হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৩৯ এএম
কয়েকদিন আগেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ডেঙ্গুর এখন আর নির্দিষ্ট মৌসুম নেই; শীত মৌসুমজুড়েই ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকতে পারে। নভেম্বরের প্রথম ৪ দিনের ডেঙ্গু পরিস্থিতি সেই বাস্তবতার দিকেই যেন এগিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গতকাল নভেম্বরের ৪র্থ দিন পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৫ জনের বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এবং একই সময়ে গড়ে মৃত্যু হয়েছে ৩ দশমিক ৫ জন করে।
এমনই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের ভর্তি হতে এবং সিট পেতে যেমন ভুগতে হচ্ছে, তেমনই ফ্লুইড স্যালাইন কিনতেও পোহাতে হচ্ছে নানা ঝামেলা। কোথাও রোগী ভর্তি হতে ও সিট পেতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা এবং কোথাও কোথাও সংকট না থাকা সত্ত্বেও ফ্লুইড স্যালাইন (নরমাল স্যালাইন, ডিএনএস) কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ফ্লুইড-স্যালাইনের চাহিদা বাড়ছে। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে স্যালাইন সংকটের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। আর এটা হলে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। কেননা, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট। বিশেষত, আইভি (ইন্টার ভেনাস) স্যালাইন।
গত কয়েকদিনে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, মাতুয়াইল শিশু মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসহ বেশ কিছু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে প্রায় সব হাসপাতালেই কমবেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে। এর মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগীরা স্যালাইন সংকটের কথা জানিয়েছে।
এ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত মেয়ে ভর্তি করানো (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এক পিতা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুর ভালো চিকিৎসা নেই বলে আমরা এখানে এসেছি। এখানে ইমার্জেন্সিতে ডাক্তার দেখালে; কর্তব্যরত ডাক্তার আমার মেয়েকে ভর্তি করিয়ে নেন। কিন্তু ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ থাকায় প্রথমে সিট পাইনি। অন্য ওয়ার্ডে একটা সিট দেয় আমাদের।
তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবা ঠিকমতো পেলেও এখানে কোনো ওষুধ, স্যালাইন কোনোকিছুই হাসপাতাল থেকে পাইনি। সব বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। বিশেষ করে স্যালাইন কিনতে বেশ ঝামেলা হয়েছে। বেশ কয়েকটা দোকান ঘুরে ঘুরে বেশি দামে স্যালাইন কিনেছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গার্মেন্টসকর্মী বলেন, আমার সন্তানের জন্য স্যালাইন কিনতে অনেক দোকান ঘুরেছি। তারা বলছে, এখন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি; সাপ্লাই কম, এজন্য নাকি স্যালাইন সংকট। সেজন্য তারা বেশি দাম নিচ্ছে। ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি দিয়ে স্যালাইন কিনেছি। রক্ত পরীক্ষা থেকে শুরু করে সবকিছুই বাইরে থেকে করতে হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা ছাড়া কিছুই দিচ্ছে না।
এ বিষয়ে রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলছেন, ওষুধ ও স্যালাইন (নরমাল স্যালাইন, ডিএনএস) কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। দাম বেশি নিচ্ছে না কম নিচ্ছে তা বলতে পারব না। জরুরি প্রয়োজন তাই এসব দিকে খেয়াল করা হয়নি। তবে এসব এলাকার একাধিক ওষুধের দোকানাদার বলছেন, স্যালাইন সাপ্লাই কম; তবে আমরা যথাযথ মূল্যেই বিক্রি করছি।
রোগী ভর্তি হতে ও সিট পেতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে আসা ১৭ মাস বয়সি আনহা আক্তারের বাবা সাব্বির হোসেন বলেন, মেয়ের অবস্থা খারাপ ছিল। হাসপাতাল থেকে জানাল এখানে সিট নেই। পরে এক আনসারের সঙ্গে কথা বললাম; সে বলল, আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারব; এক হাজার টাকা লাগবে। পরে আমি টাকা দিলে সে আমাদের ভর্তি ও সিটের ব্যবস্থা করে দেয়।
আনসারের নাম কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, নাম মনে নেই। কিন্তু সে একটা নম্বর দিয়েছিল; সেই নম্বরে বিকাশ করে টাকা দিয়েছি।
ফ্লুইড স্যালাইন কিনতে বা অন্যান্য ওষুধ কিনতে সমস্যা হয়েছে কী ভর্তি হওয়ার পর দেখি এখানে চিকিৎসার জন্য ওষুধ, স্যালাইন থেকে শুরু করে যা কিছুর প্রয়োজন হয়েছে সব আমাকে কিনতে হয়েছে। ডাক্তার যা লিখে দিয়েছেন তা হাসপাতালের ভেতরের ফার্মেসি থেকে কিনতে পেরেছি। এখানে স্যালাইন-ওষুধ পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। এখানের ডাক্তার-নার্সরা ঠিকমতো চিকিৎসা ও সেবা দিচ্ছেন।
এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৪ জন এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১০১ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৭৩ হাজার ৯২৩ জন আর মৃত্যু হয়েছে ২৯২ জনের।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোস্তাক হোসেন বলেন, সিটের সমস্যা থাকলেও এখন স্যালাইন সংকট হওয়ার কথা নয়। হয়তো এক জায়গায় কম এক জায়গায় একটু বেশি আছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু এখন জনস্বাস্থ্যের সমস্যা; সে জন্য এ রোগের চিকিৎসার সবকিছুই সরকার থেকে দেওয়ার কথা। যদি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর পক্ষ থেকে বাইরে থেকে কিনে আনে তাহলে পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সরকার সেই টাকা ফেরত দেওয়ার কথা।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ফ্লুইড স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু বর্তমানে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য স্যালাইন সংকট নাই। হয়তো কোনো অঞ্চলে সাপ্লাইয়ে কমবেশি হয়েছে; হতে পারে।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পার্শ্ববর্তী ওষুধের দোকানগুলোতে গায়ের দামের চেয়ে ১৫-২০ টাকা বেশি দিয়ে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য স্যালাইন কিনতে হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গায়ের দামের বেশি দামে যেকোনো কিছুই বিক্রি একটা অপরাধ; এটা উচিত নয়। যারা এটা করছে তারা অপরাধ করছে। আমরা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।