× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রাণিপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর মেলাপ্রাঙ্গণ

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০৪ পিএম

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩১ পিএম

প্রবা ফটো

প্রবা ফটো

রাজধানীর আগারগাঁওস্থ পুরাতন বাণিজ্যমেলার মাঠে তিল ধারণের ঠাই ছিল না। এখানে শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) জমায়েত হয়েছিল পশু ও পাখি প্রেমিরা। শিশু-কিশোর, তরুণ, যুবক ও বৃদ্ধ বয়সী নারী-পুরুষের পদচারণায় মুখরিত ছিল মেলাপ্রাঙ্গণ। শুক্রবার সরকারি ছুটি থাকায় কোলের শিশু থেকে শুরু করে পরিবার ও সন্তান-সন্তুতি নিয়ে অনেকেই মেলায় এসেছিলেন। ২৬ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ও প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী (মেলা) উপলক্ষে গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় মেলাটির আয়োজন করেছিল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। 

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার কার্য দিবস থাকায় দর্শনার্থীদের সংখ্যা ছিল স্বল্পসংখ্যক। ছুটির দিনে সেই স্বল্পতার স্রোত ভেঙে চুরে বিপুলসংখ্যক পশু-পাখি প্রেমিদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। 

১১ মাসের কোলের শিশুকে নিয়ে মেলায় এসেছিলেন মিরপুরের সায়েদা খাতুন। তিনি শিশুটিকে বিভিন্ন জাতের গরু দেখাচ্ছিলেন। শিশুর মোলায়েম হাত দিয়ে কোন কোন গরুর মাথায় ছুঁয়েও দিচ্ছিলেন। এ ধরনের ছোঁয়া শিশুটি আরো পুলকিত করে তোলে। 

এত ছোট বাচ্চাকে নিয়ে মেলায় আসার কথা চানতে চাইলে সায়েদা খাতুন বলেন, বাসায় বিড়াল পালি। বাচ্চাটা বিভালের সঙ্গে ভালো ভাব। তাই প্রাণিসম্পদ মেলায় নিয়ে এসেছি। প্রথম প্রথম গরুর গায়ে হাত দিতে কিছুটা ভয় পেলেও এখন আর ভয় পাচ্ছে না। বাচ্চাও অনেক খুশি হচ্ছে। তবে সমস্যা হলো মানুষের সমাগম বেশি হওয়ায় প্রচুর ধুলাবালি উড়ছে। এতে হয়তো বাচ্চাটি কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়বে। তারপরও অনেকগুলো গরুর গায়ে হাত দিয়ে ছুঁয়েছে। আমার মেলাটি ভালো লেগেছে। বাচ্চাও খুশি।  

মালয়েশিয়ান হাইকমিশনে চাকরি করেন এমদাদুল হক। তিনি সঙ্গে দুই ছেলেকে মেলায় নিয়ে এসেছিলেন। তার দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে ইমাদুল হক বলেন, মেলায় গরু দেখে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। এমদাদুল হক বলেন, বাচ্চারা মেলায় এসে পশু-পাখি দেখতে পাচ্ছে এটি আমার কাছে খুব ভালো লাগছে।

সিটি ফার্মার মো. আল আমিন বাবু বলেন, তার ষাড়ের জাতটি হচ্ছে শাহিওয়ালের সঙ্গে নেপালিয়ান গিরের সংকরায়ন। তিনি দাম চাচ্ছেন ২৫ লাখ টাকা। ডেইরি ও ক্যাটারিং মিলে ৫০টি গরু রয়েছে। 

সাভারের শ্রীপুরের খামারি মো. ফরহাদ হোসেন দুটি মুররা জাতের মহিষ ও শাহিওয়াল জাতের দুটি ষাঢ় এনেছিলেন। তিনি বলেন, মহিষগুলোর বয়স ৫ বছর ও লাইভওয়েট ১ হাজার ৮৮০ কেজি। দাম চাওয়া হচ্ছে ১৬ লাখ টাকা। তাদের খামারে ২২০টি মহিষ রয়েছে। মহিষের লালন-পালন সম্পর্কে তিনি বলেন, মহিষ সাধারণত খোলা মাঠে চরানো হলেও খামারেও ভালোভাবে পালন করা যায়। আমরা ১০-১২ বছর যাবত খামারে মহিষ পালন করছি।

ষাড় ও গাভী মিলে ৪ শতাধিক গরুর খামার রয়েছে মো. নাবিল হোসেন আদলদের। তিনি নেপালিয়ান গির প্রজাতির দুটি ষাড় এনেছিলেন মেলায়। গাজীপুরের ডিজাইন এগ্রোর আদল জানান, ৭০০ কেজির একটি ষাড়ের দাম চাচ্ছে সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা দাম চাচ্ছেন।

পাকিস্তানি রাথি জাতের দুটি ষাড় গরু এনেছিলেন রাজন বিশ্বাস। তিনি বলেন, আমরা দাম চাচ্ছি ৯ লাখ টাকা করে। তা ছাড়া দুটি মিরকাদিম জাতের গরুও তিনি নিয়ে এসেছিলেন। দু’বছর বয়সী ৭০০-৭৫০ কেজি ওজনের একেকটি ষাড়ের দাম চাচ্ছেন ৮ লাখ টাকা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ আলী ডেইরি এন্ড ক্যাটলের মোহাম্মদ ৪টি ষাড় তুলেছেন মেলায়। প্রতিটির দাম চাচ্ছেন ১৫-১৬ লাখ টাকা। কালো রঙের এসব গরু দেখতে মানুষর ভিড় জমে যায়।

এদিকে কেরানিগঞ্জের কলাতিয়ার সিরাজুল ইসলাম নেপালি গির জাতের ৬ বছর বসয়ী বড় আকারের দুটি ষাড় এনেছিলেন। এসবের দাম চাওয়া হচ্ছে ১৮ ও ২০ লাখ টাকা। তিনি বলেন, আমাদের মালিক গত বছর ১৪টি ষাড় পালন করেছিল। তারমধ্যে ৭টি কোরবানি দিয়েছে। এবছর ৭টি রয়েছে। এসব মেলায় তুললাম, দেখি কেমন দাম হয়।

মারওয়ারি প্রজাতির সাদা ধবধবে একটি ঘোড়া দাঁড়িয়েছিল পশু প্যাভিলিয়ানের পশ্চিম প্রান্তে। কেউ কেউ ঘোড়াটিকে সামনে রেখে ছবি তুলছেন। কেউবা ছুঁয়ে আদর করছেন। ঘোড়াও চোখ বুঝে সেই আদর উপভোগ করছে। বনশ্রীর ত্রিমহনী ব্রিজ এলাকার আস্তাবল নামের প্রতিষ্ঠান ঘোড়াটি মেলায় আনেন। দাম চাওয়া হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। আস্তাবলে বর্তমানে ৯টি ঘোড়া রয়েছে।

মেলায় বিভিন্ন ধরনের সেবা দিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্টলও ছিল। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর বিভিন্ন প্রাণী লালন-পালনের নির্দেশিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করেছে। সেখানে কথা হয় সিরাজগঞ্জের মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, আগামীতে ছাগলের খামার করতে চান। এজন্য লিফলেট সংগ্রহ করছেন। তিনি বলেন, অল্প জায়গা ও পুঁজিতে ছাগল পালন করা সম্ভব। কেননা রোগবালাই কম। 

সৌখিন পাখির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে

পাখি প্যাভিয়ানেও ছিল দর্শনার্থীদের বিশাল স্রোত। অনেকেই পাখির খাচার সামনে গিয়ে ছবি তুলেছেন। কেউ পাখির ঠোঁট ছুঁয়ে দেখছেন। কেউবা পাখির ঠুকর খেতে আঙ্গুল এগিয়ে দিচ্ছেন।  

অল কাইন্ড কেইজ বার্ড সাপ্লাইয়ের প্রোপাইটার মো. আল রাব্বি (জয়) বলেন, এখন মানুষের মধ্যে সৌখিন পাখি পালনের আগ্রহ বেড়েছে। আমরা বছরে ৬-৭ লাখ টাকার পাখি বিক্রি করতে পারি। বিশেষ করে শীতকালে পাখি বিক্রির হার বেশি। 

