× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্থিরতা

তানভীর হাসান

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৬ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে আন্ডারওয়ার্ল্ড। দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা। আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণকারী শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্দেশে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক কারবারের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে খুনোখুনি পর্যন্ত করছে তাদের ক্যাডাররা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হচ্ছে কিশোর গ্যাং সদস্যদের। এরই মধ্যে মিরপুরে গড়ে উঠেছে নতুন একটি আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্রুপ ‘ফোর স্টার’। এই গ্রুপের দাপটে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে মিরপুরের বাসিন্দারা। এ ছাড়া জামিনে মুক্ত হয়ে মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মতিঝিল, মগবাজার ও পুরান ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পুরস্কার ঘোষিত কয়েক শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাদের রেষারেষির জের ধরে গতকাল সোমবার আদালতপাড়ায় খুন হয়েছেন তারিক সাঈফ মামুনÑ পুলিশের খাতায় যিনি নিজেও এক শীর্ষ সন্ত্রাসী। এর আগেও তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইমন গ্রুপের সদস্যরা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে আমাদের দুই ধরনের পুলিশিং ব্যবস্থা চলমান আছে। আমরা গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছি। এ ব্যাপারে নানামুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতার বিষয়টি সামনে এসেছে। বিভিন্ন তথ্য যাচাইয়ের পর দ্রুতই অ্যাকশনে যাবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছর গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসী আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন, খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু ও আরমান কারাগার থেকে মুক্তি পান। ইতোমধ্যে মোল্লা মাসুদও দেশে ফিরে আসেন ভারত থেকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরেন আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর। তারা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। জেলে থাকা অবস্থায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্দেশে তাদের যেসব শিষ্য ক্যাডাররা চাঁদা তুলত তাদের নিয়ে আলোচনায় বসেন তারা। কিন্তু ক্যাডারদের কাছে এলাকাভিত্তিক টাকা আদায়ের তালিকা ও হিসাব চাওয়ার পর থেকেই দেখা দেয় অন্তর্দ্বন্দ্ব। বেশিরভাগ ক্যাডারই চাঁদার ভাগ দিতে রাজি হলেও এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণভার ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে গ্রুপ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। ফলে বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দল-উপদল। আন্ডারওয়ার্ল্ডে শুরু হয় অস্থিরতা।

এরই ধারাবাহিকতায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ ও ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল গ্রুপের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির খবর বারবার সামনে চলে আসে। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে কুষ্টিয়া থেকে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। নজরদারিতে রাখা হয় আরও কয়েকজনকে। বিষয়টি টের পেয়ে দেশ ছাড়েন পিচ্চি হেলাল। যদিও এর আগেই তাকে দুই দফা হত্যার চেষ্টা চালায় ইমন গ্রুপের সদস্যরা। একইভাবে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তেজগাঁও সাত রাস্তায় (গতকাল সোমবার আদালতপাড়ায় নিহত) মামুনকে লক্ষ্য করেও গুলি করে ইমন গ্রুপের সদস্যরা। তখন ইমন কারাগারে বন্দি ছিলেন। ওই ঘটনায় তারিক সাইফ মামুন আহত হলেও নিহত হন পথচারী ভুবন চন্দ্র শীল। এ ঘটনার পর আত্মগোপনে চলে যান তারিক সাঈফ মামুন। বাড্ডা এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করেন। গতকাল আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে আদালতপাড়ায় নিহত হন তিনি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সূত্রমতে, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও মামুন একসময় হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। তাদের গড়ে তোলা বাহিনীর নাম ছিল ‘ইমন-মামুন’ বাহিনী। তারা দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি। তবে একপর্যায়ে পরস্পরের সহযোগী এই দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। দীর্ঘ ২৪ বছর জেল খাটার পর ২০২৩ সালে মামুন জেল থেকে বের হন এবং এলাকায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ইমন। গত ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন মামুনকে খুন করতে। পুলিশের একটি সূত্র জানাচ্ছে, গতকাল মামুন হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় দুজন। কিন্তু ব্যাকআপ ক্যাডার হিসেবে আরও অনেকেই ছিল। ইমনের সহযোগী হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার একটি গ্রুপ এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

সূত্রমতে, রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে ঘটছে নতুন মেরুকরণ। একদিকে জেল থেকে বের হয়ে অথবা দেশে ফিরে এলাকায় পুনরায় একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। অপরদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুপস্থিতিতে তাদের নির্দেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে তাদের যেসব ক্যাডার এলাকার নিয়ন্ত্রণভার নেওয়ার স্বাদ পেয়েছে, তারা আর চাইছেন না কর্তৃত্ব ছেড়ে দিতে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সময়ের দলছুট ক্যাডারদের কাছে টেনে নিচ্ছেন গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তি পাওয়া ও দেশে ফেরা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা, বাড়তি চাঁদার ভাগ ও অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে তুলে দেওয়া ছাড়াও বিভিন্ন প্রলোভন দেখানো হচ্ছে তাদের। এ প্রক্রিয়াতেই মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন, ইব্রাহিম, শাহাদাত ও মুক্তার মিলে গড়ে তোলে ‘ফোর স্টার গ্রুপ’। এই সন্ত্রাসী গ্রুপটির গডফাদাররা বিদেশে থাকলেও তাদের হয়ে দেশে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কাজ করছে প্রায় ১০০ স্থানীয় সন্ত্রাসী। সম্প্রতি ৫ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে মিরপুরের পল্লবী থানাধীন সাগুফতা এলাকার একে বিল্ডার্সে হামলা করে সন্ত্রাসী মামুনের ক্যাডাররা। হামলাকারীদের বেশিরভাগই উঠতি বয়সি তরুণ, কিশোর গ্যাং সদস্য। সবার হাতেই ছিল দেশি-বিদেশি অস্ত্র। একইভাবে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ভাসানটেকে বেলায়েত হোসেনের বাড়িতে তাণ্ডব চালায় কিলার ইব্রাহিম বাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়াও আগারগাঁও এবং কাজিপাড়া-শেওড়াপাড়া এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ-প্রকাশের নাম বলে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাচ্ছে থানা পুলিশ।

পুলিশের একটি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত শুধু মিরপুর জোনে হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত্ ৪০ জন। এর মধ্যে শুধু পল্লবীতেই খুন হয়েছে ১৫ জন। এ ছাড়া মিরপুর মডেল থানায় ৯টি, দারুস সালামে ৭টি, কাফরুলে ৩টি, ভাসানটেকে ২টি, শাহ আলীতে ২টি, রূপনগরে ২টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ফোরস্টার ও বিকাশ-প্রকাশের নাম আসছে বলে জানা গেছে। সূত্রমতে, মামুনের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১২, পল্লবী, বাউনিয়া ও সাগুফতা, ইব্রাহিমের নিয়ন্ত্রণে, মিরপুর ১৩, ১৪, ভাসানটেক ও কালশী, শাহাদাতের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১, ২, ৬ ও ৭, সর্বশেষ মুক্তারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিরপর ১০ ও ১১। এসব এলাকার চাঁদাবাজি, মাদক কারবার থেকে শুরু করে হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা তারা করছে না। যদিও এসব নিয়ে ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চায় না। মিরপুরের মামুন বাহিনীর হয়ে দেশের মাটিতে তার অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে তারই বড় ভাই জামিল, ছোট ভাই মশিউর, রফিকুল, শহিদুল, নাটা আলমগীর, কালা মোতালেব, দেলোয়ার হোসেন রুবেল, রাজন, সানি, ভাগ্নে মামুন, সোহেল ও কায়েস। কিলার ইব্রাহিমের হয়ে কাজ করছে, যুবরাজ, সাবু, শাকিল, ভাগ্নে সোহেল, কালা ইব্রাহিম ও জনি। শাহাদাতের হয়ে টিপু সুমন, ফিটিং শিশির, বিহারি নিলা, প্রচার সাইফুল, পিচ্চি আলামিন, শামিম কাজ করছে। মুক্তারের হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে হাড্ডি সোহাগ, নওশাদ, আশিক, ডাসা শরিফ, এলেক্স জুয়েল, শুটার জাকির, তপু, আমিন, রকি, ছোট রাকিব, শাহাপরান, মিঠু, আতিকসহ আরও অনেকে।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি সূত্রমতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া অনেক অত্যাধুনিক ও ক্ষুদ্র অস্ত্রই এখনও উদ্ধার হয়নি। বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান গোপনে প্রচার চালাচ্ছে যে, এসব অস্ত্র তাদের হেফাজতে আছে এবং তা তাদের নিজস্ব ক্যাডারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। উঠতি অনেক ক্যাডার অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে পাওয়ার মোহে এদের দলে ভিড়তে চাইছেন বলে জানা গেছে। 

ওই সূত্রমতে, মালয়েশিয়া থেকে রাজধানীর ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও হাজারীবাগ এলাকায় সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করছেন সানজিদুল ইসলাম ইমন। মোহাম্মদপুর ও আশপাশ এলাকায় নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী চালাচ্ছেন পিচ্চি হেলাল। ইতোমধ্যে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও খুনোখুনিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ইমন, পিচ্চি হেলাল এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও জিডি হয়েছে। গত বছর ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই ইমন ও পিচ্চি হেলাল বাহিনীর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলছে। একপর্যায়ে পিচ্চি হেলাল দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় মোহাম্মদপুরের নিয়ন্ত্রণও চলে গেছে ইমনের হাতে। ধারণা করা হচ্ছে, গতকাল তারিক সাঈফ মামুন হত্যার পর ফার্মগেট এবং মগবাজারও ইমনের ক্যাডাররা নিয়ন্ত্রণ করবে। সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তারের পর মামুন ওইসব এলাকার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছিলেন। ওদিকে ক্লাবপাড়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান গ্রুপের সদস্যরা। আগামীতে এই দ্বন্দ্বে আরও খুনোখুনির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা