সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২০ এএম
আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৩২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে বাংলাদেশ পুলিশের ফর্মড পুলিশ ইউনিট (এফপিইউ) প্রত্যাহারকে আমাদের শান্তিরক্ষীদের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যয় সংকুলানের কারণে মিশনে অন্যান্য দেশের কন্টিনজেন্ট থাকলেও কেবল বাংলাদেশ পুলিশের পুরো কন্টিনজেন্ট প্রত্যাহারে পুলিশ বাহিনীর মনোবলে প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘ ২ দশক ধরে কঙ্গোতে শান্তিরক্ষী হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ অবদান রাখলেও আকস্মিক পুরো এফপিইউ প্রত্যাহার হলো এই প্রথমবারের মতো।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে কন্টিনজেন্ট গেলেও এরপর বড় কোনো কন্টিনজেন্ট যায়নি। সর্বশেষ এফপিইউ কন্টিনজেন্ট চলতি বছরের আগস্টে কঙ্গো মিশনে যায়। সংখ্যা ১৮০ জন। এর মধ্যে ৭০ জন নারী। যোগদানের ২ মাসের মাথায় ১৮ জন বাদে পুরো কন্টিনজেনকে দেশে ফিরে আসতে হয় অক্টোবরেই। বাকি ১৮ জন ফেরত আসে নভেম্বরে।
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের এফপিইউ শান্তিরক্ষী হিসেবে কোনো দেশে নেই। তবে সশস্ত্র পুলিশ হিসেবে (আইপিও) মনোস্কোতে ১ জন এবং আনমিসে ২৫ জন, আইপিও মনোস্কোতে ৫ জন নিয়োজিত রয়েছেন। সব মিলিয়ে শান্তিরক্ষী হিসেবে ৫২ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তবে এফপিইউর ১৮ জনের একটি দল মনোস্কাতে রয়েছে।
প্রকাশ জাতিসংঘোর শান্তিরক্ষী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে এফপিইউ ২০০৫ সাল থেকে এবং নারী কন্টিনজেন্ট ২০১১ থেকে পেশাদারত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছে। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান) বাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশ কঙ্গোতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। শান্তিরক্ষী মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সহযোগিতা কমানোর নীতির কারণে জাতিসংঘ ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কঙ্গোতে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের পুলিশের এফপিইউ সমান সংখ্যক হারে কমানোর কথা থাকলেও সেটি হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে শক্তিশালী যোগাযোগ না থাকায় এই বিপর্যয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সময়ে শান্তিরক্ষী নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি অপারেশন্স রেজাউল করিম জানান, জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বড় অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর তহবিল কমিয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য দেশের শান্তিরক্ষীও প্রত্যাহার করা হয়েছে। এটি জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত। এখানে অন্য কোনো কারণ নেই।
পুলিশের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, জাতিসংঘ তাদের বাজেট কমানোর লক্ষ্যে কঙ্গো, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং সুদানের সদস্য সংখ্যা কমিয়েছে। এসব দেশে বাংলাদেশ ছাড়াও ক্যামেরুন, সেনেগাল, মিসর, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের পুলিশ শান্তিরক্ষী হিসেবে মোতায়েন ছিল। এর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ পুলিশের পুরো কন্টিনজেন্ট প্রত্যাহার করা হয়।