মিরপুরের পাখি বিক্রেতা আবু সাঈদ বলেন, বাজিগর পাখির জোড়া বিক্রি হচ্ছে ১৫-১৬ হাজার টাকা, মেকাও ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা জোড়া বিক্রি হচ্ছে। তা ছাড়া ফ্রিজিয়ান ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও বিক্রি হচ্ছে। 

২০২১ সাল থেকে পাখির ব্যবসা করছেনচৌধুরী এগ্রোর এডওয়ার্ড তানভীর চৌধুরী বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিক্রি করেন। তিনি বলেন, তার সংগ্রহে রয়েছে লাভবার্ড, বাজরিগার, ইংলিশ বাজরিগার। এসব পাখির ৬০০ টাকা দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ককাটিয়াল ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, বছরে তিনবার এসব পাখি বাচ্চা দেয়। তাতে বছরে ১০-১২ লাখ টাকা বিক্রি করা যায়। আর এসব পাখি দেশিয় খাবার খেয়ে থাকে। তাতে করে আলাদা কোন চিন্তায় পড়তে হয় না। তা ছাড়া পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে রোগবালাই বেশি একটা হয় না। বছরে দু-একবার ক্রিমি ও ক্যানকাল কোর্স দিতে হয়। বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন দিতে হয়।  

মেলায় পাখি দেখে সবচেয়ে ভালো লেগেছে শহিদুল হক জয়ের। তিনি বলেন, পাখিগুলো দেখে আমার সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি। 

সরকারি-বেসরকারি সেবা

কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতাল, ঢাকার (নাজিরাবাজার) ক্লিনিকেল প্যাথলজিস্ট ডা. শিশির স্বপন চাকমা বলেন, সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন পশু-পাখির সেবা দেওয়া হয়। টিকেট কিনে পশুর চিকিৎসা নেন সেবাগ্রহীতারা। এখানে বেশিরভাগ কুকুর-বিড়াল, গৃহপালিত পাখিই আনা হয়। আমরা বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করে থাকি। 

রাজধানীর গরু-ছাগলের চিকিৎসা দেওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের সাধারণত গরু বা অন্যান্য বড় ধরনের পশু আনা হয় না। তিনি বলেন, বর্তমানে পশুর রোগ ঠাণ্ডাজনিত রোগই বেশি হয়। আর গরুর বদহজম জনিত রোগ বেশি হচ্ছে। তা ছাড়া আমাদের উপজেলা ও থানা পর্যায়েও চিকিৎসরা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে। 

মেলায় কথা হয় রেডিয়ান্স অ্যানিমেল হেলথের সিইও তাসলিম খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা নিউট্রিশন জাতীয় ওষুধ সরবরাহ করে থাকি। বর্তমানে পোল্ট্রি ও ডেইরি সেক্টরের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। আমাদের ১৭টি আইটেম রয়েছে। 

তাসলিম খান বলেন, বার্ডফ্লু রোগ সাধারণত বায়ো-সিকিউরিটির কারণে হয়ে থাকে। আমাদের প্রান্তিক খামারিরা বায়ো-সিকিউরিটি মেনটেনের বিষয়ে খুব ভালো না জানার কারণে এ অবস্থা হয়ে থাকে। লিটার ম্যানেজ থাকে। এসবের গুরুত্ব দিতে হবে।

দেশীয় প্রজাতির সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে

শুক্রবার রাজধানীতে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) আয়োজিত ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকর’শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, বর্তমানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে শিল্প হিসেবে দেখা হলেও উৎপাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এখনও গ্রামীণ সাধারণ মানুষের হাতেই হচ্ছে। শিল্পায়ন প্রয়োজন, তবে দেশীয় প্রজাতির সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে সংকর জাত তৈরির সময় যেন দেশীয় জাতের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে না যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। 

গ্রামীণ খাদ্যব্যবস্থার বৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশীয় প্রাণিসম্পদ শুধু উৎপাদনশীলতার জন্য নয়, গ্রামীণ খাদ্যচাহিদা, সংরক্ষণ সুবিধা, নারী কর্মসংস্থান ও কৃষির ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা