ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০৪ পিএম
রাজধানী ঢাকার পুরাতন বাণিজ্যমেলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ-২৫ উপলক্ষে ‘তিন দিনব্যাপী প্রাণিসম্পদ মেলা’। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক-বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষের পদচারণায় মেলায় দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। কেউবা দেখছেন গরু-ছাগল। কেউবা দেখছেন পাখি। পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত মেলাপ্রাঙ্গণ। কোন প্রাণির দাম কত এ নিয়ে চলছে কথাবার্তাও। কোন ক্রেতা দরে মিললে পছন্দের প্রাণী নিয়ে ঘরে ফিরছে। তবে গরু-ছাগল, মহিষ এসব প্রাণিও দরাদরি চললেও বিক্রি কম। পছন্দ হলে পরবর্তীতে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাসে অনেকেই ঘরে ফিরছেন।
তিন দিনব্যাপী মেলাটির দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) মেলা প্রাঙ্গণে কথা হয় মিরপুরের শেওড়াপাড়া থেকে আসা নূরে আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতিবছর প্রাণিসম্পদ মেলা বসছে। এতে বিভিন্ন প্রকারের গরু, ছাগল ও নানা প্রজাতির পাখির দেখা মিলে। শহরে জীবনের জন্য মেলাটি খুবই ভালো লাগে। তবে এ বছর কিছু ঘাটতি চোখে পড়ছে। তারমধ্যে রয়েছে- গত বছর গরুর র্যাম শো ছিল। উটের পিটে উঠে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা ছিল, এ বছর সেটি করা হয়নি। এগুলো থাকলে শহুরে মানুষের জন্য আলাদা আনন্দ যুক্ত হয়।
মায়ের সঙ্গে মেলায় বেড়াতে এসেছেন রিফাত হোসেন। তৃতীয় শ্রেণির এ শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, গরুর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে। গরু দেখে কেমন লাগছে জানতে চাইলে এক রাশ হাসি দিয়ে রিফাত জানায় তার খুব ভালো লাগছে। কোরবানির সময় শুধু অল্প কিছু গরু দেখে। কিন্তু মেলায় অনেক প্রকারের গরু দেখেছে সে। এ ছাড়া মেলায় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষার্থীদেরও লক্ষ্য করা গেছে। তারা এসব প্রাণী দেখে পুলকিত।
মেলায় কথা হয় কেরানিগঞ্জের এক গাড়ল খামারির সঙ্গে। তিনি জানান, তার খামারে ৩০টি মতো গাড়ল রয়েছে। এসব গাড়ল খুবই দ্রুত বর্ধনশীল। মাংসও সুস্বাদু। তা ছাড়া সাভারের গরু খামারি ইউনুস মন্ডল দুটি সিব্বিউল বারিয়া জাতের পাকিস্তানি ষাড় এনেছেন মেলায়। দুটি ষাড়ের দাম হাকা হচ্ছে ২২ লাখ। তিনি ২৫ লাখের কমে দড়ি ছাড়বেন না। তার খামারে ২৪টি গরু রয়েছে। আছে ৮টি মহিষও।
প্রিন্স এগ্রো ফার্মের মো. আরিফুল ইসলামের বাহাদুর নামের ষাড়ের দাম চাওয়া হচ্ছে ১৫ লাখ ও শাহিওয়াল জাতের আরেকটি ষাড়ের জন্য ১৮ লাখ টাকা। এ ব্যবসায়ী জানান, তাদের খামারে ৪০টি ষাড় রয়েছে। এখন যদি বিক্রি করতে পারেন করবেন, না হলে কোরবানির ঈদে বিক্রি করবেন।
মিরকাদিমের ৪ দাঁতি একটি ষাড় মেলায় তুলেছেন হাসিবুল ইমাম। ষাড়টি দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
এদিকে মেলায় পাখি প্যাভিলিয়ানে শোনা যায়, মেকাও, সাদা টিয়া, হলদে টিয়া, ইউরোপিয়ান কোয়েল, মুরগিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির। এক দোকানে ইউরোপিয়ান কোয়েল সাদা কোয়েলের দাম হাঁকা হচ্ছে ৭ হাজার। বিক্রেতা মো. জুবায়ের হোসন জানান, এসব কোয়েল ৪৫ দিনে আধা কেজি ওজনে পরিণত হয়। বর্তমানে বাজারে ভালো চাহিদা তৈরি হয়েছে।
মেলায় বেড়াতে আসা ফুয়াদ হোসেন নামের এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, পাখি প্যাভেলিয়নটা খুব ভালো লেগেছে। তবে পাখির দাম অনেক বেশি।
গবাদি পশুর কৃত্রিম প্রজাননে বেসরকারি উদ্যোগ
ষাড়ের অভাব ও উন্নত জাতের জন্য গবাদি পশুর কৃত্রিম প্রজানন একটি বহুল প্র্রচলিত পন্থা। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এক্ষেত্রে কাজ করছে। তাদের মধ্যে কথা হয় আমেরিকান ডেইরি লিমিটেডের (এডিএল) মার্কেটিং ডিরেক্টর এন্ড ফিল্ড এডভাইজরি সার্ভিসের পরিচালক একেএম আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গবাদি পশুর কৃত্রিম প্রজাননের জন্য সরকারের পাশাপাশি কাজ করছে এডিএল। আমাদের রয়েছে সর্ববৃহৎ বুল মাদারহার্ড। সেখান থেকে প্রতিনিয়ত উন্নত মানের প্রজনন ষাড় উৎপাদন করে দেশে পশুর কৃত্রিম প্রজনন কাজে ব্যবহার করছি। আমাদের গ্রিডিং বুল মাদারহার্ডের সঙ্গে দেশি প্রজাতির জাত সংরক্ষণের জন্য বিশেষ কার্যক্রম নেওয়া আছে। বিশেষ করে দেশীয় জাতগুলো ক্রমান্নয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তারমধ্যে রয়েছে- নেত্রকোনা হিলব্লেক, মুন্সিগঞ্জ ভ্যারাইটি, নর্থ বেঙ্গল গ্রে, পাবনা ক্যাটল, রেড চিটাগং কাটল। এসব জাত উন্নয়নেও কাজ করছি। ব্লেক বেঙ্গল ছাগলের প্রজনন বিস্তারেও হিমায়িত সিমেন সরবরাহ করছি। তা ছাড়া মহিষের মাদারহার্ডও রয়েছে। এতে মহিষ উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। আমাদের ষাড়গুলো ইউএস জেনোমিক টেস্টেড। তাই আগে থেকেই বলে দেওয়া যায় এসব জাতের বাছুরগুলো কেমন উন্নত হবে। আমাদের গরুগুলো উচ্চ টিটিআই সমৃদ্ধ হওয়ায় পরবর্তী বংশধর ভালো হবে।
মেলায় কথা হয় ব্র্যাক আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন এন্টারপ্রাইজের ডেপুটি ম্যানেজার ডা. বিভাস তালুকদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, গরুর দুধ ও মাংস বৃদ্ধির জন্য উন্নত জাতের ষাড়ের সিমেন উৎপাদন করে খামারি পর্যায়ে সরবরাহ করি। আমাদের ব্রিডগুলোর মধ্যে রয়েছে হলেস্ট্রিয়ান ফিজিয়ান শত ভাগ ও ক্রস, শাহিওয়াল শত ভাগ ও ক্রস। মহিষের ক্ষেত্রে মুররা বাফেলো। এটি খুবই রোগ প্রতিরোধী জাত। তা ছাড়া দুধের পরিমাণও বেশি দেয়। দেশি প্রজাতিগুলোও রয়েছে।
তিনি বলেন, এখন যেমন দেশি মুরগি খুঁজে পাওয়া যায় না, তেমনি ১৫-২০ বছর দেশি জাতের গরুও খুঁজে পাওয় যাবে না। এজন্য এসবের জাত সংরক্ষণ করা হচ্ছে। আসলে দুধের ক্ষেত্রে উন্নত জাতে দিকে গেলেও মাংসের জন্য দেশি জাতগুলোই সবাই প্রাধান্য দেয়। কেননা এগুলো কেনার ক্ষেত্রে সকলের সাধ্য স্বামর্থের মধ্যে থাকে।
মেলা চলছে ৮ বিভাগেই
রাজধানীতে আজ শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) মেলাটি শেষ হবে। এছাড়া দেশের ৮টি বিভাগ ৬৪ জেলা ও ৪৯৪টি উপজেলায় মেলাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব মেলায় খামারি পর্যায়ে গরু, ছাগলসহ প্রাণিসম্পদ প্রদর্শন, কৃমিনাশক টিকা প্রদান, চিকিৎসা সেবা প্রদান, স্কুল মিল্কফিডিংসহ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
অনিরাপদ বিদেশি প্রাণিজ সম্পদ আমদানির পক্ষে নয় সরকার
এদিকে সপ্তাহটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের সেমিনারে সভাপতিত্বে ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
উপদেষ্টা বলেন, অনিরাপদ বিদেশি প্রাণিজ সম্পদ আমদানির পক্ষে নয় সরকার। তাই দেশীয় প্রাণিজ সম্পদ উৎপাদনের মাধ্যমে শুধু দেশের চাহিদা পূরণ নয়, বিদেশেও এর বাজার সৃষ্টি করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে সরকার।
তিনি বলেন, পোল্ট্রি শিল্পের জন্য ভুট্টা ও সয়াবিন আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে এই দুটি ফসলকে কৃষি খাতের অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
পোল্ট্রি সেক্টরের ক্ষুদ্র খামারিদের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র খামারিদের টিকিয়ে রাখতে হলে ফিড–সংক্রান্ত সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করতে হবে এবং তাদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে গ্রাজুয়েশন হওয়া একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু এলডিসি থেকে বের হতে হলে যেসব সক্ষমতা প্রয়োজন, তা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। আমরা বের হয়ে গেলে একদিকে ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে, তারপরও এ বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।