আরপিও সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি
দীপক দেব
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১২ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। বিএনপিসহ দলটির যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী দল ও জোটের আপত্তি সত্ত্বেও ‘জোটবদ্ধ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে অংশ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা’ বহাল রেখেই ওই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া আগের বেশ কিছু বিধান পরিবর্তনের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে একগুচ্ছ নতুন বিধান। তবে অন্য কোনো বিধান নিয়ে তেমন আপত্তি না থাকলেও জোটবদ্ধ নির্বাচনে প্রতীক সংক্রান্ত বিধান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিএনপিসহ সমমনা দল ও জোটের নেতারা।
তারা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করেই এই ধরনের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কার স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এমন প্রশ্নও তোলা হয়েছে দলগুলোর পক্ষ থেকে। দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকার এই সিদ্ধান্ত আবার রিভিউ করবে বলেও আশা প্রকাশ করেছে কোনো কোনো দল। এদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বাম ঘরানার কিছু কিছু রাজনৈতিক দল এই বিধানের পক্ষে রয়েছে। তারা মনে করছেÑ এই বিধানের ফলে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রতীক নিয়ে স্বকীয়তার সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এটা দলীয় রাজনীতির জন্য একটা ভালো দিক হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে গত সোমবার নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। গতকাল মঙ্গলবার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরেফিরে আলোচনায় আসে জোটবদ্ধ নির্বাচনেও দলীয় প্রতীক ব্যবহারের প্রসঙ্গটি। সংশ্লিষ্টরা জানান, সংশোধিত এই আরপিওকে ভিত্তি করেই শিগগির দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি চূড়ান্ত করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এর আগে ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে ‘জোট করলেও নির্বাচনে অংশ নিতে হবে নিজ দলের প্রতীকে’Ñ এই বিধান নিয়ে আপত্তি তোলে বিএনপিসহ দলটির যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী দল ও জোট। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন ও আইন মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে আপত্তিও জানানো হয়। এরপর সরকার বিষয়টি বাদ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখন জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত ওই বিধান রেখেই অধ্যাদেশ জারি করা হলো। স্বাভাবিকভাবে জনমনে প্রশ্ন জাগতে পারেÑ কার স্বার্থ রক্ষা করতে রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। এতে কারা কারা লাভবান হবেন?
গত ২৬ অক্টোবর বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে বৈঠক করে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি দেয়। বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মো. ইসমাঈল জবিউল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে এই বিষয়ে যোগাযোগ করে বিএনপি আপত্তির কথা জানিয়েছে। কিন্তু খুবই দুঃখজনক হলোÑ বড় রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডারের এমন আপত্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানোর পরও কারও সঙ্গে আলোচনা না করে এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে করে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, দুটি রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার কারণে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকার খর্ব করেছে। আমি নিজেও বুঝতে পারছি নাÑ এখানে কার স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে? কাদের স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? আমি মনে করি, যেসব দল এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেসব দল অবশ্যই বিষয়টি নিয়ে কথা বলবে। এ ছাড়া সরকার দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত রিভিউ করবে।
এদিকে নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করেই আরপিও সংশোধন হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে অসন্তোষের কথা জানান দলটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। নির্বাচন ভবনে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা। বাস্তবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে কোনো এজেন্ডা আকারে বিশেষ করে আরপিও এবং আচরণবিধির ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে আলোচনা হয়নিÑ এটা নিয়ে আমরা অসন্তোষ জানিয়েছি। সরকারের তরফে ব্যবস্থা নিয়েছেÑ এটা বলে ইসির দায় এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আরপিও চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। ইতোমধ্যে আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। এটাতে আমরা অসন্তোষ, ক্ষোভ ও আপত্তি জানিয়েছি। এটা কোনো বিবেচনাসম্মত কাজ হয়নি। নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
এদিকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গণতন্ত্র মঞ্চের আরও দুই শরিক দল নাগরিক ঐক্য ও গণসংহতি আন্দোলন। এই প্রসঙ্গে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার মনে হয় এটার কোনো দরকার ছিল না। সারা পৃথিবীতে এভাবেই জোটের নির্বাচন হয়। কিন্তু আমাদের এখানে এমনটা কেন করা হলো আমার বোধগম্য নয়। গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য এটা ভালো হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।’ অন্যদিকে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা তো বলেছিলাম সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু সেটা হয়নি।’
এর আগে গত সোমবার আরপিও ২০ অনুচ্ছেদের বিধান পুনর্বহালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সিইসিকে চিঠি দেয় বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী ১২ দলীয় জোট। এই জোটের নেতারা বিভিন্ন সময় এই বিধানের বাতিলের বিরোধিতা করে আসছিলেন। জানতে চাইলে জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা নিবন্ধিত দলগুলোকে অনেক দিন ধরেই এটার বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু তারা সেটা করেনি। আশা করি, এখন তারা এর বিরুদ্ধে আবারও কথা বলা শুরু করবে।’
তবে জোট ও প্রতীক নিয়ে আরপিওর নতুন বিধানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সিপিবিসহ বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফি রতন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা এই বিধানকে সমর্থন করি। কারণ প্রতিটি দল তার প্রতীক নিয়ে স্বকীয়তার সঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক, এটা আমরা চাই।’
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী, আদালত ঘোষিত ফেরারি আসামি ভোট করতে পারবে নাÑ এমন বিধান যোগ হয়েছে এবার। দেড় দশক পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় যেমন ‘সশস্ত্র বাহিনী’ ফিরেছে, তেমনই ‘না’ ভোট ব্যবস্থা এসেছে একক প্রার্থীর আসনে। এ ছাড়া সমভোট পেলে হবে পুনঃভোট, জোটে করলেও ভোট করতে হবে নিজ দলের মার্কায়, জামানতের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা পুনর্নির্ধারণ, আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা জরিমানা, আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতি চালু, অনিয়মের কারণে পুরো আসনের ভোট বাতিলের বিধান, এআইয়ের অপব্যবহারকে নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং হলফনামায় অসত্য তথ্য (ভোটে অযোগ্য এমন) দিলে নির্বাচিত হওয়ার পরও ইসি ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে আরপিওতে উল্লেখ করা হয়েছে।