২০২৫ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের ২১ হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা বিশ্বজুড়ে ২৪টি দেশে ২৬টি মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি পদপর্যাদার একজন নারী কর্মকর্তাসহ ২৪ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। ৩৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারত্ব ও দক্ষতার সাথে মিশন শেষ করেছে। শান্তি মিশনে পুলিশের এত বড় অর্জন কেবল বাংলাদেশ পুলিশেরই রয়েছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করা পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে। অন্যান্য দেশ শান্তিরক্ষা মিশনে শান্তিরক্ষী বাড়ানোর বিষয়ে নিয়মিত লবিং করে। কিন্তু বাংলাদেশের এ ধরনের লবিং নেই বললেই চলে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে মিশনে কন্টিনজেন্টের সদস্য হিসেবে বাবুর্চি, নাপিত, রাঁধুনি হিসেবে অভিজ্ঞদের না পাঠিয়ে ব্যাপক অর্থ ঘুষ নিয়ে অনভিজ্ঞদের মনোনীত করেছিল। ওই সময় মিশনে আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী, এমপি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বা শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মীয়-স্বজনদের পাঠানো হতো। এ অনিয়ম নিয়ে নাখোশ হয় জাতিসংঘের ইউএন ডেস্ক। এর ফলে ২০২০ থেকে জাতিসংঘ সরাসরি তাদের নিজেদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ থেকে পুলিশ মিশনে শান্তরক্ষী হিসেবে অংশ নিতে আগ্রহীদের পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা শুরু করে।
ওই মিশন থেকে ফেরত আসা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তিনি প্রথমবারের মতো শান্তিরক্ষী হিসেবে মিশনে গেছেন। আশা ছিল ১ বছর মিশন সফলভাবে শেষ করে জাতিসংঘ থেকে যে টাকা পাবেন, সেটি তার সারা জীবনের একটি বড় সঞ্চয় হবে। কিন্তু ১ মাসের মাথায় তিনিসহ অন্যদের ফেরত আসতে হয়েছে। এরপর আর কোনো মিশনে শান্তিরক্ষী হিসেবে যেতে পারবেন কি না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
যুক্তরাষ্ট্র গত ৩০ সেপ্টেম্বর নিশ্চিত করে তারা তহবিল কমিয়ে দেবে। তবে অন্যান্য দেশের কোনো কন্টিনজেন্ট প্রত্যাহার হয়েছে কি নাÑ বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছিল। বিশেষ করে কন্টিনজেন্টে নাপিত, রাঁধুনি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যাদের পাঠানো হতো, তাদের অধিকাংশ অনভিজ্ঞ। মিশনের নিয়ম অনুযায়ী নাপিত, রাঁধুনি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে সংশ্লিষ্ট কাজের ওপর দক্ষতা রয়েছেÑ এমন ব্যক্তিদের পাঠানোর নিয়ম। তাদের বেতন জাতিসংঘ থেকে দেওয়া হতো। অনেক বেশি বেতন হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারে মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের ওইসব কোঠায় পাঠানো হতো। বিষয়টি ধরা পড়ার পর ২০২০ সালে জাতিসংঘ পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, কঙ্গো থেকে পুরো কন্টিনজেন্ট ফেরত পাঠানো হয়েছে, তাতে আগের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতিসংঘে শক্ত লবিং করতে পারেনি।
পুলিশ সদস্যরা জানান, মিশন সাধারণত দুই ধরনের হয়। একটি ফর্মড পুলিশ ইউনিট বা এফপিইউ আরেকটি ইনভিজ্যুয়াল পুলিশ ইউনিট (আইপিইউ)। আইপিইউতে শান্তিরক্ষী হিসেবে বাংলাদেশের পুলিশ একসময় বেশি ছিল। এখানে যারা যান, তারা পরীক্ষার মাধ্যমে মনোনীত হন। এখানে ভাতা অনেক বেশি।
পুলিশের সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কঙ্গো ছাড়াও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং দক্ষিণ সুদানের বিভিন্ন মিশনে ধাপে ধাপে সদস্য সংখ্যা কমানো ও প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা উল্লেখ করা রয়েছে। এসব অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং সিভিলিয়ানও রয়েছে। কঙ্গো থেকে ক্যামেরুন, সেনেগাল ও মিসরের মতো দেশের এফপিইউ কন্টিনজেন্ট আংশিকভাবে হ্রাস করা হয়েছে। কেবল বাংলাদেশ পুলিশের পুরো কন্টিনজেন্ট ফেরত আসা লজ্জাজনক। সরকারের সক্রিয় উদ্যোগের অভাবে আমাদের পুলিশ এখন পুরোপুরি কোণঠাসা অবস্থায়। সরকারকে এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।