নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:৩৬ পিএম
প্রতিকী ছবি
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে দেশের স্থানীয় পর্যায়ের হাট-বাজারগুলো। জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের এসব হাট-বাজারে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুগের পর যুগ সরকারিভাবেও নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। স্থানীয় বাজার কমিটির উদ্যোগে নৈশ প্রহরীরা দায়িত্ব পালন করলেও তারা প্রশিক্ষিত নন, তাদের হাতে নেই আত্মরক্ষার উপকরণ। অধিকাংশ হাট-বাজারে নেই সিসিটিভি ক্যামেরা, অ্যালার্ম সিস্টেম ও জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা। এ ছাড়া হাট-বাজারের অবকাঠামো দুর্বল, নিরাপত্তাব্যবস্থাও নাজুক। ফলে প্রায়ই বিভিন্ন হাট-বাজারে নৈশ প্রহরীকে বেঁধে রেখে বা হত্যা করে চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।
সরকারের মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, প্রতিটি থানায় অন্তত অর্ধশত হাট-বাজার রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে পুলিশের পক্ষে এসব স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। হাট-বাজারের নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের হলেও নিরাপত্তার বিষয়ে তারা উদাসীন। অন্যদিকে প্রতি অর্থবছরে এসব হাট-বাজার থেকে ভূমি মন্ত্রণালয় বিপুল রাজস্ব আদায় করলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রহরীর সংখ্যা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ কিংবা বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাদের ভাবনা নেই। এমন অবস্থায় স্থানীয় হাট-বাজারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে চায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।
জানা গেছে, দেশে হাট-বাজারের সংখ্যা ১০ হাজার ১০৬টি। এর মধ্যে ইজারাকৃত হাট-বাজার ৭ হাজার ৫৪০টি। এ ছাড়া অ-ইজারাকৃত হাট-বাজারের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬৬টি। এর বাইরেও রয়েছে কয়েক হাজার হাট-বাজার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা হাট-বাজারের নিরাপত্তা সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় হাট-বাজারের নিরাপত্তা প্রহরীর সংখ্যা অনেক কম। প্রহরী সংকট ও তাদের দক্ষতার অভাবে হাট-বাজারগুলো অনেকটাই অরক্ষিত।’ অন্যদিকে বাজার পরিচালনা কমিটির একাধিক নেতা বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের থেকে তোলা চাঁদায় বেতন হয় প্রহরীদের। সরকারিভাবে এ কাজের স্বীকৃতি নেই। ফলে এ কাজে আগ্রহীদের সংখ্যা কম।’
এ বিষয়ে কুমিল্লার লালমাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিমাদ্রী খিশা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সম্প্রতি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি বয়স্ক ও দুর্বল লোক ছাড়া যুবক শ্রেণির কেউ এ কাজে আসতে চায় না।’ এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠপর্যায়ের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রহরীদের প্রশিক্ষণের অভাব, তাদের কাছে আত্মরক্ষার উপকরণ না থাকা এবং জনবল সংকট ও আধুনিক প্রযুক্তিহীনতার কারণে অপরাধীদের টার্গেট এখন রাতের হাট-বাজার।’
প্রহরীদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। অন্যথায় তারা ডিমোটিভেটেড হয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানার ওসি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নিরাপত্তাকে ফ্রেমওয়ার্কে না আনলে বাজার-ঘাটগুলো ঝুঁকিতেই থেকে যাবে।’
হাট-বাজারের নিরাপত্তা ইস্যুতে
দুই মন্ত্রণালয়ের ঠেলাঠেলি
জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে দেশের হাট-বাজার নিয়ন্ত্রণ করে জেলা ও উপজেলা পরিষদ। হাট-বাজারে রাত্রীকালীন নিরাপত্তা ইস্যুতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মো. সালাউদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘হাট-বাজার জেলা পরিষদের অধীনে হলেও ভূমি মন্ত্রণালয় যেহেতু রাজস্ব আদায় করছে, সেহেতু নিয়ন্ত্রণও তাদেরই।’ তবে হাট-বাজারের নিরাপত্তা ইস্যুতে কারা কাজ করে জানতে চাইলে তিনি যেকোনো একজন জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘হাট-বাজার আমি দেখি না। আমি মাঠ প্রশাসন দেখি।’ তবে মাঠ প্রশাসনে যে হাট-বাজার, সেটা ভূমি মন্ত্রণালয়ের সায়রাত শাখা দেখে জানিয়ে তিনি সে শাখায় যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
সায়রাত শাখার (জরিপ অনুবিভাগ) অতিরিক্ত সচিব সায়মা ইউনুসের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাট-বাজার আমি দেখি না। যিনি দেখেন তিনি বলতে পারবেন। আর হাট-বাজার ইজারা দেন জেলা প্রশাসক।’ এ ছাড়া হাট-বাজারের নিরাপত্তা বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা কমিটিতে যারা আছেন, তারাই দেখেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে সায়রাত শাখার যুগ্ম সচিব সাবেরা আক্তার বলেন, ‘এটা ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিষয় না। ভূমি মন্ত্রণালয় শুধু ব্যবস্থাপনার জায়গাটা দেখে।’ তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (জেলা পরিষদ) খোন্দকার ফরহাদ আহমদ বলেন, ‘হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত একটি নীতিমালা আছে, সেই নীতিমালা অনুযায়ী এটা দেখে উপজেলা পরিষদ। এটা নিয়ে আগে জেলা-উপজেলায় কথা বলতে হবে।’ নিরাপত্তা নিয়ে কারা কাজ করবেÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা আমি বলতে পারব না।’
সরকার চাইলে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী
এদিকে রাত্রীকালীন হাট-বাজারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৬০ লাখ সদস্যের সামাজিক সুরক্ষা ম্যান্ডেটের আওতায় নিরাপত্তা প্রদানে সাংগঠনিক সক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘সরকার চাইলে স্বল্প বাজেটের মধ্যে দেশের হাট-বাজারে অঙ্গীভূত/উপজেলা আনসার কিংবা ভিডিপি সদস্যদের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রান্তিক পর্যায়ে উপজেলা ও ইউনিয়নের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত সদস্য নিয়োজিত করার সক্ষমতাও আমাদের রয়েছে।’
বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ প্রায় সব সরকারি ব্যাংকে অঙ্গীভূত আনসাররা দায়িত্ব পালন করছেন। যেখানে ব্যাংকের ভেতরেই তাদের থাকা-খাওয়ার সুযোগ প্রদান করা হয়। হাট-বাজার কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার বিভাগ একই ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করলে হাট-বাজারেও অঙ্গীভূত আনসারের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রদান করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগ আনুষ্ঠানিক চাহিদা উপস্থাপন করলেই কেবল সাধারণ আনসার ও ভিডিপিকেও নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে বলেও জানান তারা। জানা যায়, অঙ্গীভূত আনসার নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৭-২০ হাজার টাকা বেতন প্রদান করতে হতে পারে, যা স্থানীয় সরকার বা বাজার কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ব্যবস্থা করা সম্ভব। এ ছাড়া অস্ত্রসহ সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে অস্ত্রের অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং এতে ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। তবে সব মিলিয়ে সরকার চাইলে দেশের হাট-বাজারের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এ দায়িত্ব গ্রহণে প্রস্তুত বাহিনীটি।