খুলনার পর্যটন শিল্প
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ঢাকা ও মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ০০:২২ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খুলনা। শতাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন দিঘি, নদীঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই অঞ্চল ঘুরে বেড়ানোর এক অবারিত প্রান্তর। এখানে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, ইউনেস্কো ঘোষিত ঐতিহ্যবাহী মসজিদ, শত শত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। অথচ অবকাঠামোগত ঘাটতি, সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত দুর্বলতা খুলনা অঞ্চলের পর্যটন শিল্প এখনও অবিকশিত। অথচ সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি সহযোগিতা ও বেসরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে খুলনা হয়ে উঠতে পারে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃত ট্যুরিজম হাব।
শীত এলেই খুলনা ও মোংলার নদীপথে বাড়ে পর্যটকদের আনাগোনা। করমজল, কটকা, কচিখালি, ভেদাখালি কিংবা দুবলার চর এই অঞ্চলগুলোর নাম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এসব স্থানে কেউ আসেন বাঘ দেখার আশায়, কেউবা চিত্রল হরিণ, কুমির, বানর বা অসংখ্য পাখির ছবি তুলতে। খুলনা শহর থেকে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বারে যেতে হয় জেলার দাকোপ বা বাগেরহাটের মোংলা হয়ে। অথচ দুদিকের পথই রাস্তা ভাঙাচোরা, সেতুগুলো নড়বড়ে। যাতায়াতে পর্যটকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। চার লেনের রাস্তার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেই। তাছাড়া পর্যটকদের জন্য নেই মানসম্মত হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, নিরাপদ জেটি বা আধুনিক পন্টুন। তাই সুন্দরবনের পর্যটনস্থানগুলো দেখে সারাদিনের ধকল শেষে রাত্রি যাপনের জন্য পর্যটকদের ফিরতে হয় প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে খুলনা শহরে।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সাধারণ সম্পাদক এম. নাজমুল আযম ডেভিড বলেন, ‘পর্যটনের সুবিধার্থে এখানে যে পন্টুন তৈরি হয়েছিল, সেটি বহুদিন ধরে অচল। নৌকা ভেড়াতে হয় ঝুঁকিপূর্ণ সিঁড়ি ব্যবহার করে। পরিকল্পিত অবকাঠামো থাকলে অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বদলে যেত।’
পর্যটক আকৃষ্টে সরকারি উদ্যোগ যখন ধীরগতির, তখন স্থানীয় উদ্যোক্তারা পথ খুঁজছেন নিজেদের মতো করে। খুলনার দাকোপ, কয়রা, বাগেরহাটের মোংলা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকায় ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে প্রায় ২৩টি ইকো কটেজ ও রিসোর্ট। তবে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সরকারি অনুমোদন ও সহযোগিতা না থাকায় অগ্রগতি থেমে গেছে। জঙ্গলবাড়ি ইকো কটেজের মালিক জাকারিয়া হোসেন শাওন বলেন, ‘সরকারের সহযোগিতা থাকলে এ অঞ্চল বদলে যেত। কিন্তু রাস্তা খারাপ, আবাসন সুবিধা কম। হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদনের প্রক্রিয়াও জটিল।’
এর আগে খুলনা মহানগরের মুজগুন্নীতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের প্রায় পাঁচ একর জমি ঘিরে নেওয়া হয়েছিল নানা পরিকল্পনা। সেখানে গড়ে ওঠার কথা ছিল আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। অথচ সে স্থান আজ আগাছায় ভরা। ভাঙা দেয়াল আর স্তূপ করা ইট কেবল অব্যবস্থাপনার সাক্ষী। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা, পরিসংখ্যান ও প্রশিক্ষণ) মো. জিয়াউল হক হাওলাদার বলেন, ‘পিপিপি প্রকল্পে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’
স্থানীয়রা বলছেন, মুজগুন্নী হয়ে উঠেছিল খুলনার আশা। এখানে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল গড়ে উঠলে পর্যটকদের আবাসন ঘাটতি পূরণ হতো। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ত। কিন্তু কোনো সরকারই এ এলাকার পর্যটন শিল্পের বিকাশে মাস্টারপ্ল্যান করেনি।
শুধু সুন্দরবনই নয়, বৃহত্তর খুলনা ও আশপাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। খানজাহান আলীর দিঘি, অযোধ্যা মঠ, রবীন্দ্র কমপ্লেক্স, পাইকগাছায় স্যার পিসি রায়ের বাড়ি, যশোরের ভরত ভায়না, সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়া মসজিদ সবই অতীতের অমূল্য সম্পদ। তবে এসব স্থানে পর্যটকদের পদচারণা নেই বললেই চলে।
চট্টগ্রাম থেকে যশোরের ভরত ভায়না দেখতে আসা শিল্পী বেগম বলেন, ‘জায়গাটি অসাধারণ। পাহাড়পুরের মতো মনে হয়েছে। কিন্তু রাস্তা সরু, পার্কিং নেই, থাকার জায়গাও নেই। দ্বিতীয়বার আসার কথা ভাবতেও দ্বিধা হয়।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলি ইয়াসমিন বলেন, ‘প্রচারের অভাবে এসব স্থানে পর্যটক কম আসেন। আমরা পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নানাভাবে চেষ্টা করছি।’
অন্যদিকে পর্যটন করপোরেশন ও ট্যুরিজম বোর্ডের সমন্বয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মেহেদী হাসান বলেন, ‘সুন্দরবনে যাওয়া কষ্টকর, থাকার জন্য ভালো হোটেল-রিসোর্ট নেই। অথচ উন্নত আবাসন ব্যবস্থা থাকলে পর্যটক বাড়বে।’
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পর্যটন খাত থেকে এসেছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব। তাই সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া হলে শুধু খুলনা অঞ্চল থেকেই বছরে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা আয় সম্ভব। বর্তমানে প্রতিটি ইকো রিসোর্ট গড়ে ২০-২৫ জনের কর্মসংস্থান দিচ্ছে। ২৩টি রিসোর্টে কাজ করছেন প্রায় ৫০০ জন। এই সংখ্যা ১০০ রিসোর্টে পৌঁছালে স্থায়ী চাকরি হবে দুই হাজারের বেশি মানুষের। পাশাপাশি পরিবহন, হস্তশিল্প, খাবার ও গাইডিং খাতেও হতে পারে আরও কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। প্রতিবেশী দেশ ভারতের অংশের সুন্দরবন অঞ্চলে প্রতিবছর পর্যটন খাত থেকে আয় হয় ২৫০-৩০০ কোটি রুপি। পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের খুলনাও সমপরিমাণ রাজস্ব অর্জন আয় করতে পারে যদি নীতি, বিনিয়োগ ও প্রচারকাজ সমন্বিত হয়। কিন্তু এজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন, প্রচার ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করতে হবে। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, একটি রিসোর্ট করতে গেলে বন বিভাগের ছাড়পত্র, পরিবেশ দপ্তরের অনুমতি, আবার পর্যটন করপোরেশনের স্বীকৃতি সব মিলিয়ে বছর পেরিয়ে যায়। একটির সঙ্গে আরেকটির সিদ্ধান্তের মিলও থাকে না।
এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য আলাদা পর্যটন পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি উল্লেখ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, ‘ইউএসএআইডির সহায়তায় তৈরি হওয়া ২০ বছরের ইকোট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন পেলে এই খাত এগোবে বহুদূর।’
তিনি খুলনাঞ্চলের পর্যটন খাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ হিসেবে সুন্দরবন ও ঐতিহাসিক স্থানে সড়ক উন্নয়ন ও নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘সরকারিÑবেসরকারি অংশীদারিত্বে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি ইকোট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যানের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা, আন্তর্জাতিক প্রচারণা ও ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম জোরদার ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে টেকসই পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব।’