মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:০০ এএম
আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:০৪ এএম
ছবি: সংগৃহীত
রাজনীতির মাঠে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে গৃহীত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। তার পর টানা তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু শুরু থেকেই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ পদ্ধতি বাতিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করে। এ দাবিতে অনড় থেকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে দলগুলো পরবর্তী সবগুলো নির্বাচন কার্যত বর্জনও করে। পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। কিন্তু সত্যিই ব্যবস্থাটি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এক রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেন। এর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং বিএনপি দুটি পৃথক আপিল করে। বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন থেকে সৃষ্ট আপিলের নিয়মিত শুনানি চলছে। এ বিষয়ে আপিল বিভাগে পাঁচটি শুনানি শেষ হয়েছে এবং পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আজ ২ নভেম্বর। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চে এ শুনানি চলছে।
দেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান করা হয় ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুমোদনের মাধ্যমে এবং ২৮ মার্চ রাষ্ট্রপতি সম্মতি প্রদানের পর তা আইনে পরিণত হয়। এরই আলোকে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ২০১১ সালে প্রথমে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ও পরে পঞ্চদশ সংশোধনী অনুমোদনের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেয়। এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন দেশে-বিদেশে নানা বিতর্কের জন্ম দেয়।
আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি সঙ্গতিপূর্ণ নয়Ñ অনেক বিশেষজ্ঞ এমন যুক্তি দিয়ে থাকেন। এর বিপরীতে অনেকের অভিমত এই যে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়নি। দলীয় কোনো সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন প্রভাবমুক্ত হওয়া কঠিন এবং সব রাজনৈতিক দল তো বটেই, সাধারণ মানুষও নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে বিশ্বাস করতে চায় না। ফলে যখন সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া হয়, তখন কার্যত একটি বিরাট রাজনৈতিক সংকটের সূচনা হয়।
সাম্প্রতিক তৎপরতা
গত বছরের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। আবেদনকারী অন্য চারজন হলেনÑ তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান। এরপর গত বছরের ১৬ অক্টোবর একই বিষয়ে একটি আবেদন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক সপ্তাহ পর ২৩ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ ছাড়া নওগাঁর রানীনগরের নারায়ণপাড়ার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে গত বছর আরেকটি আবেদন করেন। সবগুলো আবেদন বিবেচনায় নিয়ে আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়।
আপিল শুনানি চলমান
গত ২১ অক্টোবর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিল শুনানি শুরু হয়। ২৯ অক্টোবর পঞ্চম দিনের মতো আপিল শুনানি হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে এ শুনানি চলছে। পঞ্চম দিনের আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির। এর আগে ২৮ অক্টোবর আপিলের চতুর্থ দিনের শুনানিতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি শেষ করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। গত ২৩ অক্টোবর আপিলের তৃতীয় দিনের শুনানিতে আদালতে ইন্টারভেনর হিসেবে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী। গত ২২ অক্টোবর আপিল শুনানির দ্বিতীয় দিনে রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি শেষ করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। প্রসঙ্গত, গত ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানিতে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল প্রক্রিয়া অবৈধ ছিল। আমরা চাই এটি বাতিল করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় রিভিউ করা হোক। এই রায় বাতিল করা হোক।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রত্যাবর্তন করলে সকল নাগরিক স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেÑ এ কথা বলার পাশাপাশি তিনি এ-ও বলেন যে, ‘সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধন পুনরুজ্জীবিত বা পুনর্বহাল হলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সম্ভব নয়। সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনের বিধান অনুসারে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। দ্বাদশ সংসদ ভেঙেছে এক বছরের বেশি আগে। তাই বর্তমানে যে অন্তর্বর্তী সরকার আছে, এটাই কন্টিনিউ করবে। কারণ এ সরকারের তিনটি ম্যান্ডেট আছে। একটি হচ্ছে বিচার, দ্বিতীয়টি সংস্কার আর তৃতীয়টি নির্বাচন।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুরু ও বাতিলের ইতিহাস
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে মোট চারটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের পতন ঘটে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর পর সংবিধানে ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ওই বছর বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব দেন।
এর পর ২০০১ সালে সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার গঠন করে। এই জোটের শাসনকাল শেষ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের সদ্যসাবেক প্রধান বিচারপতি এম হাসানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কথা ছিল। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অসম্মতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে এই বিরোধ দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও রাজপথে সহিংসতা সৃষ্টি করে। ফলে বিষয়টি বাতিল হয়ে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে এ নিয়েও রাজনৈতিক বিরোধ ও মতানৈক্য তৈরি হয় এবং ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহম্মেদের নেতৃত্বে নতুন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে।
২০১১ সালের ১০ মে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এক মামলায় বিচারপতি খায়রুল হক নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অবৈধ বলে রায় দেন এবং সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়Ñ যেটির মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি শুরু হয়েছিল। পরে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়।
ফিরতে কি পারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার?
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি গত ২১ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অন্তর্বর্তী সরকারকে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পরামর্শ দেয়। এর পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরদিন ২২ অক্টোবর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, ‘বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা চেয়েছে।’ নির্বাচনকালীন সরকার পরিবর্তন হবে কি নাÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘এ ধরনের কোনো কিছু আলোচনা হয়নি।’
এসব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হলে সে ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিএনপি-জামায়াত যত উদগ্রীব ছিল, এখন তাদের মধ্যে সে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এখন রিভিউতে অংশগ্রহণ করেও তারা আসন্ন নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চাইছেন না। তাদের এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে রহস্য কী এবং আগামীতে কী ঘটবে তা বলা মুশকিল।’