ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বারবার সরকারি ব্যয় সংকোচন ও অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর সীমিত করার নির্দেশনা জারি করার পরও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বন্ধ হচ্ছে না। এর সর্বশেষ উদাহরণ হতে চলেছে ব্রাজিলের বেলেম শহরে চলমান জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন ‘কপ-৩০’। গতকাল বুধবার থেকে শুরু হয়েছে এ সম্মেলন। আর এতে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে গতকাল রাতে রওনা হয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের ১০ কর্মকর্তার একটি প্রতিনিধিদল। এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল এতে অংশ নেবে বলে জানা গেছে। এ সফরের ব্যয় মেটানো হচ্ছে পুরোপুরি সরকারি অর্থে পরিচালিত জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিল থেকে।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি (প্রথমে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর, পরে চলতি বছরের ২৩ মার্চ) সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দুটি আলাদা পরিপত্রে স্পষ্টভাবে বিদেশ সফর সীমিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এমনকি গত ৮ জুলাই ২০২৫ ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে বিদেশ সফর নিয়ন্ত্রণের কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয় অর্থ বিভাগ। কিন্তু সরকারি দপ্তরগুলোই সেই নির্দেশনা মানছে নাÑ এমন অভিযোগ উঠছে সরকারের ভেতর থেকেই।
কপ-৩০ সফরের সিদ্ধান্ত ‘জলবায়ু ট্রাস্টের সভায়’
সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের সভায় কপ-৩০-এ অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ‘আগামী ৫ নভেম্বর হতে ২১ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ব্রাজিলের বেলেম শহরে অনুষ্ঠেয় কপ-৩০ সম্মেলনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তার অংশগ্রহণ ব্যয়, বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন স্থাপন এবং আনুষঙ্গিক লজিস্টিক খরচ ট্রাস্ট ফান্ড হতে অগ্রিম উত্তোলন করা যেতে পারে।’ আরও বলা হয়, ‘সম্মেলন শেষে প্রকৃত ব্যয় সমন্বয় করে তা ট্রাস্টি বোর্ডে পুনরায় উপস্থাপন করা হবে।’ সভায় উপস্থিত সবাই এ প্রস্তাবে সম্মতি দেন। অর্থাৎ সরকারের ‘বিদেশ সফর পরিহারের’ নির্দেশনা কার্যকর থাকলেও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ব্যয়ের অনুমোদন চলছে।
‘ট্রাস্ট ফান্ড’ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড মূলত দেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বিশেষত উপকূল, চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকার অভিযোজন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য গঠিত। এই তহবিলের অর্থ দিয়ে মাঠপর্যায়ে নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও প্রতি বছরই প্রশাসনিক খাতে বিশেষ করে বিদেশ সফর ও সেমিনার আয়োজনের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যয় হয়। পরিবেশ-বিষয়ক একাধিক গবেষক ও নাগরিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে। তারা বলছেন, ‘জলবায়ু ট্রাস্টের প্রকল্প অনুমোদনে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে এবং বাস্তবায়নেও নেই জবাবদিহি।’
এ বিষয়ে সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকার যদি ব্যয় সংকোচন ও দায়িত্বশীল আর্থিক ব্যবস্থাপনার কথা বলে, তবে একই সময়ে জলবায়ু ট্রাস্টের মতো জনস্বার্থভিত্তিক তহবিল থেকে বিদেশ সফরের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া একেবারেই অসংগত। এতে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। কপ-৩০-এর মতো বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকারি পর্যায়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে প্রতিনিধিদল পাঠানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।’
সরকারি ব্যয় সংকোচনের ‘দ্বৈত বাস্তবতা’
চলতি বছর থেকেই সরকার প্রশাসনিক খরচ কমাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেÑ যার মধ্যে রয়েছে অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করা, বিদেশ প্রশিক্ষণ স্থগিত রাখা, নতুন গাড়ি কেনা বন্ধ রাখা এবং বিদেশ সফরে নিয়ন্ত্রণ। অর্থ বিভাগ সূত্রমতে, এখনকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নিজেদের ব্যয় পরিকল্পনা পুনর্গঠন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু কিছু দপ্তর ‘আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা’ বা ‘প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন’ দেখিয়ে নিয়মিত বিদেশ সফরের প্রস্তাব পাঠাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো অনুমোদিত হচ্ছে। সরকারি ব্যয় সংকোচনের নীতি যদি উপদেষ্টা বা মন্ত্রিপর্যায়ে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে নিচের স্তরে কোনো প্রভাব পড়বে না।
নির্দেশনা ‘অনুরোধের’ স্তরেই সীমাবদ্ধ
অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশ সফর সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ হিসেবে দেখা হয়। কোনো আন্তর্জাতিক প্রকল্প বা সম্মেলনের প্রসঙ্গ এলেই একাধিক কর্মকর্তা সফরসূচিতে যুক্ত হন। যাদের অনেকের অংশগ্রহণ প্রকৃত অর্থে প্রয়োজনও নয়। সূত্র বলছে, বিদেশ সফর নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কারণ এটি প্রভাবশালী মহলের কাছে মর্যাদার বিষয়। এই অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সর্বশেষ পরিপত্রে বলা হয়, এখন থেকে আগামী আদিবর্ষ অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত একান্ত অপরিহার্য কারণ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হলো। অর্থাৎ নির্দেশনা ‘অনুরোধের’ স্তরেই সীমাবদ্ধÑ বাধ্যবাধকতা বা জবাবদিহি এখনও নিশ্চিত নয়।
নীতিগত প্রশ্ন ও নির্দেশনার কার্যকারিতা
একদিকে দেশের রাজস্ব ঘাটতি বেড়েছে, উন্নয়ন ব্যয়ের বরাদ্দ কমেছে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন ব্যয়নীতি প্রণয়ন চলছে; অন্যদিকে সরকারি ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থে বিদেশ সফর হচ্ছে। এতে করে সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর বলেন, ‘কপ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কপ-৩০-এ দেশের প্রতিনিধিত্ব কেবল সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়া ঠিক নয়। সেখানে বিজ্ঞানী, পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় প্রতিনিধি থাকতে হবে। কিন্তু সরকারি সফরের এই ধারা বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মর্যাদার প্রদর্শন হয়ে উঠেছে। দেশের জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পগুলোতে মাঠপর্যায়ের চেয়ে কনফারেন্সভিত্তিক ব্যয়ই এখন বেশি। ট্রাস্ট ফান্ডের স্বচ্ছতা পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।
ব্যয় সংকোচন না সম্প্রসারণ
সরকারের লক্ষ্য যখন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, তখন বিদেশ সফরকেন্দ্রিক এই সিদ্ধান্তগুলো প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্নার স্বাক্ষরিত পরিপত্রে স্পষ্ট বলা আছে ‘একান্ত অপরিহার্য কারণ ব্যতিরেকে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করতে হবে।’ তবুও কপ-৩০-এর মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনের নামে একাধিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। প্রশ্ন এখন একটাই, সরকারি নির্দেশনা কাগজে থাকবে, না কি বাস্তবেও তার প্রয়োগ দেখা যাবে?