তানভীর হাসান
প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৫১ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) পদায়নে লটারি করা নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, লটারিতে ক্যাটাগরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা রক্ষা করা হয়নি। কারণ যারা ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলায় আছেন, তারা সেই জেলা থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিরই অন্য জেলায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে জেলায় পোস্টিং পাওয়ার জন্য আগ্রহী ছিলেন এমন অনেক বঞ্চিত কর্মকর্তাকেই লটারির তালিকায় রাখা হয়নি। আবার এই লটারিতে বিগত সরকারের সহযোগী ছিলেন এমন অনেক সুযোগসন্ধানীর পুনর্বাসনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। গতকাল অনেক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সব মিলিয়ে লটারি নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে।
তবে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রমতে, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের বাছাই করে পদায়নের লক্ষ্যে গত দীর্ঘ এক মাস ধরে গোয়েন্দারা কাজ করেছেন। তাদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সুবিধাভোগীদের এই লটারির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এসপি পদায়নের পর ওসি পদায়নে লটারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে রেঞ্জের ডিআইজিদের কাছ থেকে অভিজ্ঞদের তালিকা নেওয়া হচ্ছে। ওদিকে নির্বাচনের আগেই অন্তত চারটি রেঞ্জের ডিআইজি ও দুটি মেট্রোর কমিশনার বদলি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাদের ক্ষেত্রে লটারি করা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন অভিমত
এদিকে লটারি করে পদায়নের ফল ভালো আসে না বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একটি জেলার দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেক বিষয়েই পারদর্শী হতে হয়। তার মধ্যে একটি বড় বিষয় হলো, জেলায় কাজ করার অভিজ্ঞতা। যা হয়তো অনেকেরই নেই। ফলে নির্বাচনের সময় ও এর আগে-পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে তাদের সমস্যা হতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘লটারির মাধ্যমে পদায়ন ভালো কোনো উদাহরণ তৈরি করবে না। এমনকি লটারি করে পদায়নের ফলও ভালো আসে না। নিজেরা যোগ্য লোককে বাছাই করতে না পারার অক্ষমতা লটারির মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। একেক জায়গায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা অপরাধের ধরন তো একেক রকম হয়। নতুন একজন সেখানে গিয়ে যাতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেজন্য কাজের দক্ষতা বিবেচনায় পদায়ন করাই ভালো। এ নিয়ে ভবিষ্যতে বিতর্কও তৈরি হতে পারে। কারণ লটারিতেও অনিয়ম করা সম্ভব। এসপি হোক আর ডিসি হোক, লটারির ওপর নির্ভর করা ভালো কোনো প্রক্রিয়া নয়। এর ফলে পছন্দের লোককে লটারির মাধ্যমে পদায়নের ঘটনা ঘটবে। এতে যোগ্য কর্মকর্তার পদায়ন ঘটবে না। পেশাগত পদায়নের ক্ষেত্রে লটারি কখনোই গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। এটা ভালো কোনো উদাহরণ হলো না।’
দ্রুতই প্রজ্ঞাপন জারি হবে
গত সোমবার সকালে যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা লটারির উদ্বোধন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে লটারির মাধ্যমে ৬৪ জেলার এসপি মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে। বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী ৬৪ জেলার এসপিদের মধ্য থেকে ১৫ জনকে বাদ দিয়ে নতুন সমসংখ্যক কর্মকর্তাকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৪৯ জনকে বর্তমান জেলায় না রেখে অন্য জেলায় দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুতই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এর আগে গত শনিবার বিকাল ৪টায় প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা বৈঠকে নির্বাচনকালীন এসপি নিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। সূত্র মতে, ৬৪টি জেলাকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’Ñ এই তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ২৭টি ও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ২৮টি জেলা। বাকি ৯টি জেলাকে রাখা হয়েছে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে। বর্তমানে যে ৬৪ জন এসপি দায়িত্বে রয়েছেন তাদের মধ্য থেকে ১৫ জনকে বাদ দিয়ে নতুন যে ১৫ জন নিয়োগ পাবেন তাদের নিয়ে লটারি করা হয়। লটারিতেই নির্ধারিত হয় কে কোন জেলার এসপি হবেন। এই এসপিরাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) একেএম আওলাদ হোসেন বলেন, ‘যমুনায় লটারির মাধ্যমে ৬৪ জেলার এসপি চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকারি আদেশ হলে তাদের পদায়ন করা হবে।’
কোন জেলা কোন ক্যাটাগরিতে
পুলিশের এসপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলার তালিকায় রয়েছেÑ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জ, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লাসহ আরও কয়েকটি জেলা। যেগুলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক এবং অপরাধপ্রবণ হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ‘বি’ ক্যাটাগরির জেলার মধ্যে রয়েছেÑ পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, খুলনা, বরগুনা, পিরোজপুরসহ কয়েকটি জেলা। আর ‘সি’ ক্যাটাগরির জেলার তালিকায় রয়েছেÑ গোপালগঞ্জ, নড়াইল, রাজবাড়ী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধাসহ কয়েকটি জেলা।
তিনি বলেন, ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলায় দায়িত্ব পালনকারী এসপি সমমানের একটি জেলায় যাচ্ছেন। আবার ‘বি’ ক্যাটাগরির এসপি পাচ্ছেন ওই ক্যাটাগরির জেলা। তার মানে এই লটারির কোনো মানে হয় না। মূলত ১৫ জেলায় নতুন করে এসপি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এখানে ২৫, ২৭ ও ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের সিলেক্ট করা হয়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞতার দিক থেকে ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তারা এগিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে ২৭ ও ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের বেশি সংখ্যক নাম দিয়ে লটারির আওতায় আনা হয়েছে। যাদের মাঠ পর্যায়ে এই দায়িত্ব পালনের বয়স ও অভিজ্ঞতা এখনও হয়নি। কারণ একটি জেলার এসপিকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট বোঝার সক্ষমতা থাকতে হয়। অপরাধ ও সহিংসতা দমনে আইন প্রয়োগের মাত্রাও অনেক সময় বিবেচ্য হয়ে ওঠে। অপেক্ষাকৃত তরুণরা অনেক সময় আবেগে অনেক কিছু করে ফেলেন। যা পরে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে।
পুলিশের একজন ডিআইজি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এই লটারির কারণে এসপি পদে নিয়োগ পাওয়া ৬ জনকে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে। একইভাবে গত ১৫ বছর ডাম্পিং পোস্টিংয়ে থাকা কর্মকর্তারাও লটারির তালিকায় আসেননি। তাই এক ধরনের চাপা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এসপি পদায়নের পরের ধাপে থানার ওসি নিয়োগও লটারির ভিত্তিতে করা হবে। এজন্য সৎ, নিরপেক্ষ ও যোগ্য পরিদর্শকদের তালিকা এরই মধ্যে ইউনিটপ্রধানদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সেখানেও যদি একই ধরনের পরিস্থিতি হয় তাহলে বিতর্ক এড়ানো কঠিন হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘লটারির মাধ্যমে দক্ষ কর্মকর্তাদের বেছে নেওয়া কঠিন। সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ জেলায় অভিজ্ঞ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেওয়া হয়। কিন্তু লটারিতে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাও গুরুত্বপূর্ণ জেলার এসপি পদ পেতে পারেন। যে কারণে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে লটারিতে কোন ধরনের কর্মকর্তাদের সিলেক্ট করা হয়েছে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’