× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভেজাল খাদ্যে বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১০:২০ এএম

ভেজাল খাদ্যে বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়

পুরে বাংলাদেশই যেন ডুবে আছে ভেজালের সাগরে! সকালে যে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজি, সেটাও হয়তো ক্ষতিকর কেমিক্যালে ভরা। নাশতার রুটি ও ডিমে, দুধে ফর্মালিন, বাজারের সবজিতে বিষাক্ত কীটনাশক সব মিলিয়ে প্রতিদিনের খাবার যেন একেকটা নীরব ঘাতক। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে এক প্লেট ভাত খেতে বসলে সেটাও আর নিরাপদ নয়। শাক-সবজি, মাছ-মাংস সর্বোপরি ভেজালমুক্ত খাবারের আশা ছেড়েই দিয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। কেমিক্যালের দাম বাড়লে খাবারের দাম বাড়ে এমন কথাও প্রচলিত অনেক দিন ধরেই। 

ভেজালের এই ভয়াল শিকড় এখন বহু স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। মাঠে কৃষক অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে ফসল বাঁচান, প্রক্রিয়াজাতকরণে শিল্পমালিক মেশান সংরক্ষণকারী কেমিক্যাল, পিছিয়ে থাকেন না খুচরা বিক্রেতাও। ফলে প্রতিটি স্তরে কিছু না কিছু মুনাফা যায় ভেজালকারীদের পকেটেÑ আর ভোক্তা প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছে নিজের স্বাস্থ্য, সর্বোপরি জীবনীশক্তি। 

অর্থনীতিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ভেজাল খাদ্যের বার্ষিক বাজারমূল্য আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থচক্র প্রতিদিন মানুষের পকেট থেকে টাকা নিয়ে তাদের শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। যদিও পরিস্থিতি ভয়াবহ, তবু আশার আলো আছে। সেফ ফুড বাংলাদেশ ও ভোক্তা অধিকার ক্লাবের মতো সংগঠন ভেজালবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের তৈরি ‘খাবার যাচাই’ অ্যাপে পণ্যের ব্যাচ নম্বর স্ক্যান করে দেখা যায় বিএসটিআই অনুমোদন। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হন। ভেজাল খাদ্যের কারণে গ্যাস্ট্রিক, ডায়রিয়া, লিভার ও কিডনি বিকল, হৃদরোগ, ক্যানসার, এমনকি স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী জটিলতাও বাড়ছে। কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ১৬ ভাগ মানুষ কিডনি রোগে ভুগছেন, যার অন্যতম কারণ রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিশুমৃত্যুর হার বেড়েছে এবং মানুষের প্রত্যাশিত আয়ু কমেছেÑ যার পেছনে ভেজাল খাদ্যের ভূমিকা বড়। রোগে আক্রান্ত মানুষদের চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যানুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের পরিবার প্রতিবছর ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

গত ২৯ অক্টোবর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) জানিয়েছে, দেশের বাজারে মথ নামের ডালের সঙ্গে কৃত্রিমভাবে হলুদ রঙ মিশিয়ে তা মুগ ডাল নামে বিক্রি করা হচ্ছে। এই রঙের নাম টারটাজাইন, যা খাদ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সংস্থাটির তথ্যমতে, গত অর্থবছরে দেশে মুগ ডালের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ মথ ডাল আমদানি হলেও বাজারে ‘মথ ডাল’ নামে কোনো পণ্য পাওয়া যায়নি। 

রাজধানীর ভাটারার মুদি দোকান কর্মচারী মোহাম্মদ রশিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গত মাসে বাসার সবাই মিলে বাজার থেকে দই আর মিষ্টি কিনে খেয়েছিলাম। পরদিন সকালেই আমার পেটব্যথা, বমি আর জ্বর উঠল। ডাক্তার বললেন, খাবারে কেমিক্যাল মেশানো ছিল। তিন দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। পাঁচ হাজার টাকার ওপরে আমার ক্ষতি হয়। 

এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবিদুল রহমান বলেন, ক্যাম্পাসের পাশের দোকান থেকে প্রতিদিন ভাজা পুরি খেতাম। কিছুদিন আগে সেই পুরি খাওয়ার পর প্রচণ্ড গ্যাস্ট্রিক আর ডায়রিয়ায় ভুগেছিলাম। সেদিন আমার দুই হাজার টাকার মতো ব্যয় হয়েছিল। 

এই সংকটের মূলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা। ২০১৩ সালের খাদ্য নিরাপত্তা আইন, দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারা ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) প্রতিষ্ঠার পরও কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। জনবল সংকট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত ঘাটতির কারণে বিএফএসএ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। সর্বশেষ প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের বাজারে খাদ্য ভেজালের হার ৪০ শতাংশের কাছাকাছি, যা শহরে আরও বেশি। দুধ, মসলা, তেল, মিষ্টি, চিপস, এমনকি বোতলজাত পানীয়েও ভেজালের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।

গবেষক ও উন্নয়নকর্মী ড. মতিউর রহমান মনে করেন, খাদ্যে ভেজাল রোধ কেবল স্বাস্থ্যনীতির অংশ নয়Ñ এটি এক গভীর নৈতিক ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। তার মতে, নিরাপদ খাদ্যকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে। উন্নয়নের মানদণ্ড শুধু জিডিপি বৃদ্ধি বা অবকাঠামো নয়, বরং নাগরিকের নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিশ্চয়তার মধ্যেই প্রকৃত উন্নয়ন পরিমাপ করা উচিত। তিনি সতর্ক করে বলেন, খাদ্যে ভেজালের এই সংকট প্রশাসনিক ব্যর্থতার চেয়েও বড় একটি সামাজিক ও নৈতিক পরীক্ষা, যেখানে ব্যর্থতা উন্নত জাতি গঠনের স্বপ্নকেও ম্লান করে দেবে।

বিশ্লেষক শেখ ফয়সল আমীন বলেন, খাদ্যে ভেজাল রোধে শুধু অভিযানে নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও স্থায়ী তদারকি কাঠামোর। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসন, পরিষদ চেয়ারম্যান, পুলিশ, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যারা নিয়মিত নজরদারি চালাবে। পাশাপাশি ফরমালিন ও রাসায়নিক দ্রব্যের আমদানিকারক, বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল ও চা প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মোজাম্মেল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ভেজাল খাবার নিয়মিত খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ে এবং ভালো কোলেস্টেরল কমে যায়, ফলে হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও হজমে সমস্যা, অরুচি, বুক জ্বালাপোড়া, পেট ও শরীর ফুলে যাওয়া দেখা দেয়। ফলে হাসপাতাল, ডাক্তারকে টাকা দিতে হয়। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা