আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৫ ১০:০৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ব্যাংকে ভিড় বেড়েছে আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের। উদ্দেশ্য ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) ক্লিয়ারেন্স। এবারের নির্বাচনে কোনো প্রার্থী ঋণখেলাপি থাকলে তালিকা থেকে বাদ পড়বেন তিনি। তাই প্রার্থিতা বৈধ রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকে দৌড়ঝাঁপ করছেন তারা।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণখেলাপির দায় এড়াতে আদালত থেকে সাময়িক স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) এনে অস্থায়ী স্বস্তি নিচ্ছেন অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন চাইলে আর্থিকভাবে দায়মুক্ত ব্যক্তিরাই প্রার্থী হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলছেন, আগামী নির্বাচন হোক স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নৈতিক। অর্থনৈতিকভাবে দায়মুক্ত, সৎ মানুষরাই যেন প্রার্থী হতে পারেনÑ এটাই আমাদের লক্ষ্য। নির্বাচনের সময় খেলাপি বা ঋণবিভ্রাট সংক্রান্ত কোনো তথ্য গোপন না রাখতে ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, গত কয়েকদিনে বাংলাদেশ ব্যাংকে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের উপস্থিতি বাড়ছে। অনেকেই খেলাপি অবস্থা পরিবর্তনের অনুরোধ করছেন। আবার কেউ আদালতের স্টে অর্ডার নিয়ে এসে সাময়িকভাবে নিজেদের ‘নিয়মিত ঋণগ্রহীতা’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। তবে তারা বেশিরভাগই ব্যবসায়ী পরিচয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার কঠোর অবস্থানে থাকায় আগের মতো সুবিধা করা বা তথ্য বদলানোর সুযোগ পাচ্ছেন না নেতারা। ব্যাংকের কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে কাঙ্ক্ষিত অনৈতিক সুবিধা আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নির্বাচনের আগে এই চাপ সামাল দিতে তারা কঠোর মনিটরিং শুরু করেছে। ব্যাংকগুলোর পাঠানো ঋণতথ্য একটিও ভুল হলে তার দায় সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর আসবেÑ এ বিষয়ে তাদের কড়া সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
প্রকৃত ঋণখেলাপিরা আদালত থেকে স্টে অর্ডার পেলেও ব্যাংকগুলো তাদের এখনও খেলাপি হিসেবেই গণ্য করে। তবে নির্বাচনী বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এসব অস্থায়ী আদেশকেই গুরুত্ব দেয়। ফলে আদালতের স্টে যেন হয়ে ওঠে তাদের মুক্তির চাবিকাঠি, যার সুযোগ নিয়ে অনেক খেলাপি ঋণধারীও নির্বিঘ্নে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, কারও নামে খেলাপি ঋণ থাকলে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে অবশ্যই সেই ঋণ পরিশোধ বা নবায়ন করতে হয়। সময়মতো নবায়ন সম্পন্ন হলে প্রার্থিতা বাতিলের ঝুঁকি থাকে না। এতে আইনগত ধারা কঠোর হলেও স্টে অর্ডারের সুযোগকে কেন্দ্র করে বাস্তবে খেলাপি ঋণধারীরাও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বৈধভাবে জায়গা করে নিতে পারছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গত তিন-চার মাসে এ ধরনের রিট বা স্টের সংখ্যা তিনশর ওপরে। বর্তমানে প্রতিদিনই ১৫-২০টি পর্যন্ত স্টে অর্ডার নিয়ে আসছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কোনো কোনো স্টে অর্ডারে সরাসরি সিআইবি থেকে নাম ব্লক করে দেওয়ার কথাও উল্লেখ থাকে। কোনো অর্ডারে আবার এক মাস থেকে ছয় মাসের জন্য স্টে করা থাকে। আদালতের রায়ের ওপর ব্যাংকের আসলে কিছুই করার থাকে না। তবে ব্যাংক চেষ্টা করে আইন বিভাগের মাধ্যমে সমাধান বা আইনি পদক্ষেপের। একইভাবে ব্যাংকগুলোকেও বলা হয় আইনি পদক্ষেপ নিতে।
সিআইবি বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, আদালত নির্দেশ দিলে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণকে স্ট্যান্ডার্ড দেখাতে বাধ্য। ব্যাংকগুলোর বার্ষিক রিপোর্টের মন্তব্য কলামে লিখতে হয় ‘রিটের কারণে স্ট্যান্ডার্ড’। এতে বড় ঋণগ্রহীতাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও আড়ালে পড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, তফসিল ঘোষণার কমপক্ষে সাত দিন আগে প্রার্থীদের সিআইবি রিপোর্ট একেবারে ক্লিন থাকতে হবে। সেজন্য ব্যাংকগুলোকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তথ্য যাচাই ও হালনাগাদ রাখতে বলা হয়েছে। আমরা চাই নির্বাচন হোক স্বচ্ছ ও নৈতিক। তাই ভুল তথ্যের কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছেÑ ঋণতথ্য আপলোডে কোনো ভুল, গাফিলতি বা তথ্য বিকৃতির ঘটনা বরদাশত করা হবে না। সঠিক তথ্য আপলোডে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং প্রয়োজন হলে চাকরিচ্যুতি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. আনিসুর রহমান সম্প্রতি সব তফসিলি ব্যাংককে স্পষ্ট নোটিস দিয়েছেন। এতে বলা হয় ‘গ্রাহকের ঋণতথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও আপলোড করতে হবে। তথ্য যেন কোনোভাবেই বিকৃত বা ভুল না হয়।’
গত ২৯ অক্টোবর ও ৩ নভেম্বর দুই দফায় মোট ৯৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ডেকে নির্বাচনের আগে সিআইবি তথ্য হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বিশেষ করে যারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, তাদের তথ্য শতভাগ নির্ভুল রাখতে হবে। ভুল পাওয়া গেলে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রার্থিতা বাতিল হবে কি না, এটা নির্ধারণের একমাত্র ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের। তবে আমরা সবসময় ব্যাংকগুলোকে বলি বাজারে টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো ঋণ আদায়। খেলাপিরা যদি নিয়মিত রি-শিডিউল না করে কেবল স্থগিতাদেশের মাধ্যমে রেহাই পেতে থাকে এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে সেটিই ব্যাংকের প্রকৃত ব্যর্থতা।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ১৫-২০ জন প্রার্থী আদালতের স্টে অর্ডার নিয়ে আসছেন। স্টে অর্ডার মানে খেলাপি থেকে বাঁচা নয়। রায় বদলালে আবার খেলাপি হবেন। ব্যাংক প্রভিশনও কমাতে পারে না। কেউ যদি মনে করেন কোর্টের আদেশে টাকা না দিয়েই পার পাওয়া যাবেÑ এটা ভুল ধারণা।’
জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যারা আসন্ন নির্বাচনে ঋণখেলাপি হবেন, তারা তো প্রার্থী হতে পারবেন না। তাই তাদের যাতে ঋণখেলাপি বলা না হয়Ñ এজন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে নীতিমালা আছেÑ সেটা মেনে যদি কাজ করা হয়, তাহলে যারা খেলাপি, তারা নির্বাচন করতে পারবেন না। এ বিষয়ে নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করলে ঋণখেলাপি কমবে।’
তিনি বলেন, ‘এতদিন বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর ছিল না, এজন্য খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এখনও যদি আগের পথে হাঁটে, তাহলে ব্যাংক তো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। প্রার্থীদের ঋণতথ্য প্রদানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন চাইলে আর্থিকভাবে দায়মুক্ত ব্যক্তিরাই প্রার্থী হওয়া উচিত। স্টে অর্ডারকে ঢাল বানিয়ে খেলাপি লুকানো বন্ধ করতে হবে।’