তানভীর হাসান ও কবির হোসেন
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:৪৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত আধুনিক সরঞ্জাম থাকলেও সে বিষয়ে শতভাগ দক্ষতা নেই ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। এমনকি দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আধুনিক ফায়ার ট্রেনিং সেন্টার ও একাডেমি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনও দৃশ্যমান নয়। এমনকি ১১ হাজার ৭৪১ জন ফায়ার ফাইটারের মধ্যে মাত্র ১১০ জন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এছাড়া আগুনের ধরন সম্পর্কেও তারা অনেকেই অনভিজ্ঞ। আর এ কারণে আগুন নেভাতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেতে হচ্ছে সংস্থাটির। এতে নিরিহ জনগণের পাশাপাশি প্রাণ যাচ্ছে ফায়ার ফাইটারদেরও। এমন পরিস্থিতিতে উন্নত মানের ফায়ার একাডেমি স্থাপন করে দক্ষ ফায়ার ফাইটার গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ আর বিভিন্ন পর্যায়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফায়ার ফাইটাররা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেন। ফায়ার ফাইটারদের মধ্যে যারা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, তাদের মধ্যেও কারও কারও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ছিল। অনেক সময় দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে অব্যবস্থাপনার কারণে তারা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য যেটি প্রয়োজন, তা হলো শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমাদের ফায়ার ফাইটাদের সাজসরঞ্জাম নিয়ে প্রবেশের মতো উপযুক্ত ও প্রশস্ত পথ। প্রতিষ্ঠানের মজুদকৃত মালামালের সঠিক তথ্য দিতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত দুর্ঘটনা মোকাবিলার প্রাথমিক সাজসরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল। প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে বিএনবিসি না মানা, ফায়ার সেফটি প্ল্যান গ্রহণ না করা, অগ্নিনিরাপত্তা আইন অমান্য করা, দুর্ঘটনার সময় সঠিক তথ্য না দেওয়া ইত্যাদি কারণে মূলত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এমনকি সাধারণ জনগণসহ ফায়ার ফাইটারদের জীবন বিপন্ন হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। তবে আমাদের ফায়ার ফাইটারদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান চলমান।’
জানা গেছে, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে ফায়ার সার্ভিসে। বিশ্বের সর্বাধিক উচ্চতা টার্নটেবল লেডার থেকে শুরু করে রিমোট কন্ট্রোল ফায়ার ফাইটিং ভেহিকল, ড্রোনসহ আগুন নির্বাপণের বিশ্বখ্যাত প্রায় সকল সরঞ্জামই রয়েছে। এ সত্ত্বেও বড় কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হয় ফায়ার ফাইটারদের।
জানা গেছে, সংস্থাটি আধুনিক সরঞ্জামে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও সে তুলনায় ফায়ার ফাইটারদের দক্ষতা বাড়েনি। স্বল্প দক্ষতা ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের অভাব ও অত্যাধিক ট্রেনিং সেন্টার না থাকার কারণে আগুন নেভাতে গিয়ে প্রায়ই ফায়ার ফাইটারদের প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি টঙ্গীর সাহারা মার্কেট এলাকায় ফেমাস কেমিক্যাল লিমিটেডের গুদামের আগুন নেভাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুজন ফায়ার ফাইটার মারা যান। এ ঘটনায় সদস্যদের আরও কয়েকজন দগ্ধ হন। সীতাকুণ্ডে এক দুর্ঘটনায় মারা যান ১৬ জন। শুধু টঙ্গীর ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার ফাইটারদের বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। গত মাসে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে, মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে পোশাক কারখানা ও চট্টগ্রাম ইপিজেডের আগুন নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় লেগেছে ফায়ার ফাইটারদের। এত আধুনিক ও বিশ্বমানের সকল ব্যবস্থা থাকলেও কেন বারবার এই রকম ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
যদিও সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, বিদেশে থেকে বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত ১১০ জনসহ মোট ৫৪৪ জন ফায়ার ফাইটার রয়েছে। যারা কেমিক্যাল আগুন, ভবন ধসে পড়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঘটনা মোকাবিলা করতে সক্ষম। এছাড়া ফায়ার ফাইটারদের মধ্যে যারা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, তাদের কারও কারও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ছিল।
সংস্থাটির সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ আগুন, ভবন ধসে পড়া কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত ফায়ার কর্মীর প্রয়োজন হয়। এমন বিশেষ ক্যাটাগরিতে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১১০ জন ফায়ার ফাইটার রয়েছে। এদের কাছ থেকে দেশে একই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আরও ৪৩৪ জন। দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মোট ৫৪৪ জন ফায়ার ফাইটার রয়েছে। কিছুদিন আগে মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনা ও বিমানবন্দরে আগুন নেভাতে ওই বিশেষায়িত টিম পাঠানো হয়েছিল। সরাসরি যারা অগ্নিনির্বাপণে কাজ করে।
বিশেষায়িত টিম অন্য সাধারণ ফায়ার ফাইটার থেকে আলাদা কেন?
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান শিকদার জানান, ফায়ার সার্ভিসের শতভাগ কর্মীই আগুন নেভানোর জন্য প্রশিক্ষিত। তবে আগুনের মধ্যেও কিছু রয়েছে বিশেষ ধরনের আগুন। যেমন কেমিক্যাল হেজার্ট আছে, এই ছোট আগুনও মানুষের জীবনের হুমকি হতে পারে। আরেকটি উদাহরণ বঙ্গবাজারের আগুন, সেটি তো অনেক ভয়াবহু ছিল কিন্তু তাতে মানুষ মারা যায়নি। তিনি বলেন, যখন কোথাও আগুন লাগে তখন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে যায় এবং কিছু সাংকেতিক চিহ্ন দ্বারা তারা বুঝতে পারে আগুনটা স্বাভাবিক না কি কোনো দাহ্য কেমিক্যাল পদার্থ দ্বারা ঘটেছে। তবে বাংলাদেশে এমন সাংকেতিক চিহ্ন নেই বললেই চলে।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে আর সেটা যদি কেমিক্যালের আগুন হয় কিংবা ভবনে কেমিক্যালের অস্তিত্ব থাকে, তাহলে বিশেষায়িত টিম সেটা বুঝতে পারে। কিছু সাংকেতিক চিহ্ন দেখান তারা। আর ওই চিহ্ন দেখেই ফায়ার ফাইটাররা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। যেমন ধরেন কোনো দোকানে আগুন লেগেছে, দেখতে ছোট কিন্তু গোপনে ওই দোকানে যে কেমিক্যাল রাখা হয়েছে, সেটা না বলা পর্যন্ত কেউ জানবে না। কেমিক্যাল যে রয়েছে তা বোঝার জন্য একটাই পথ দোকানের সামনে চিহ্ন লিখে রাখতে হবে। তাহলে ফায়ার ফাইটাররা বুঝতে পারবে কোনটা সাধারণ ফাইটার দ্বারা নেভানো সম্ভব আর কোনটা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফাইয়ার টিমের প্রয়োজন।
অগ্নি ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ মেজর শাকিল নেওয়াজ (অব.) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ২০২৩ সালের আইনকে অনুসারণ করে ফায়ার ফাইটার নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্ত ফায়ার ফাইটাররা শুধু আগুন নেভানোর কাজ করবেন। সেখানে দেখা গেছে ভবন ধসে পড়েছে, সড়ক দুর্ঘটনা হয়ছে, উদ্ধারকাজে, কেমিক্যালের আগুন নেভানোর অভিযানে সাধারণ ফায়ার ফাইটারদের পাঠানো হচ্ছে। যেহেতু দক্ষতার বিষয়টি আসছে, তাহলে আমি বলব প্রতিটি অভিযানের জন্য আলাদা বিশেষায়িত টিমের প্রয়োজন। আইনে সেটা নেই যে একজন ফায়ারকর্মী আগুন নেভানোর জন্য নিয়োগ দিয়ে পাখি উদ্ধার করবে।
তিনি বলেন, একই প্রশিক্ষণ সবাইকে দিলে হবে না। নিয়ম অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিসের স্পেশাল টিম তৈরি করা উচিত। যেগুলো অতি প্রয়োজন, সেগুলো অনুমোদন করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। সাধারণ ফায়ার ফাইটার যারা শুধু আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত, তারা অন্যসব করতে গিয়েই দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। যেমন কেমিক্যালের আগুন নেভাতে সাধারণ ফায়ার ফাইটারদের পাঠানো যাবে না। সেখানে পাঠাতে হবে বিশেষায়িত টিম। যেমন ভূমিকম্পের জন্য স্পেশাল টিম থাকবে, বন্যা দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আলাদা টিম থাকবে। এমন প্রতিটি দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আলাদা স্পেশাল টিম থাকবে। এসব বিশেষায়িত টিম থাকলে ফায়ার ফাইটার যেমন নিরাপদে থাকবে, তেমন অভিযানে সফলতা আসবে। আরেকটা বিষয় হলো, দেশে ফায়ার সার্ভিসের ট্রেনিং সেন্টার উন্নত মানের না। এখানে অত্যাধুনিক একটা ট্রেনিং সেন্টার ও ফায়ার একাডেমির প্রয়োজন। যেখানে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নেওয়া যাবে। তাহলে ফাইয়ার ফাইটারদের দক্ষতা বাড়বে।