× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রশাসনের অন্দর চিত্র

মোখলেস গেলেও তার সিন্ডিকেট বহাল

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৫ এএম

মোখলেস গেলেও তার সিন্ডিকেট বহাল

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৫ মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ঘিরে বারবার উঠেছে বিতর্ক। নানা কারণে সমালোচিত সাবেক সিনিয়র সচিব মোখলেস উর রহমানকে অন্যত্র বদলি করা হলেও বদলায়নি প্রশাসনের অন্দরের চিত্র। সাবেক সচিবের ‘সেই সিন্ডিকেট’ এখনও নিয়ন্ত্রণ করছে নিয়োগ পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগ (এপিডি)। গত এক বছরে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে বিশেষ দলের অনুগত কর্মকর্তাদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। 

একসময় জনপ্রশাসন সচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকা মোখলেসের আমলে যে প্রশাসনিক ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছিলÑ সেটি আজও অদৃশ্যভাবে প্রভাব বিস্তার করছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। নতুন এপিডি হিসেবে যে কর্মকর্তাকে পদায়ন করা কথা ছিল তাদের ঘোর আপত্তিতে ওই কর্মকর্তাকে পদায়ন করা সম্ভব হয়নি। অবশেষ সিনিয়র সচিবকেই এপিডি উইংয়ের দায়িত্ব নিজের কাছে রাখতে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। শুধু তাই নয়, জনপ্রশাসনে সেই সাবেক সচিবের পুরনো কাঠামো ভাঙা সম্ভব হয়নি। আগের মতোই অঘোষিত সিন্ডিকেট দ্বারাই জনপ্রশাসনের এপিডি উইং পরিচালিত হচ্ছে। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন। জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে পুরনো সিন্ডিকেটের প্রভাব থাকলে সরকারি সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা আসবে না। যত দ্রুত সম্ভব এপিডি উইংসহ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। 

একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে অন্যত্র বদলি হয়ে জনপ্রশাসন সচিব শুধু অফিস ছেড়েছেন। কিন্তু রেখে গেছেন এমন এক নেটওয়ার্ক, এখনও মন্ত্রণালয়ের মূল চাবিকাঠি তাদের হাতেই। গত এক বছরের বেশি সময় একটি বিশেষ দলের অনুগত কর্মকর্তারাই বিভিন্ন শাখায় দায়িত্বে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা নতুন সচিবকে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে দলনিরপেক্ষ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের গুরুত্বহীন পদে পাঠাচ্ছেন। এমনকি সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়ের বদলি বা প্রেষণও তাদের সবুজ সঙ্কেত ছাড়া ছাড়া সম্ভব নয়। তাই নিয়মতান্ত্রিক পদায়ন এখন অতীত। কে কোন রাজনৈতিক দলের অনুগত বা কারও সঙ্গে ব্যক্তি সখ্য রয়েছে কি না সেটিই মূল বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। এমনকি দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগেও যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ হন, তারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

বিশেষায়িত ক্যাডার বনাম প্রশাসন ক্যাডার

অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, বর্তমানে একজন বিশেষায়িত ক্যাডার থেকে প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত হওয়া এক কর্মকর্তা জনপ্রশাসনে পদায়ন হয়ে এসেছেন। ছাত্রজীবনে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন বলে নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকেন। স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, কৃষি ও সড়ক পরিবহন এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে তারই সাবেক ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদায়ন পাচ্ছেন, যা এখন ‘টক অব দ্য সচিবালয়’। এতে প্রশাসন ক্যাডারের অভ্যন্তরে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। সর্বত্রই এই বিশেষ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দাপট চলছে। এখন প্রশাসন চালাচ্ছেন একদল ‘অদৃশ্য’ কর্মকর্তা। যাদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রশাসনিক আনুগত্য দুটোই স্পষ্ট। 

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব

অভিযোগ রয়েছে, বিগত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব কর্মকর্তা পদোন্নতি ও পদায়ন পেয়েছিলেন, তারাই আবার সুবিধা নিয়ে চলছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরও সেই চক্রের কর্মকর্তারা পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছেন গত এক বছরের বেশি সময় থাকা সাবেক সচিবের রেখে যাওয়া আস্থাভাজনদের দৃঢ় প্রভাব। এপিডি উইং এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে পদায়ন কিংবা পদোন্নতিÑ সবকিছুই নির্ধারিত হচ্ছে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আনুগত্যের ভিত্তিতে। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) সভায় রাজনৈতিক তকমা না থাকলে পদোন্নতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই যোগ্যতা নয়, সম্পর্কই এখন পদোন্নতির চাবিকাঠি।

আটকে আছে ২০তম ব্যাচের পদোন্নতি

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এখন বিসিএস প্রশাসন ২০তম ব্যাচের অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি বিলম্ব। একের পর এক এসএসবি সভা হলেও যথাযথ সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই আটকে গেছে পদোন্নতি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আদৌ পদোন্নতি হবে কি না সে বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীলদের কেউ নিশ্চিত করতে পারছেন না। 

জানা গেছে, বিসিএস প্রশাসন ২০ ব্যাচের অধিকাংশ কর্মকর্তা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। বিগত আমলে তাদের অধিকাংশই জেলা প্রশাসক (ডিসি) ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে এখন তাদের পদোন্নতি না দেওয়ার পক্ষে সরকারের একটি পক্ষ। আবার আরেক পক্ষ মনে করছেন, পেশাদারত্ব যাদের মধ্যে রয়েছে, বা দলনিরপেক্ষ তাদের পদোন্নতি দেওয়া উচিত হবে। ফলে ২০ ব্যাচের পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতায় আটকে থাকছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যারা দলনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত, তাদের শতভাগ পদোন্নতি নিশ্চিতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। বাকিদের ফাইল ‘তদন্তাধীন’ বলে রেখে দেওয়া হয়। ফলে পদোন্নতি প্রত্যাশী দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। 

২৪ ব্যাচের বঞ্চিতরা এখনও বঞ্চিত

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত বিসিএস ২৪তম ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পাননি। যৌক্তিকতা তুলে পদোন্নতি পেতে এসএসবির সভাপতি তথা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি এসএসবি। শুধু তালিকা প্রস্তুত করা ও কর্মকর্তাদের আশ্বাস দিয়ে সময় পার করে দেওয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বড় মাপের পদোন্নতির সময়ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়। বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে ভুক্তভোগীদের আশ্বস্ত করেছিল সরকার। কিন্তু জনপ্রশাসনের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কারণে তাদের পদোন্নতিও সুতোয় ঝুলছে। 

সতর্কবার্তা

সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জনপ্রশাসন রাষ্ট্র ও সরকারের মেরুদণ্ড। এখানে যদি দলীয় প্রভাব, সিন্ডিকেট সংস্কৃতি ও পক্ষপাতিত্ব স্থায়ী হয়, তাহলে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ধসে পড়বে। নির্বাচনের আগে প্রশাসনকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। 

তিনি বলেন, যে এপিডি উইং আজও আগের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে, সেটি বদলে না দিলে পরিবর্তনের আশা করা বৃথা। অন্তর্বর্তী (নির্দলীয়) সরকারের সময়ও যদি আমলাতন্ত্র নির্দলীয় না হয়, তবে জনগণের আস্থা হারাবে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা।

নির্বাচনের আগে পরিবর্তন জরুরি

জনপ্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা ও সিন্ডিকেট প্রভাব এখন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এমন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্ট মহল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই এপিডি উইং ও গুরুত্বপূর্ণ শাখায় রদবদল না হলে নির্বাচনের আগেই প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাদের মতে, নির্দলীয় সরকারের মূল শক্তি হলো একটি নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র। আর সেই নিরপেক্ষতাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ করছে জনপ্রশাসনে ‘মোখলেস সিন্ডিকেট’-এর ছায়া।

সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে জনপ্রশাসন এখন গভীর নৈরাজ্যের মুখে। একদিকে পুরনো সিন্ডিকেট, অন্যদিকে একটি বিশেষ মহলের প্রভাব। ফলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। যদি জনপ্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ পুরনো সিন্ডিকেটের হাতেই থাকে, তবে নিরপেক্ষ সরকারের পুরো দর্শনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা