গ্রেপ্তার কঠিন। গত ১০ মাসে অধিদপ্তরের ১,৬১৭ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৮০ জন। ৩৭১টি মামলা হয়েছে। অভিযানে ১০,৬৮৯ ইয়াবা উদ্ধার ও ৬৫ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়েছে।

অভিযান বেশি হলেও মূল অপারেটররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় অপরাধ থামছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ঘন ঘন হত্যাকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, আগে রাত ১২টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকত। এখন ৮টার পর সবাই চলে যায়। বড় শিল্প এলাকা হওয়ায় খুলনার নিরাপত্তা ভেঙে পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতিÑ এ মন্তব্য খুলনা চেম্বার অব কমার্সের এক নেতার। তিনি বলেন, শিল্প মালিকেরা নিরাপত্তা না পেলে ব্যবসা স্থানান্তর হবে। পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে। নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাড. বাবুল হাওলাদার বলেন, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অপরাধপ্রবণ স্পটগুলোতে নজরদারি বাড়ানো এবং সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটগুলোর মূল অর্থায়নকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। 

অভিযোগ, গ্রেপ্তার, অভিযান সবই আছে। তারপেরও সন্ত্রাসীরা নিয়ন্ত্রণহীন। খুলনার মাদক সন্ত্রাসের এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বাধীনতা, সীমান্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। সেটা না হলে খুলনায় রক্তের হোলিখেলা থামবে না। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা