ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ঢাকা ও মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১২:১৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
নিস্তব্ধ সুন্দরবনের গাছপালার ফাঁকে গভীর রাতে হঠাৎ শোনা যায় ‘ধপ’ শব্দ। তার কিছু সময়ের মধ্যেই দিগ্বিদিক ছুটে পালায় কয়েকটি হরিণ। আর শব্দের উৎসে পড়ে থাকে একটি হরিণের নিথর দেহ। অন্ধকারে ফাঁদের তার টানছে কয়েকজন মানুষ। তাদের হাতে ধারালো ছুরি, চোখে তীব্র লোভ। দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে শিকারি চক্র।
এই ভয়াবহ বাস্তবতা এখন সুন্দরবনের প্রায় নিয়মিত দৃশ্য। হরিণ শিকারি চক্রের দৌরাত্ম্যে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের অন্যান্য বন্য প্রাণীও আজ নিরাপদ নয়। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিনই বনের ভেতর চলছে অবাধে হরিণ শিকার। অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গড়ে উঠেছে একাধিক হরিণ শিকার ও পাচারকারী চক্র। তারা বনের ভেতরে শুধু শিকারই করছে না, বরং সেই মাংস লোকালয়ে এনে প্রকাশ্যে বিক্রিও করছে। এমনকি চালু করেছে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও। গরু ও খাসির মাংসের তুলনায় অভিজাত মনে করায় স্থানীয় মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারে এই বন্য প্রাণীর মাংসের চাহিদা বেড়েছে। যে কারণে সুন্দরবনে হরিণ শিকার বন্ধ হচ্ছে না।
গত ছয় মাসে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের সদস্যরা সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকা থেকে ৬০০ কেজি হরিণের মাংস, আটটি চামড়া ও ২০০টি শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করেছেন। আটক হয়েছে ২০ জন শিকারি। শুধু গত দুই মাসেই পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ তিন হাজার ফুট ফাঁদ জব্দ ও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। যার মাধ্যমে উঠে এসেছে সুন্দরবনের হরিণ শিকারের উদ্বেগজনক চিত্র।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনই বনে অসংখ্য হরিণ মারা পড়ছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশের খবরই প্রকাশ পায় না। পাচারকারীরা ছোট নৌকা বা মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে নদীপথে মাংস পাচার করে। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে মাংসকে মাছের চালান হিসেবেও দেখানো হয়। তারা অভিযোগ করে বলেন, বনের ভেতরে শিকারিদের উপস্থিতি এখন এতটাই স্বাভাবিক যে, বনকর্মীরাও অনেক সময় তাদের দেখে চুপ করে থাকেন। এটা হয়তো ভয়ে অথবা স্বার্থের বিনিময়ে।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলে-বাওয়ালিরা বলেন, বন বিভাগের টহল থাকলেও হরিণ শিকার বন্ধ হয়নি। হয়তো শিকারি চক্র বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে। তবে কখনও কখনও বন বিভাগের টহল ফাঁকি দিয়ে ফাঁদ পেতে যে হরিণ শিকার করা হয় না, এমনও নয়।
জানা যায়, বনের পাশে যাদের বাড়ি, হরিণ শিকারের সঙ্গে তারাই সবচেয়ে বেশি যুক্ত। একটি পরিসংখ্যান বলছে, খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা উপজেলা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলার মানুষ বেশি হরিণ শিকার করে।
খুলনার সুন্দরবনঘেঁষা কয়রা উপজেলাটি ঘিরে রেখেছে কপোতাক্ষ, কয়রা ও শাকবাড়িয়া নদী। উপজেলাটির তিন দিক নদীবেষ্টিত এবং সাতটি ইউনিয়নই সুন্দরবনের সীমানায় অবস্থিত। এ উপজেলার গ্রামগুলোর প্রতিটি পরিবারের কেউ-না কেউ সুন্দরবনকেন্দ্রিক কাজে সম্পৃক্ত। জানা যায়, এ উপজেলার ৩০টির বেশি চোরাশিকারি চক্র নির্বিচারে হরিণ নিধন করছে। হরিণ পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বজবজা ও খাসিটানা বন টহল ফাঁড়ি এলাকা।
কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুল সরদার বলেন, ‘একটি ছোট নদী পেরোলেই সুন্দরবনের গহিন জঙ্গল। পেশাদার হরিণ শিকারিরা গোপনে সুন্দরবনে ঢুকে নাইলন দড়ির ফাঁদ পেতে রাখে। চলাচলের সময় হরিণ সে ফাঁদে আটকে যায়। তারপর বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে হরিণের মাংস বিক্রি করা হয়।’
সুন্দরবন-সংলগ্ন খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান গ্রামের বাসিন্দা ইশারত আলী বলেন, ‘ঢাংমারী, খাজুরা, বানিশান্তা, সুতারখালী ও কালাবগি গ্রামের চিহ্নিত শিকারিরা নিয়মিত হরিণ শিকার করে। নদীর জোয়ারে রাত ও দিনে ২০-২৫ জন দলবদ্ধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করে হরিণ শিকার করে। এছাড়া মোংলা, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বেশকিছু গ্রামে হরিণ শিকারিদের তৎপরতা রয়েছে।’
সুন্দরবনে হরিণ শিকারিদের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, ‘মূলত শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবনের ভেতর খাল ও নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় হরিণের বিচরণক্ষেত্র বাড়ে। ফলে এ সময় চোরাশিকারিরা তৎপর হয়।’
সুন্দরবনে মাছ ধরার অনুমতি নিয়ে যাওয়া অনেক জেলে এবং মৌয়ালও সুযোগ পেলেই হরিণ শিকার করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়রার বেদকাশী এলাকার এক শিকারি বলেন, ‘শিকারিরা পাঁচ-ছয়জনের দলে কাজ করে। একদল বনের ভেতর হরিণ শিকার করে, আরেক দল মাংস বাজারে পৌঁছে দেয়। কিছু প্রভাবশালী লোক আমাদের কাছ থেকে ফ্রি মাংস নেন, বিনিময়ে তারা নিশ্চিত করেন যেন আমাদের কেউ কিছু না বলে।’
হরিণের মাংসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা স্থানীয় মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার। প্রতি কেজি মাংস বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। আর খুলনা বা বাগেরহাটে পৌঁছে দিলে দাম হয় ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। একসঙ্গে চার-পাঁচ কেজি না নিলে তারা বিক্রি করেন না। তবে দূরত্ব অনুযায়ী দাম বাড়ে। ব্যবসাটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও লাভ বেশি।