রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:০৮ পিএম
প্রবা ফটো
জরাজীর্ণ চারতলা ভবনে ঢুকতেই চোখে পড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভেঙে পড়া পলেস্তারা। দেয়ালজুড়ে শ্যাওলার দাগ, ফিকে হয়ে আসা দেয়ালের রঙ। শৌচাগারের ভাঙা দরজা, বেসিনের কালচে পুরু দাগ। মেঝেতে পুরনো আমলের মোজাইক, যত্নের অভাব সবখানে। চারতলা ভবনটিতে নেই গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য কোনো নির্ধারিত স্থান।
ক্ষয়িষ্ণু এই ভবনটিই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ৫০ নং ওয়ার্ডের চন্দনকোঠা কমিউনিটি সেন্টার। ডিএসসিসি মালিকানাধীন যাত্রাবাড়ীর সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রÑ চন্দনকোঠা একসময় ছিল বিয়ে, মিলাদ, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও স্থানীয় সমাবেশের জনপ্রিয় ঠিকানা। কিন্তু অযত্ন, অবহেলায় এখন কেন্দ্রটি প্রায় পরিত্যক্ত স্থাপনা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সংস্কার-মেরামতের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে ভবনটি কার্যত আর ব্যবহারযোগ্য নয়। কাগজে এটি ‘সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র’ হলেও বাস্তবে এর কাঠামো জীর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। পুরনো, অনাকর্ষণীয় পরিবেশের কারণে কর অঞ্চল-৫ এর এই ভবনটি আর নগরবাসীকে টানতে পারছে না।
কেন্দ্রটির তত্ত্বাবধায়ক রফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে কমিউনিটি সেন্টারটির সংস্কার প্রয়োজন। ভবনটি ব্যবহার উপযোগী নেই। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, পার্কিং নেই, চারদিকে বেহাল পরিবেশ। এখানে অনুষ্ঠান করার চেয়ে সবাই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বেসরকারি ভেন্যুর দিকে যাচ্ছেন।’
চন্দনকোঠা খুব পুরনো কমিউনিটি সেন্টার উল্লেখ করে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর স্থানীয় বাসিন্দা রিমা আক্তার বলেন, ‘আগে মাসে দুয়েকটা অনুষ্ঠান হতো, এখন আর দেখি না। ভেতরের অবস্থা খারাপ, টয়লেট ব্যবহারই করা যায় না। আমরা চাই, এটা আধুনিকভাবে সংস্কার করা হোক।’
শুধু চন্দনকোঠাই নয়, ডিএসসিসির আরও কয়েকটি সামাজিক কেন্দ্র ঘুরেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।
পল্টন সামাজিক কেন্দ্র
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র নয়াপল্টনে অবস্থিত কেন্দ্রটির চিত্র আরও ভয়াবহ। দরজা-জানালায় কাচ নেই, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, পুরো ভবনটিই যেন এক পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ০.০৮ একর জায়গায় নির্মিত এই কেন্দ্রটি বহুদিন ধরেই ব্যবহার অযোগ্য।
গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময়ে ভবনটিতে আগুন দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তনের দেড় বছর পরও সেই আগুনে পোড়া ক্ষত নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি। তবে ভবনটিতে একটি মার্কেট আর এর নিচতলায় রয়েছে নয়াপল্টন ইউনিট যুবদলের রাজনৈতিক কার্যালয়। সব মিলিয়ে ভবনটি এখন ব্যবহারের অযোগ্য।
ধলপুর সামাজিক কেন্দ্র
২০০১ সালে ০.৭১৪৪ একর জমিতে নির্মিত ধলপুর সামাজিক কেন্দ্রটিও ঝুঁকিপূর্ণ। ডিএসসিসির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত সামাজিক কেন্দ্রটি দুই দশক না যেতেই ভবনের ছাদ ও দেয়ালের বড় অংশ বৃষ্টির পানিতে ক্ষয়ে গেছে। বহু স্থানে দেখা দিয়েছে ফটিল। ইট-রঙ-প্লাস্টার ক্ষয়ে যাচ্ছে, ভেঙে পড়ার দশা। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো কোনোটিই সময়ের সঙ্গে মানানসই নয়। ফলে এলাকাবাসী সরকারি কেন্দ্র থেকে মুখ ফিরিয়ে ঝুঁকছে বেসরকারি ভেন্যুর দিকে।
উত্তর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা পাবেল হাসান চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারি ভেন্যুর ভাড়া কম হলেও এখানের যে অবস্থা তাতে অতিথি নিয়ে ঢোকাই লজ্জার। তাই বাধ্য হয়েই সবাই বেসরকারি হলে ২৫-৩০ হাজার টাকা দিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করছে। এ সময়ে এমন সেকেলে নকশার সেন্টার চলে না।’
মুরাদ সামাজিক কেন্দ্র
৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাটখোলা রোডের মুরাদ সামাজিক কেন্দ্রটি একসময় এলাকার প্রাণকেন্দ্র ছিল। পরে ভবনটি র্যাব-৩-এর ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত বছর এপ্রিল মাসে র্যাব তাদের অফিস অন্যত্র সরিয়ে নেয়। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় ভবনটি প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। প্লাস্টার খসে পড়েছে, দেয়ালের রঙ উধাও, দরজা-জানালা নষ্ট, টাইলস ভাঙাচোরা। কাঠামো টিকে থাকলেও সামাজিক আয়োজনে ব্যবহারের উপযোগিতা নেই। র্যাবের অফিস সরিয়ে নেওয়া হলেও ডিএসসিসি ভবনটির সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
৩৬ কেন্দ্রের ২২টিই পুরনো নকশায়
ডিএসসিসির মালিকানাধীন ৩৬টি সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের মধ্যে ২২টি পুরনো নকশায় নির্মিত। এর বেশিরভাগই বছরের পর বছর সংস্কারহীন, জীর্ণ ও সুবিধাহীন অবস্থায় রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে অবকাঠামোর দুর্দশা, ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা না থাকা এবং ব্যবস্থাপনার অবহেলায় এসব কেন্দ্র কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে নগরবাসী অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ঝুঁকছেন বেসরকারি হলেÑ যেখানে এসি, লিফট, জেনারেটর, আলোকসজ্জা, ক্যাটারিং ও পার্কিংয়ের মতো আধুনিক সুবিধা রয়েছে। এদিকে সরকারি কেন্দ্রে সেবা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিএসসিসির আয়ও কমছে। বিষয়টি স্বীকার করেছেন করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা।
মডেল তৈরির পরামর্শ মন্ত্রণালয়ের
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ ছয়টি কমিউনিটি সেন্টার সংস্কারের জন্য একটি ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছেÑ প্রাথমিকভাবে সিটি করপোরেশন নিজস্ব অর্থায়নে দুই-একটি কেন্দ্র সংস্কার করে একটি মডেল তৈরি করুক; এরপর বিবেচনায় আনা হবে।
এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ছয়টি কেন্দ্রের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়ে আমরা ডিপিপি পাঠিয়েছিলাম। মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ অনুযায়ী অগ্রাধিকার ঠিক করে ধাপে ধাপে সেন্টারগুলো সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা হবে।’