ড. মো. জিল্লুর রহমান
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ২১:১১ পিএম
আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ২২:০১ পিএম
ড. মো. জিল্লুর রহমান।
বাংলাদেশ তথা এ অঞ্চলের ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে ভূমিকম্পের তথ্য মিলে ১৫৪৮ সাল থেকে। তবে সেই ভূমিকম্পের মাত্রা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের কোন তথ্য নেই। আজ শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০.৩৮ মিনিটে ঢাকার অদূরে নরসিংদীর মাধবদীতে সংঘটিত ভূমিকম্পটি রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.৭ ও মার্কিন ভূতত্ত্ব কেন্দ্রের তথ্যে ৫.৫। এটি হয়েছে ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে, আর স্থায়িত্ব ছিল ২৬ সেকেন্ড। মাধবদীর ভূমিকম্পটি বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্প হবে সেটির মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। কেননা আবহাওয়া অধিদপ্তর ৫.৭ মাত্রার কথা জানালেও আমার কাছে মনে হচ্ছে এটির মাত্রা আরও বেশি হবে। কারণ, আমাদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাতে তাই মনে হয়। নারায়ণগঞ্জের আশপাশে কয়েক বছরে আরও ছোট ছোট কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে।
আজকের (শুক্রবার) মাধবদীর ভূমিকম্পটি মাঝারি মানের। এটি নিয়ে আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। আগামীতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সেটা সামাল দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন। এ নিয়ে দেশে অনেক গবেষণা হয়েছে। রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) বর্তমানে যে বিল্ডিং কোড দিয়েছে তা অবশ্যই মানতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। নতুন ভবনের জন্য ৭ বা সাড়ে ৭ প্যারামিটার ইনটেনসিটির বিল্ডিং করতে হবে।
বাংলাদেশ থেকে যতটা পূর্ব দিকে যাওয়া যায় ভূমিকম্পের পরিমাণ ও মাত্রাও ততটা বাড়তে থাকে। আবার দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে সিলং হয়ে আসাম পর্যন্ত গেলেও পরিমাণ ও মাত্রা বাড়তে থাকে। এসব স্থানে ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়। যেসবের মাত্রা ৫, ৬ ও ৭।
বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ। এর কারণ হলো— এখানে ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান দুটি প্লেটের মুখোমুখি সংঘর্ষ। ইন্ডিয়ান প্লেটটি উত্তর-পূর্ব ইউরেশিয়ান প্লেটের দিকে বছরে প্রায় ৩৬ মিলিমিটার গতিতে এগিয়ে গিয়ে সংঘর্ষ হচ্ছে। ইউরেশিয়ান প্লেট উত্তর ও পূর্ব দুদিকেই আছে। উত্তরের প্লেটকে বার্মিজ প্লেট আবার কেউ কেউ সুনদ্রা প্লেটও বলে। এজন্যই এই অঞ্চল ভূমিকম্প প্রবণ। এখানে যে ভূমিকম্প হয় তা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে গেলে পরিমাণ ও তীব্রতা বাড়তে থাকে। আবার দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে গেলেও পরিমাণ ও মাত্রা বাড়তে থাকে। একটা জায়গায় গিয়ে পরিধি কমলেও মাত্রাটা থেমে যায় না। গত ২৮ মার্চে সেন্ট্রাল মিয়ানমার ফল্টে ভূমিকম্প হয়েছিল যাকে সেগাইন ফল্ট বলা হয়। সেগাইন ফল্ট উত্তর-দক্ষিণে। হিমালয়ের উত্তরপ্রান্ত থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
আসামে ১৯৫০ সালে ৮.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। আমাদের আশপাশে ৮.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়নি। ২০১৫ সালে নেপালে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এ বছর মিয়ানমারেও ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। ১৯৩৪ সালে নেপাল ও বিহারের মাঝখানে ৮ মাত্রার নিচে ভূমিকম্প হয়েছিল। সেগাইনে ১৯৪৬ সালে দুটি ভূমিকম্প হয়, তারমধ্যে ৭.৮ ও ৭.২ মাত্রার। ১৯৪৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৭৯ বছরের মধ্যে সেগাইনে কয়েকটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলেও বাংলাদেশে হয়নি। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। তবে এর মাত্রাটা আরও কম হবে। ১৮৮৫ সালে মানিকগঞ্জে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। ১৮৯৭ সালে শিলংয়ে ৮.১‘ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প পাওয়া যায় না। আমাদের ভূ-খণ্ডে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ ও মানিকগঞ্জে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পই তথ্যসম্পন্ন। তবে দেড়শ বছর আগে গাইবান্ধার দুবড়িতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। ১৬৬৪ সালের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পাল্টে যমুনা হয়ে গেছে বলা হলেও এটি নিয়ে দ্বিমত আছে। ১৭৬২ সালে আরাকানে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এটিতে চট্টগ্রামে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তাই গত ৪-৫ শত বছরের ভূমিকম্পে বাংলাদেশে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ১৮৯৭ সালের শিলংয়ের ৮.৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঢাকায় কিছু বিল্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমাদের দেশে ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি সেটির উদাহরণ হলো ঈসা খার রাজধানীর স্থাপত্যসহ বিভিন্ন স্থাপনা। কেননা এসব স্থাপনা ৪শ বছরের পুরানা। মনিপুর ও মিজোরামে বৌদ্ধদের অনেক প্যাগোডা ও অন্যান্য স্থাপত্য রয়েছে। সেগুলো হাজার বছরের স্থাপত্য কিন্তু ধ্বংস হয়নি। তার অর্থ হচ্ছে— বিগত ৫শ বছরে এ অঞ্চলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, চীন ও থাইল্যান্ডের চেয়ে বাংলাদেশ কম হেজার্ড বা বিপদাপন্ন। এসব দেশে যে মাত্রার ভূমিকম্প হবে বাংলাদেশে সেই মাত্রার ভূমিকম্প হবে না। অর্থাৎ ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা নেই তবে ৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হবে।
ভূমিকম্প নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো যাবে না এবং কেউ যেন আতঙ্কিত না হয়। ভূমিকম্পের সময় প্রত্যেককে ভবনের মধ্যেই থাকতে হবে। ভূমিকম্পের সময় বের হওয়া যাবে না। কেননা ভূমিকম্প হয় ১০-৩০ সেকেন্ড। মানুষকে সচেতন থাকতে হবে। গণমাধ্যমসহ সর্বস্তরে প্রচার চালিয়ে জনমানুষের মধ্যে ভূমিকম্প বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।