× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মহাবিপর্যয়ের সংকেত

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৬ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

দেশে ৩৩ ঘণ্টার ব্যবধানে চার দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীতে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনায় শিশুসহ ১০ জন নিহত ও সহস্রাধিক মানুষ আহত হন। এরপর গতকাল শনিবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে আবারও ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশ। ৩.৩ মাত্রার এই ভূকম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর পলাশ। এর সাড়ে সাত ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীতে পরপর দুবার ভূকম্পন অনুভূত হয়। যার একটির উৎপত্তিস্থল বাড্ডায়, আরেকটির নরসিংদীতে। 

অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক দফা ভূমিকম্প বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেনÑ বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার এমনিতেই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। তার ওপর দেড় দিনের মধ্যে চার দফা ভূমিকম্প বড় ধরনের সতর্কবার্তা। তারা মনে করছেন, এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক দিন। তারপর বোঝা যাবে কী হয়। কয়েক দফা ভূমিকম্পে মানুষের আতঙ্ক ও ভীতি তৈরি হয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণের মনেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছেÑ সামনে কি আরও বড় আকারের ভূমিকম্প অপেক্ষা করছে? 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেড় দিনের ব্যবধানে চার দফা ভূমিকম্প হলো। এটি আমাদেরকে মহাবিপর্যয়ের আগাম সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।’

সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সাবডাকশন জোনের মধ্যে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প শক্তি জমা হয়ে আছে উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এটি যেকোনো জায়গায় হতে পারে। এটা শুরু হয়েছে ঘোড়াশাল থেকে, হয়তো সেখান থেকেই এটি উত্তরে এবং দক্ষিণে বিস্তার লাভ করবে। অনেক বড় শক্তির একটি ভূমিকম্প তখন আঘাত হানবে।’

ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘শুক্রবারের ভূমিকম্পটি হয়েছে দুটি প্লেটের সংযোগস্থলে ৫.৭ মাত্রায়। গতকাল যে কটি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে সেগুলোও তার কাছাকাছি অঞ্চলে। আর আমরা পূর্ব থেকেই আভাস দিয়ে আসছি যে, আমাদের ভূগর্ভে ৮ মাত্রার শক্তি সঞ্চিত রয়েছে। শুক্রবার সেখান থেকে সামান্য অংশ বের হয়েছে। সুতরাং সেই ফ্লোটা কিছুই না। এটি জানান দিচ্ছেÑ এতদিন আটকে ছিলাম বের হতে পারিনি। এখন বের হচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘শুক্রবার ভূমিকম্প হলো এবং গতকাল যে ভূকম্পনগুলো হলো, এগুলোকে ‘ফোরশক’ বলব আমি। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। দু-তিন দিন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অবশ্যই এর তাৎপর্য হলো ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হয়ে আছে। এটা বের হবে।’

এই ভূতত্ত্ববিদ আরও বলেন, ‘সেই বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে। সরকার বাধ্য হবে এটাকে পরিত্যক্ত নগরী হিসেবে ঘোষণা করতে।’ 

ঢাকা ও নরসিংদী বেল্টটি চরম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা বলে মন্তব্য করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মানসুরুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটি ইন্ডিয়ান প্লেটের অংশ। ইন্ডিয়ান প্লেটের যে অংশে ভূমিকম্প হয় সেটির শেষ প্রান্তে আমাদের অবস্থান। এখানে আরও বড় মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। এটি ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাত্রার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথবা ৮ মাত্রার ভূমিকম্পও হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ঢাকার পূর্বাঞ্চল তথা নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকা সবচেয়ে বেশি ধাক্কাপ্রবণ এলাকা। এসব অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।’ আমরা সেই ঝুঁকিতে রয়েছি বলে মন্তব্য করে অধ্যাপক ড. মো. মানসুরুল হক বলেন, ‘আমাদের ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীলভাবে বানানো হয় না। এসবের কোনো তদারকিও নেই। ফলে যে যেভাবে পারে ভবন নির্মাণ করছে। বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে না। দুই বিল্ডিংয়ের মাঝখানে যে ফাঁকা রাখার কথা সেটিও রাখা হয় না। ফলে বড় আকারের তথা ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে আমাদের অস্তিত্বই বিলীন হবে।’ 

অধ্যাপক মানসুরুল হক বলেন, ‘ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে আমাদের উদ্ধার সরঞ্জামের সংকট রয়েছে। এক্ষেত্রে হাহুতাশ ও বৈদেশিক সহায়তা ছাড়া কোনো পথ নেই। অন্যান্য দেশের কিছুটা প্রস্তুতি থাকে কিন্তু আমাদের সে প্রস্তুতি ও সচেতনতার কোনোটাই নেই।’

এক ভবন থেকে আরেক ভবনে উদ্ধার করবে বা পড়ে গেলে টেনে নিয়ে যাবে এমন পরিস্থিতি ও পরিবেশ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজা বিপর্যয়ের সময় আমরা দেখেছি একটি ভবনে উদ্ধার করতেই এক মাস চলে গেছে। সেখানে একটি নগরী বা সারা দেশে কীভাবে উদ্ধার কাজ করা সম্ভব হবে?’

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের সাবেক ডিন ও ডিপার্টমেন্ট অব ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলেন্সের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যতটা পূর্বদিকে যাওয়া যায় ভূমিকম্পের পরিমাণ এবং মাত্রাও তত বাড়তে থাকে। আবার দক্ষিণ থেকে উত্তরদিকে সিলং হয়ে আসাম পর্যন্ত গেলেও একই পরিস্থিতি।’

এসব স্থানে ঘন ঘন এবং ৫, ৬ ও ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চার দফা ভূমিকম্প আমাদের জন্য মহাবিপর্যয়ের আভাস দিচ্ছে। কেননা বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ। এর কারণÑ এখানে ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান দুটি প্লেটের মুখোমুখি সংঘর্ষ। ইন্ডিয়ান প্লেটটি উত্তর-পূর্ব ইউরেশিয়ান প্লেটের দিকে বছরে প্রায় ৩৬ মিলিমিটার গতিতে এগিয়ে গিয়ে সংঘর্ষ হচ্ছে। ইউরেশিয়ান প্লেট উত্তর ও পূর্ব দুদিকেই আছে। উত্তরের প্লেটকে বার্মিজ প্লেট আবার কেউ কেউ সুনদ্রা প্লেটও বলে। এজন্যই এই অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ।’ 

শুক্রবার নরসিংদীতে ভূমিকম্প হওয়ার পর গতকাল সকালে পলাশে যেটি হয়েছে তা আফটার শক উল্লেখ করে অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘ছোট ছোট আফটার শক হলে টের পাওয়া যায় না। কিছু বড় আকারের হলে বোঝা যায়।’ 

সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার দিকটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্প হলে বাড়ি থেকে বের হওয়া ঠিক হবে না। যে যেখানে আছেন সেখানেই অবস্থান করবেন। কেননা আমাদের ফাঁকা জায়গার অভাব রয়েছে। ফলে ঘরে থাকলেই বেশি নিরাপদ।’ 

এদিকে দেশের গত সরকারগুলো প্লান ও মাস্টারপ্লান করবে বলে কথার ফলঝুড়ি দিয়েও প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশে সাড়ে ৩ ও ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হবেই। এখন কথা হচ্ছে বড়মাপের কেমন ভূমিকম্প হলে আমাদের কী অবস্থা হবে!’ 

ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান অভিযোগের সুরে বলেন, ‘সরকারের নীতি তৈরি ও যথাস্থানে সঠিক ব্যক্তি না থাকলে আমাদের এই জনবহুল দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। যেকোনো বড় প্রকল্পে এনভায়রনমেন্টাল এসেসমেন্ট না করলে বিপর্যয় হবেই।’ 

তিনি ‘জিএসবির গবেষণা বাড়াতে হবে’ মন্তব্য করে বলেন, ‘ভূমিকম্পের তথ্য বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) দেওয়ার কথা কিন্তু দিচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।’

জিএসবির দায়িত্ব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুল মান্নান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের ইন্টারনাল প্লেটগুলো শিফটিং হচ্ছে তা নিয়ে গবেষণার কাজ। আমাদের কয়েকটি জায়গায় কিছু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র আছে সেগুলোর তথ্য সমন্বয় করা হচ্ছে না। তবে আমরা নতুন একটি প্রকল্প নিচ্ছি যাতে করে এসব মনিটরিং করা যায়। গত সপ্তাহ ও গত বৃহস্পতিবারও বসেছিলাম। আমরা আগামীতে এই মুভমেন্টগুলো পর্যবেক্ষণ করব।’


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা