ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ০০:৫১ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৯ পিএম
হজরত শাহ মোস্তফা (রহ.)-এর পুণ্যভূমি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, সবুজ-শ্যামল নগরী হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজার জেলা। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি সবকিছু মিলিয়ে মৌলভীবাজার একটি সমৃদ্ধ জনপদ। এ জেলার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিব্রাজক এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে লিখেছেন, প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। মৌলভীবাজার বরাবরই মনোমুগ্ধকর পর্যটন জেলা। অবারিত সবুজাভ চা বাগান এ জেলার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। এখানকার অসংখ্য আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলো প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত থাকে। মৌলভীবাজার জেলার অতি পরিচিতি কিছু পর্যটন স্পট নিয়ে আজকের নিবন্ধে আলোকপাত করা হলো।
মাধককুন্ড জলপ্রপাত
মাধবকুন্ডের অবস্থান মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায়। সুউচ্চ পাহাড়শৃঙ্গ থেকে অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে শুভ্র জলরাশি। জলপ্রপাতের এই স্বচ্ছ জলরাশি দেখতে পুরো বছরই পর্যটকদের আগমনে মুখরিত থাকে মাধবকুন্ড।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় হাজার বছর আগে হিন্দু ধর্মাবলম্বী সন্ন্যাসী মাধবেশ্বর এখানে আস্তানা স্থাপন করেন। পাহাড়বেষ্টিত নির্জন স্থানে সন্ন্যাসী ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। মাধবেশ্বরের আস্তানাঘেঁষে রয়েছে ঝরনাধারা। পাথারিয়া পাহাড়ের প্রায় ২৫০ ফুট উঁচু থেকে কলকল শব্দে ঝরনাধারা প্রবাহিত হচ্ছে। কথিত আছে সন্ন্যাসী তার প্রয়োজনীয় কাজসম্পন্ন করতেন ঝরনার শীতল জল দিয়ে। সেই থেকে প্রাকৃতিক জলধারাটির নাম মাধবকুন্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
হামহাম ও সীতাপ জলপ্রপাত
জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কুরমা বন বিটের গভীর অরণ্যে অবস্থিত হামহাম জলপ্রপাত। এ জলপ্রপাতটির পাশেই অবস্থিত সীতাপ জলপ্রপাত। গহিন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত এ দুটি জলপ্রপাত দেশের অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের হৃদয়পটে স্থান করে নিয়েছে। এ জলপ্রপাত দুটির ওপর থেকে প্রচণ্ড শব্দে গড়িয়ে পড়া জলধারাকে অনেকেই মনে করেন পাহাড়ের কান্না।
সিলেট বন বিভাগের আওতাধীন রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কুরমা বন বিটের আয়তন ৭ হাজার ৯৭০ একর। এ বন বিটের পাহাড়ের পশ্চিম দিকে চাম্পারায় চা বাগান, পূর্ব-দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত। বন বিটের কলাবন পাড়া পেরিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার গভীর অরণ্যের অভ্যন্তরে অবস্থিত সীতাপ জলপ্রপাত। সীতাপ জলপ্রপাত থেকে ৪ কিলোমিটার অদূরে হামহাম জলপ্রপাতের অবস্থান। হামহাম ও সীতাপ জলপ্রপাতের ওপর থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পাহাড়ি জল আপনাকে অবশ্যই মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেবে।
কমলা রাণীর দীঘি
১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে এ অঞ্চলের রাজা ভানু নারায়ণ দেহত্যাগ করলে তার জ্যেষ্ঠপুত্র সুবিদ নারায়ণ উত্তরাধিকার সূত্রে রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। স্ত্রী কমলা রানীর সহায়তায় অত্যন্ত সুদক্ষভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। তবে একসময় এখানে খাবার পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় এক রাতে রাজা সুবিদ নারায়ণ স্বপ্নে দেখেন, কে যেন তাকে আদেশ দিচ্ছেন বাংলা ১২ জ্যৈষ্ঠ তারিখে ১২ কেদার ও ১২ হাল জমি নিয়ে একটি দীঘি খনন করতে হবে। যথারীতি প্রজাদের পানীয় জলের কথা চিন্তা করে রাজা স্বপ্নের নির্ধারিত তারিখেই দীঘির খননকাজ শুরু করেন। ২৬০ জন শ্রমিক প্রায় তিন মাসে দীঘিটির খননকাজ শেষ করেন। কিন্তু দীঘিতে এক ফোটা জলও নেই। দীঘির খননকাজ শেষ হওয়া পর পরই রাজা সুবিদ নারায়ণ আবারও স্বপ্নে দেখেন যতক্ষণ রানী কমলাকে জলদেবীর উদ্দেশ্যে প্রেরণ না করবেন ততক্ষণ দীঘিতে জল উঠবে না।
রাজা সুবিদ নারায়ণ রানীকে স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন। রানী প্রজাদের কথা চিন্তা করে স্বেচ্ছায় জলদেবীর উদ্দেশ্যে নিজেকে সমর্পণ করতে রাজি হলেন। নির্ধারিত দিনে কমলা রানী বত্রিশ অলংকারে সজ্জিত হয়ে মাত্র তিন মাসের শিশু সন্তানকে রাজদরবারে রেখে দীঘিতে নামলেন। রানী দীঘির তলদেশে গিয়ে জলদেবীর স্তুতি বন্দনা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে পুরো দীঘি জলে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু দীঘি থেকে কমলা রানী আর ফিরে এলেন না। সুবিশাল এ দীঘিটি রানীর মহিমায় আজও এলাকার মানুষের পানীয়-জলের সংস্থান করে আসছে। দীঘিটি দেখতে প্রায় প্রতিদিনই শত শত পর্যটকের ভিড় জমে জেলার রাজনগরে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান
কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত দেশের অনন্যসুন্দর চিরহরিৎ বন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। উদ্যানের গভীরে কয়েক প্রজাতির দুর্লভসহ লাখ লাখ বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ, বন্যপ্রাণী পর্যটকদের মুগ্ধ করবেই। অরণ্যবেষ্টিত নৈসর্গিক শোভার এই সাম্রাজ্যে আছে ১৫৫ প্রজাতির পাখি, রয়েছে প্রায় ২০ প্রজাতির বুনো অর্কিড। লাউয়াছড়া ভ্রমণকালে দেখা মেলে খাসিয়া আদিবাসীদের পান পুঞ্জি ও ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লীর। লাউয়াছড়া পার্কে প্রবেশ করা মাত্রই পোকা-মাকড়ের বিচিত্র শব্দে মন ভরে যায়। অনেকে এ শব্দের নাম দিয়েছেন ‘ফরেস্ট মিউজিক’। মাঝে মধ্যে বৃক্ষসারির মগডালে দেখা মেলে বানর ও হনুমানের লাফালাফি। বনের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা মেলে বনমোরগ, উল্লুক, মেছোবাঘ, বনবিড়াল, সাপসহ বিভিন্ন জীবজন্তুর।
লাউয়াছড়া বনের পশ্চিম প্রান্তে ‘লাউয়াছড়া পান পুঞ্জি’ এবং পূর্ব প্রান্তে ‘মাগুরছড়া পান পুঞ্জি’ অবস্থিত। এ দুটি পুঞ্জি ঘুরলে আদিবাসী খাসিয়াদের জীবনযাপন, কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা মেলে। দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী। লাউয়াছড়ার একপাশে রয়েছে সুমিষ্ট আনারসের বাগান, লেবুর বাগান এবং অন্যপাশে চা বাগান। বনের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ছড়া। বর্ষা মৌসুমে এসব পাহাড়ি ছড়া পানিতে টইটম্বুর থাকে।
মাধবপুর লেক
কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর চা বাগানে অবস্থিত মাধবপুর লেক। চারদিকে চা বাগান এবং পাহাড়ি টিলার মাঝে অবস্থিত সুবিশাল মাধবপুর লেকে ভ্রমণে গেলে প্রথমেই নাকে ছোঁয়া লাগে সবুজ কাঁচা চা-পাতার ঘ্রাণ। সবুজ পাহাড়, উঁচু উঁচু টিলা ও চা গাছের সারির মধ্যে মাধবপুর লেকের ফুটন্ত নীল পদ্ম পর্যটকদের বিমোহিত করে।
বাইক্কা বিল
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওরে অবস্থিত বাইক্কা বিল। এটি মেধী ও পরিযায়ী পাখি এবং মাছের অভয়াশ্রম। একসময় শুধু শীতকালে এখানে পরিযায়ী পাখির আনাগোনা ছিল। বিগত কয়েক বছর ধরে বাইক্কা বিল পাখির স্থায়ী অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। বছরের প্রায় বারো মাসই এখানে পাখির দেখা মেলে। পাখি দেখার জন্য বাইক্কা বিলে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল বিশিষ্ট পর্যটন টাওয়ার। টাওয়ারের ওপরে উঠে সামান্য ফি’র মাধ্যমে বাইনোকুলারের মাধ্যমে পাখি দেখা যায়।
এগুলো ছাড়াও মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে বিভিন্ন উপজেলায় ৯২টি চা বাগান; চা বাগানগুলোর জলাধার বা লেক, কুলাউড়া উপজেলায় হাকালুকি হাওর, পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি, কালাপাহাড়; কমলগঞ্জে পদ্মছড়া লেক, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, আদমপুর সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কালাছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল, মণিপুরি পল্লী, শমসেরনগর পরিত্যক্ত বিমানবন্দর, ক্যামেলিয়া লেক, মণিপুরি ললিকলা একাডেমি, শমসেরনগর গলফ মাঠ; শ্রীমঙ্গল উপজেলায় লাসুবন গিরিখাত, হাজং টিলা, মুর্দাকুল মিনি ঝরণা, অফিং হিল, ডিনস্টন সিমেট্রি, নির্মাই শীববাড়ি, নিরালা পান পুঞ্জি, জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ, বিদ্যাবিল হাজং টিলা, স্বর্ণালী ছড়া, গারো বাড়ি লেক, সাদা পদ্ম লেক, জেরিন লেক, টিপরাছড়া গলফ মাঠ, গরম টিলা, রাবার বাগান, চাউতলী সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ভাড়াউড়া লেক, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, হাইল হাওর, চা কন্যা ভাস্কর্য, চা জাদুঘর, লেবু-আনারস বাগান, লালমাটি কালীটিলা, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, পাহাড়-টিলা, বধ্যভূমি একাত্তর, যজ্ঞকুন্ড ধারা; রাজনগর উপজেলায় পাখিবাড়ি, রাজা সুবিদ নারায়নের রাজবাড়ি, জনার্দন কর্মকারের বাড়ি, জমিদার বাড়ি, বিপ্লবী লীলা নাগের পৈত্রিক বাড়ি, পাঁচগাঁও লাল দুর্গা মন্দির, জলের গ্রাম অন্তেহরী; বড়লেখা উপজেলায় আগর-আতর শিল্প, মুরইছড়া বনাঞ্চল, পাথারিয়া বনাঞ্চল; জুড়ী উপজেলায় কমলা বাগান, লাটিঠিলা বনাঞ্চল; মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, হজরত শাহ মোস্তফা (রহ.) মাজার শরীফ, মনু ব্যারেজ, কাসিমপুর পাম্প হাউস, ঐতিহাসিক খোজার মসজিদ, শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা গোল চত্বর ইত্যাদি শতাধিক মনোমুগ্ধকর স্পট।
পর্যটকরা তাই বলেন, মৌলভীবাজার এমন এক জায়গা, যেখানে বছরের যে কোনও সময়ই ভ্রমণ করা যায়।