তানভীর হাসান
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:১৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা শাহজালাল ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজন্য রাজধানীর বাইরে থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের ঢাকায় আনা হয়েছে। এই কর্মীরাই গত কয়েকদিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে ভারী অস্ত্রও অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় আনা হয়েছে। আস্তানা হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে মিরপুর এলাকা। অভিযোগ উঠেছে, দেশের বাইরে থেকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করছেন আওয়ামী লীগ নেতা বাহাউদ্দিন নাছিম। সম্প্রতি গ্রেপ্তার এক নেতার কাছ থেকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এরপর পরই নড়েচড়ে বসেছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থা। এরই মধ্যে একজন ডিআইজির নেতৃত্বে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ৩০৭ সদস্য অপরাধীদের শনাক্তে মাঠে নেমেছে বলেও পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন সহিংসতা, অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের সব বিমানবন্দরকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। গত মঙ্গলবার বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ এ তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে বলেন, ‘দেশের বিমানবন্দরগুলোয় সতর্ক থাকার বিষয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছে বেবিচক।’
বেবিচকের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সব বিমানবন্দরের সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি, ভেহিক্যাল পেট্রোল, ফুট পেট্রোল বাড়ানোসহ মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।’
দেশে চলমান সহিংসতা ও নাশকতা প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশকে অস্থিতিশীল করতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকতার পরিকল্পনা করছে। তারা ঢাকার বাইরে থেকে বিশেষ প্রশিক্ষপ্রাপ্ত বাছাই কর্মীদের ঢাকায় এনেছে। সম্প্রতি ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারদের থেকেও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সেই তথ্য অনুযায়ী গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।’
এদিকে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগের এক নেতার মোবাইল ফোনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পায় গোয়েন্দা পুলিশ। তাতে দুই বিমানবন্দরে হামলার বিশেষ নির্দেশনার সঙ্গে কিছু ভারী অস্ত্রেরও ছবি পাওয়া যায়। ওই অস্ত্রগুলো অ্যাম্বুলেন্সেযোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে ঢাকায় এসেছে। এ ছাড়া শতাধিক বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের ঢাকার বিভিন্নস্থানে রাখা হয়েছে। এই কর্মীরাই বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুন দিচ্ছে।
গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এসব কর্মীদের জন্য আওয়ামী লীগের বিশেষ বরাদ্দ রয়েছে। বাসে আগুন দিলে জনপ্রতি ৫০, ককটেল বিস্ফোরণে ২০, মিছিলে অংশ নিলে ৫ ও ব্যানার ধরলে ৮ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে টাকার লোভে জেলা-উপজেলা পর্যায় থেকে এসে সাধারণ কর্মীরা একটি ঘটনা ঘটিয়ে আবার ফেরত যাচ্ছে।’
ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘গত মাসের ১৬ তারিখে একটি বন্ধ অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি টাকা উঠানো হয়েছে। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে। বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকদের জানানো হয়েছে।’
গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের এক নেতা গ্রেপ্তার হওয়ায় অপরাধীরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। এর আগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের অবস্থানের যে তথ্য ছিল, সেখানে পুলিশ ব্লক রেইড দিলেও তাদের পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি অনুসন্ধান করতে ও অপরাধীদের শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছেন পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যরা। এজন্য একজন ডিআইজির নেতৃত্বে কাজ করছেন এসবির ৩০৭ সদস্য। তারা আলাদা আলাদা জোনে বিভক্ত হয়ে ১৯৯টি স্পটে কাজ করছেন। প্রতিটি জোনের দায়িত্বে রয়েছেন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের বিশেষ শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি সেনসেটিভ। তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’
জানা গেছে, গোয়েন্দা সংস্থার বার্তা পাওয়ার পরই হামলাসহ যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে সর্বোচ্চ সর্তক অবস্থানে রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। ইতোমধ্যে দেশের সব বিমানবন্দর, ঢাকার আদালত ছাড়াও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে রেলপথেও।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের কিছু নেতা দেশের বাইরে থেকে ফেসবুক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলছে। তাদের এসব ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাবার্তার কারণেই দেশের ভেতরে অগ্নিসংযোগ ও স্লোগান দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। তবে পুলিশ তৎপর থাকায় অপরাধীরা ধরা পড়েছে। যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড রুখতে আমরা সচেষ্ট।’
সরেজমিন গতকাল ঢাকার প্রবেশপথসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্টের মাধ্যমে তল্লাশি কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছেÑ পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও সশস্ত্র বাহিনীর ৮ লাখের বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে। এদিকে নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এমন সন্দেহে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৪৪ নেতাকর্মীকেও গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ছাড়া সারা দেশে জেলা-উপজেলা, বিভাগীয় শহর ও মেট্রোপলিটন এলাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তারে মাঠে অভিযান জোরদার করেছে। পুলিশের পাশাপশি বিজিবি, আনসার এবং সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা মাঠে টহল ও তল্লাশিতে রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন্স) রেজাউল করিম জানান, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মসূচির নামে যাতে কোনো নাশকতা করতে না পারে এজন্য সারা দেশে বিভাগীয় শহর জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে পুলিশকে সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনসাধারণের নিরাপত্তায় পুলিশের সব ইউনিট একযোগে কাজ করবে। কেউ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টির চেষ্টা করলে ছাড় দেওয়া হবে না। সরকার আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, নিষিদ্ধ দলের কোনো ধরনের নাশকতা তৈরির সুযোগ নেই।’