ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৪৫ এএম
আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:৩৯ পিএম
ছবি : প্রবা কোলাজ
দেশে শিক্ষার বিস্তার ও বিকাশে অনন্য ভূমিকা রাখছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এমন এক সময় ছিল যখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে শিক্ষার্থীরা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেন। কিন্তু বর্তমানে এ চিত্র পাল্টে গেছে। কেননা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও প্রত্যাশিত বিভাগ না পাওয়ায় এখন অনেকেই ছুটছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যেই পেরিয়ে এসেছে তিন দশকের বন্ধুর পথ; পরিণত হয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থার প্রতীকে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আর আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠার পথ মসৃণ ছিল না। দেশে ১১৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১০৫টি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ৫টি কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। তা ছাড়া সরকারের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির সুপারিশে বর্তমানে ইবাইস ইউনিভার্সিটি, কুইন্স ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ও দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিগন্ত উন্মোচন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাবেক পরিচালক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্যা মিয়ান। ১৯৮০-এর দশকে তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রাথমিক পরিকল্পনা করেন, যা ১৯৮৯ সালে একটি কার্যপত্রের রূপ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি পরিদর্শনের সময় ড. মিয়ান বাংলাদেশের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারণা কার্যপত্র প্রণয়ন করেন। এ নিয়ে তিনি সেখানে অর্ধশত শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। দেশে ফিরে তিনি ১৯৮৯ সালের ২৭ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রস্তাব জমা দেন। ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আইইউবিএটি যাত্রা শুরু করে। অধ্যাপক মিয়ানের প্রস্তাবের আলোকে নানা প্রক্রিয়া শেষে জাতীয় সংসদে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয় ১৯৯২ সালের ৫ আগস্ট। তখন আইইউবিএটি ওই আইনে নিবন্ধিত হয়। আইনটি পাস হওয়ার পর ১৯৯৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন হয়।
ইউজিসির তথ্যমতে, জনসংখ্যার অনুপাতে দেশে উচ্চশিক্ষার চাহিদার তুলনায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। সীমিত আসন সংখ্যা ও জাতীয় শিক্ষা বাজেটে উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ ঘাটতির কারণে উচ্চশিক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়। এ অবস্থা নিরসনে ইউজিসি ভারত, পাকিস্তান ও জাপানের আদলে সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ জারি করে। আইনটিতে ১৯৯৮ সালে কিছু সংশোধনী আনা হয়। পরে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৯৯২ সালের এ আইনটি রহিত করে ২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি নতুন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুমোদন করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সরকারের নীতি-সহায়তা
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজে ২০১৭-২০২১ সাল পর্যন্ত উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারিÑবেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীই বাংলাদেশের নাগরিক। তাই প্রথম কথা হচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে যে ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হয়, তা যৌক্তিক নয়। দ্বিতীয়ত. উন্নয়নের জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের তহবিল ব্যবহার করে থাকে। তবে গবেষণার জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া দরকার।’
তিনি বলেন, ‘বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী ভর্তি করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তাই সেগুলোতে সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এখানে মাস্টার্স করার অনুমতি দেওয়া হলেও পিএইচডি করতে দেওয়া হয় না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থীরা বাইরে থেকে বা সরকারি ফান্ড পায়; বেসরকারিগুলোতেও তা দেওয়া দরকার।’
ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৫ শতাংশ অর্থই সরকার দেয়। অপরদিকে বেসরকারিতে শতভাগ টাকা ছাত্রদের দিতে হয়। ছাত্রদের ফান্ড থেকে জাতীয় কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়। তাই জাতীয় কর্মসূচিগুলোর জন্য ইউজিসির মাধ্যমে বহন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রভাব খাটায়। অথচ তাদের কোনো সহযোগিতা নেই। রেগুলেট করার সঙ্গে সঙ্গে কনট্রিবিউশনও দরকার। সেটা হয় না বলেই অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসির কথা শোনে না।’
প্রতিষ্ঠানকে নয়, ছাত্রদের বরাদ্দ দিতে হবে
শিক্ষক, গবেষক ও নীতিনির্ধারক অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবেও। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি-সহায়তা নিয়ে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর নামি ও ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেসরকারি। হার্ভার্ট, এমআইটিসহ আমেরিকার প্রথম শ্রেণির ১০টিই বেসরকারি। অক্সফোর্ড-কেমব্রিজও বেসরকারি। ভারতেও বর্তমানে নামি-দামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ভর করে মোটা দাগে চারটি ফ্যাক্টরের ওপর, উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক. কোয়ালিটিসম্পন্ন শিক্ষার্থী থাকতে হয়। বাংলাদেশে এখনও বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। কেননা সেখানে বলতে গেলে শুধু থাকা-খাওয়ার টাকাটা জোগাড় করতে হয়। আবার হলে সিট পেলে থাকার জন্যও বেশি টাকা লাগে না। দুই. শিক্ষকের মান। দেশে এখনও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মান ভালো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রয়েছে উন্নতির পথে। তিন. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যয়বহুল। যেগুলো ভালো করছে যেমন, ব্র্যাক, নর্থসাউথ, আইইউবি, এশিয়া প্যাসিফিক ইত্যাদি ৮-১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে। এরা কিছু ভালো ছাত্র পাচ্ছে। চার. অন্যান্য ফ্যাসিলিটি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশনা গবেষণার ঘাটতি আছে, এ কথা জানিয়ে অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘আন্ডার গ্র্যাজুয়েট দিয়ে গবেষণা হবে না। এজন্য পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট দরকার। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণার ছাত্রছাত্রী কম। বেসরকারিতে এমএস আছে, পিএইচডি নেই। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি প্রোগাম চালুর অনুমোদন পেলেও তা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘ইংল্যান্ডে কোনো ছাত্র কোথাও ভর্তি হলে তার জন্য রাষ্ট্রের বরাদ্দ থাকে। তারা রিজিওনাল কাউন্সিল অনুযায়ী টাকা পায়। সেখানে যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যত আকর্ষণ করতে পারে, সরকার থেকে তত বেশি পরিমাণ অর্থ পায়। আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থীকে সরকার সরাসরি অর্থ বরাদ্দ করে না, বরাদ্দ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ ক্ষেত্রে সরকারি অনুদান বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দ না দিয়ে শিক্ষার্থীকে দিতে হবে। তা হলে সে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও সেই অর্থ পাবে। অর্থাৎ শিক্ষার জন্য সরকারি বরাদ্দ শিক্ষার্থীপিছু দিতে হবে; সে যেখানে পড়বে সেই প্রতিষ্ঠান সেটা পাবে।
কী বলছে ইউজিসি
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার অনুমোদন-সংক্রান্ত ড্রাফটের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে। এর পর এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে অনুমোদন হয়ে গেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিএইচডি ডিগ্রি দিতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার জন্য কিছু ফান্ড পায়। তবে রেগুলার ফান্ড পায় না। বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জন্য ১-৫ লাখ টাকার একটা বরাদ্দ পেয়ে থাকে। সেটি তারা পায় না।’
ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খবরদারি করলেও তাদের প্রতি তদারকি তেমন নেই কেন?Ñএ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীল হোক। গুণগত শিক্ষা বিস্তারে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করুক। কিন্তু দেখা দেখা যায়, সেসব প্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব, অধ্যাপকের অভাব। চিকিৎসা, লাইব্রেরিসহ অন্যান্য যেসব ফ্যাসিলিটি থাকা দরকার, তা বেশিরভাগেরই নেই। অথচ ভালো মানের প্রতিষ্ঠান হতে হলে এগুলো কিন্তু দরকার। তা ছাড়া হিপ প্রকল্প থেকে আমরা যে অনুদান দিয়ে থাকি, সেখানে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’