বন্দরনগরী
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৫ ১০:২৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বায়েজিদ বোস্তামী, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশসহ পুরো চট্টগ্রাম নগরবাসীর কাছে কয়েকটি নাম আতঙ্কের। বন্দরনগরীর অপরাধজগৎ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে তাদের অনুসারীরা। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চলছে দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস। তবে ভয়ে কেউই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করার সাহস করেন না। অপরাধ বিশ্লেষকরা চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই দৌরাত্ম্যকে ভয়ের অপ-সংস্কৃতি হিসেবেই দেখছেন। তারা বলছেন, তিন স্তরে কাজ করা অপরাধী চক্রটির একেবারে নিচের স্তরকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই সমাধান মিলতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধী চক্রের নিচের স্তরকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই চক্রটির মাঝেও পাল্টা ভয় ঢোকানো সম্ভব। আর তাতেই মিলবে মুক্তি।
জানা গেছে, সাজ্জাদ হোসেন খান (বড় সাজ্জাদ), সাজ্জাদ হোসেন (ছোট সাজ্জাদ) ও সরোয়ার হোসেন বাবলাÑ এই তিন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে তাদের অনুসারীরা চট্টগ্রামের অপরাধজগতে দাপিয়ে বেড়ান। একসময় চট্টগ্রামে আন্ডারওয়ার্ল্ডে চরম নৈরাজ্য থাকলেও মাঝের ৭-১০ বছর একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিল গ্রুপটি। এই গ্রুপকে নিষ্ক্রিয় করায় সে সময় পুলিশকে সহযোগিতা করেছিলেন সরোয়ার হোসেন বাবলা। এই কারণেই বাবলাকে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী খোন্দকিয়া পাড়ায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থীর গণসংযোগে এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেন বাবলা। আহত হন এরশাদ উল্লাহসহ চারজন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের পর নগরীর চান্দগাঁও র্যাব ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে, সরোয়ারকেই গুলিটা করা হয়েছে। যেহেতু তার ঘাড়ের মধ্যেই অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে এবং এরশাদ সাহেব খুব কাছাকাছি ছিলেন, যে কারণে তার গায়েও গুলি লেগেছে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার মামলার আসামি শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ হোসেন খান ও হাবীব খান। বিদেশে বসে দ্বিতীয় স্তরের মাধ্যমে লক্ষ্য স্থির করে তৃতীয় স্তরের মাধ্যমে ভয়ের এই ব্যবসা চালু রেখেছে চক্রটি। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় স্তরে আছে কিছু হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল। যাদের কাজ তথ্য সরবরাহ ও নেটওয়ার্কিং। আর তৃতীয় স্তরে কিলার গ্রুপ, যারা আসে অভ্যাসগত অপরাধী শ্রেণি থেকে। সরল ভাষায় এরা টোকাই।
মাঝের সময়ে এই চক্রটিকে নিষ্ক্রিয় করতে ভূমিকা রাখা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সরোয়ার মূলত পুলিশকে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছিলেন। এর অংশ হিসেবে তিনি জেলে যান। তবে জেল থেকে বেরিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়াননি। তবে তার যে পরিচিতি ছিল, সেটাকে কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যবসা তিনি হাত করে নিয়েছিলেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাজ্জাদ হোসেন খানের এই চক্র কীভাবে কাজ করে, সরোয়ার তার আদ্যোপান্ত জানতেন। ফলে কোথাও চাঁদাবাজির চেষ্টা হলে সেগুলো তিনি রুখে দিতেন। পুলিশকেও তথ্য দিতেন। এখান থেকে আর্থিক সুবিধাটা নেন মূলত সাজ্জাদ। হাবীব খান ফ্রান্সে থাকেন, তার ব্যবসাও আছেন সেখানে। কোনো পুঁজি কিংবা ঝুঁকি ছাড়াই বিদেশে বসে এই পদ্ধতিতে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন তারা।’
কীভাবে কাদের লক্ষ্য করে এই চক্র কাজ করে, এই বিষয়েও জানা যায় এই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে। তিনি বলেন, ‘প্রবাসী ব্যবসায়ীরাই এদের মূল টার্গেট। এই চক্রের নিয়ম হলো, বিদেশ থেকে ফোন করে সাজ্জাদ টাকা চাইবেন। দিতে রাজি না হলে প্রথমে বলবেন তার গাড়ি বা বাড়িতে ঢিল পড়বে, পরের ধাপে আগুন দেবেন বা গুলি করবেন। যেগুলো করা হবে বলা হয়, সেগুলো কিন্তু করেও দেখানো হয়। এটা করে টোকাই শ্রেণি। এখন কাকে ফোন দেওয়া হবে, সে বিষয়ে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ যারা করে, তাদের চেনা খুব কঠিন। এখানে পেশাজীবী, ব্যবসায়ীসহ সমাজের সম্মানিত অনেক মানুষের বড় একটা চেইন রয়েছে। তারাই লক্ষ্য ঠিক করে দেন, তথ্য দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ধরুন নির্মাণসামগ্রীর দোকানগুলোতে তাদের লোক আছে। বাড়ি করতে গেলে আপনি এসব কিনবেন। ফলে ওই দোকানগুলো থেকে তথ্য যায় কে কোথায় বাড়ি করছে। সেখান থেকে তথ্য নিয়েই এরা কল করে। টোকাইদের দিয়ে আগুন দেন, ভয় দেখান, গুলিও করেন। অথচ এই টোকাইদের বড় অংশই জানে না, তারা কেন কার জন্য কাজটি করছে। তাদের শুধু বলা হয়, এই কাজ করবি, বিনিময়ে ৫ হাজার টাকা পাবি। তারা সেটা করে।’
তিনি বলেন, ‘দেখুন প্রথমে এসব কাজ সরোয়ার করতেন। তিনি যাওয়ার পর ছোট সাজ্জাত এলেন। এখন তিনি জেলে যাওয়ায় রায়হান আর ইমন সামনে এলেন। এখানে সাজ্জাদ, রায়হান বা ইমন বানানো তো বন্ধ করা যাবে না। এটা একটা চেইনের মাধ্যমে উঠে আসে। অনেক সময় হোয়াইট কালার ক্রিমিনালরাও প্রথম স্তরকে নতুন মুখের সন্ধান দেন।’
সাম্প্রতিক সময়ে এই দ্বন্দ্বে একসময়ের আলোচিত শিবির ক্যাডার নাসিরের নামও এসেছে। তবে এটাকে খুব প্রাসঙ্গিক মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এটি মূলত সাজ্জাদ হোসেন খানের যে চক্র, তাদের ভেতরের দ্বন্দ্ব। যে চক্রটি সরোয়ার ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি বালুমহাল দখলে সরোয়ার ও নাসির একসঙ্গে কাজ করেছেন এমন একটি আলাপও আছে। বাকলিয়া এলাকার যে বালুমহালের কাছেই একবার সরোয়ারকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়, সেখানে তার দুই সহযোগী মারা গেলেও সরোয়ার প্রাণে বেঁচে যান। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ওই বালুমহালের কাছে একজন নেতার জায়গা আছে। জেলে থাকার সময় বালুমহালের পাশে জায়গা থাকা সেই নেতার সঙ্গে সরোয়ার ও নাসির দুজনেরই সম্পর্ক হয়। পরে বালুমহালে নিজের দখল প্রতিষ্ঠায় ওই নেতা এ দুজনের সাহায্য চান। এতে তারাও সে ব্যবসায় যুক্ত হন।’
পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন আসলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের খুব বেশি সুযোগ নেই। কারণ তারা যেটা করছেন, এটা তিন স্তরের একটা ভয়ের ব্যবসা। যেখানে কাজে লাগানো হয় অভ্যাসগত কিছু অপরাধীকে। যাদের স্বার্থে এটা হয় বা যারা নিয়ন্ত্রক, তারা কিন্তু সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের পেছনে ছুটে লাভ নেই। কিন্তু যারা মাঠে কাজ করেন অর্থাৎ তৃতীয় স্তর। এই স্তরের মধ্যে পাল্টা ভয় সৃষ্টি করাই একমাত্র সমাধান। এখন সেটা কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এর বিকল্প নেই।’