নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:১৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
মোবাইল ফোন চুরি, ছিনতাই বা হারানোর ঘটনা হরহামেশাই ঘটেছে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৯ হাজার মোবাইল ফোন চুরি বা ছিনতাই হয়। চুরি বা ছিনতাই হওয়া এসব ফোনের সামান্য অংশই উদ্ধার হয়। বাকি অংশের হদিস মেলে না। পুলিশ বলছে, হারিয়ে যাওয়া এসব ফোনের বড় অংশই পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে। এজন্য গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটও। যাদের মাধ্যমে চোরাই মোবাইল ফোনগুলো পাচার হচ্ছে ভারত, মালয়েশিয়া, নেপাল, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপে। আবার ওইসব দেশ থেকেও আসছে চোরাই ফোন। চোরাই হয়ে আসা ওইসব ফোনেই বাড়ছে অপরাধের ঘটনা। হুমকি, ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণা ও চাঁদাবাজিসহ বড় ধরনের অপরাধের ঘটনায় চোরাই ফোন ব্যবহার হওয়ায় অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, ছিনতাই, চুরি বা হারানো মোবাইল ফোনের ৩০ শতাংশই পুলিশ উদ্ধার করতে পারে, বাকি ৭০ শতাংশই চলে যায় পাচার হয়ে। আর আইফোনের ক্ষেত্রে মাত্র ১০ শতাংশ উদ্ধারযোগ্য। এসব চোরাই মোবাইল ঘিরে সীমান্তে হচ্ছে কোটি টাকার বাণিজ্য। যাতে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। সঙ্গে হুমকির মুখে পড়ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা, ব্যাংকিং নিরাপত্তা ও সাইবার প্রতিরক্ষা।
সম্প্রতি বন্দরনগরী চট্টগ্রামের নন্দনকানন হরিশ দত্ত লেনে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হয় ৩৪২টি চোরাই মোবাইল ও ছয়টি ল্যাপটপ। এ সময় পুলিশের হতে গ্রেপ্তার হয় তানভীর হাসনাইন, সোহেল উদ্দিন, রুবেল ওরফে চাকমা রুবেল, মোহাম্মদ হোসাইন ও আবদুল্লাহ আল মামুন।
ডিবির উপকমিশনার মাহবুব আলম খান বলেন, ‘গ্রেপ্তাররা স্বীকার করেছে চোরাই ফোনের আইএমইআই মাত্র ৩-৫ সেকেন্ডেই বদলে ফেলা হয়, এরপর নতুনভাবে রি-প্যাকেজিং করে পাঠানো হয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।’
তিনি বলেন, ‘এই ফোনগুলো রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পরবর্তীতে চলে যায় ভারত, মিয়ানমার ও নেপালে। চক্রটির মধ্যে রুবেল পেশাদার ছিনতাইকারী, তানভীর আইএমইআই পরিবর্তনকারী টেকনিশিয়ান, হোসাইন-মামুন সংগ্রাহক ও সোহেল অর্থের জোগানদাতা।’
পুলিশের একটি সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানায়, ‘বাংলাদেশ ও ভারত দুদিক থেকেই মোবাইল পাচার হয়।’ সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চোরাই মোবাইল ফোন শুধু বাংলাদেশ থেকেই যাচ্ছে না, ভারত থেকেও নিয়মিত আসছে। কারণ চোরাই ফোনে ভালো দাম পাওয়া যায়, সীমান্তপথে ঝুঁকি কম এবং দেশ পরিবর্তনে আইএমইআই ট্র্যাকিংও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। গোয়েন্দারা বলছেন, একেকজন পাচারকারী সারা দেশ থেকে সংগ্রহ করে সপ্তাহে অন্তত ২০০-৩০০ ফোন পাচার করে। ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-মিয়ানমার-মালায়েশিয়া ও মালদ্বীপে এই চক্রের রয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। চোরাই ফোনের ছবি ওই গ্রুপে আপলোড করা হয়, আর যে দেশে যে মডেলের চাহিদা বেশিÑ তা সঙ্গে সঙ্গে সে দেশে পাঠানো হয়।
বিজিবির একটি সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর এখন চোরাই ফোন পাচারের অন্যতম পথ। গত তিন বছরে এই সীমান্তে জব্দ হয় ৩ হাজার ৩২৪টি ভারতীয় চোরাই মোবাইল। আটক হয় ২৯১ জন চোরাকারবারি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার শিবগঞ্জ, কানসাট, রানীহাটি অঞ্চলে বক্সবিহীন, পুরনো, ব্যাটারি বদলানো বিপুল পরিমাণ ফোন প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে।
কলকাতা থেকে হারানো একটি আইফোনকে কেন্দ্র করেই চোরাই মোবাইল পাচারের সিন্ডিকেটের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। গত বছর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় দীপান্বিতা সরকার নামে একজনের আইফোন ১৪ প্লাস মোবাইল হারিয়ে যায়। অন্য একটি ফোনে আসা ই-মেইলের মাধ্যমে দীপান্বিতা জানতে পারেন, তার মোবাইলটি সচল রয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। তিনি যোগাযোগ করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে। এরপর সেই মোবাইল উদ্ধারে অভিযানে নামে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযানের বিষয় আঁচ করতে পেরে সিন্ডিকেটের হোতা মোবাইলটি পুলিশের কাছে পৌঁছে দিয়ে পালিয়ে যান। পরে মোবাইলটি ফিরিয়ে দেওয়া হয় কলকাতার ওই বাসিন্দাকে।
ওই ফোনের সূত্র ধরেই সিএমপির গোয়েন্দা পুলিশ শনাক্ত করেন চোরাই মোবাইল পাচারকারী একটি চক্রকে; যারা ভারত থেকে চোরাই ফোন এনে চট্টগ্রামের রেয়াজউদ্দিন বাজার ও জলসা মার্কেটে সরবরাহ করত।
বিটিআরসি জানায়, দেশে ২৫০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগে ১৭টিরও বেশি মোবাইল কারখানা চলছে। তবুও ৬০% বাজার এখন অবৈধ হ্যান্ডসেটের দখলে। এতে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ছে বৈধ কোম্পানিগুলো। সরকারও বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। অপরাধী শনাক্ত কঠিন হচ্ছে।
বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবু বকর সিদ্দিক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর থেকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালু হচ্ছে। এটি চালুর পর থেকে নিবন্ধনহীন অবৈধ ফোন আর চলবেই না।’ তবে আগেরগুলো সচল থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরপর থেকে চোরাই ফোন ট্র্যাকিং সহজ হবে, সিন্ডিকেট দুর্বল হবে, সরকারেরও রাজস্ব বাড়বে।’
তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ বলছে, ফোন একবার বন্ধ হলে ‘অদৃশ্য’ হয়ে যায়। যে কারণে ট্র্যাক করা কঠিন। ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ফোন চুরি হলে সাধারণত আমরা জিডি কিংবা অভিযোগের ভিত্তিতে ট্র্যাক করি। কিন্তু ফোনটি বন্ধ হয়ে গেলে বোঝা কঠিন, এটা দেশে আছে নাকি দেশের বাইরে চলে গেছে। আইফোনগুলো বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে পাচার হওয়ার পর আর ট্র্যাক করা যায় না।’
তবে পুলিশের একটি সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানায়, আখাউড়া ও বিজয়নগর সীমান্ত দিয়ে সাম্প্রতিককালে বেশি ফোন পাচার হচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী সীমান্তও এখন চোরাই ফোন পাচারের অন্যতম রুট।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, চক্রটি চুরির পরই সিম খুলে নেয়। শুধু ওয়াইফাই ব্যবহার করে অনলাইনে যোগাযোগ করে। যে কারণে কোনোভাবেই প্রাথমিক ট্র্যাকিংয়ে অবস্থান জানা যায় না। এসব ফোন দিয়েই চাঁদাবাজি, হুমকি, আর্থিক জালিয়াতি ও সাইবার অপরাধ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অপরাধ রোধে আইএমইআই ট্র্যাকিং কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। চোরাই মোবাইল শুধু চুরিই নয়, এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধও ঘটছে। আর সেই নেটওয়ার্কের ছায়ায় ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে দেশ।