হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:১৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে নভেম্বরে এসে ভয়াবহ প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বর। সারা দেশে প্রতিদিনই যেমন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, তেমনই বাড়ছে মৃত্যুও। চলতি বছরের জুন মাস থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ যে উচ্চ হারে বাড়তে শুরু করেছে, তা যেন এখন মাত্রা ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, নভেম্বরের পঞ্চম দিন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ১৩০ জন আর মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। আক্রান্তের এই হার গত অক্টোবরের প্রথম ৫ দিনের চেয়ে দ্বিগুণ এবং মৃতের সংখ্যায় ১ দশমিক ৭১ গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের যেকোনো মাসের প্রথম পাঁচ দিনের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃতের হার কয়েকগুণ বেশি, যা জনমনে ভয়াবহ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আরও বাড়বে। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে। তাই দেশবাসীকে লক্ষণ দেখা দিলেই ঠিক সময়ে ডেঙ্গু টেস্ট করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, রোগ দ্রুত শনাক্ত হলে সুস্থতার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে গড়ে ১ হাজার ২৬ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আর প্রতিদিন গড়ে মৃত্যু হয়েছে ৪ দশমিক ৮ জনের। আর এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এক দিনে চলতি বছর এটি সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে ডেঙ্গুতে ১২ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল, তবে সেই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, এর মধ্যে তিনটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল আগের দিন অর্থাৎ ২০ সেপ্টেম্বর। সেই হিসাবে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে। আর এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩০২ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৬৯ জন। এ নিয়ে এ বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৭৪ হাজার ৯৯২ জনে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির সম্ভাব্য ভয়াবহতা তুলে ধরে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের গবেষণা ফোরকাস্টিং মডেল অনুযায়ী, বর্ষার পর আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করে। এবারও তাই হয়েছে এবং অন্যান্য বছরে যা হয়নি এবার তা হবে অর্থাৎ এবার শীতেও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকবে। বলা যায়, এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি গভীর সংকটের দিকেই ইঙ্গিত করছে। এই পরিস্থিতি যদি এখনই সমাধানে না আনা যায়, তাহলে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়সহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মুস্তাক আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে লোকবল ও রোগ নির্ণয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেঙ্গুর টেস্টের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে প্রাথমিক অবস্থায় ডেঙ্গু শনাক্ত হবে এবং প্রাইমারি চিকিৎসা নেওয়ার পরে অনেকে সুস্থ হয়ে উঠবেন। তাদের ক্রিটিক্যাল অবস্থায় পড়তে হবে না।
তিনি বলেন, আপাতত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত যতটা দ্রুত সম্ভব ডেঙ্গুতে মৃত্যু রোধ করা। এর জন্য যেভাবে সম্ভব সেভাবেই দ্রুত কাজ করতে হবে। এরপর সারা দেশে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য একযোগে কাজ করতে হবে, যা বছরব্যাপী চলমান থাকতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৬১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জন, মার্চে ৩৩৬ জন, এপ্রিলে ৭০১ জন, মে মাসে ১ হাজার ৭৭৩ জন, জুনে ৫ হাজার ৯৫১ জন, জুলাইয়ে ১০ হাজার ৬৮৪ জন, আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬ জন, সেপ্টেম্বরের ১৫ হাজার ৮৬৬ জন, অক্টোবরে ২২ হাজার ৫২০ জন এবং নভেম্বরের ৫ তারিখ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ১৩০ জন। আর জানুয়ারিতে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন, এপ্রিলে ৭ জন, মে মাসে ৩ জন, জুনে ১৯ জন, জুলাইয়ে ৪১ জন, আগস্টে ৩৯ জন, সেপ্টেম্বরের ৭৬, অক্টোবরের ৮০ জন এবং নভেম্বরের ৫ দিনে মারা গেছে ২৪ জন।
প্রসঙ্গত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃতের তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। ২০২৪ সালে দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের।